আজকের তরুণ আগামী দিনের ভবিষ্যত, দেশ ও জাতির কর্ণধর। এ তরুণদের সত্য, সঠিক, সুন্দরভাবে গড়ে তোলার মধ্যেই দেশের কল্যাণ নিহিত। “যুবকদের বলই তাদের বল ও শোভা, আর পক্ককেশ বৃদ্ধ লোকদের শ্রী” (পবিত্র বাইবেল, হিতোপদেশ ২০:২৯ পদ)। অপরদিকে এ যুব সমাজের বিপথগামীতার অর্থ দেশের অনিবার্য বিপদ। তরুণদের কাছ থেকে জাতি দেশের উন্নতি ও কল্যাণ আশা করে। কিন্তু আমাদের সমাজ আজ নানা রোগে আক্রান্ত। আর দেশের যুব সমাজ এ রোগের শিকার। যুব সমাজ আজ পথভ্রষ্ট হয়ে অধঃপতনের ও ধ্বংসের দিকে অগ্রসরমান। তাদের অধঃপতনের হাত থেকে বাঁচিয়ে আনা এখন জাতীয় দায়িত্বে পরিণত হয়েছে।
কারা এ যুব সমাজ?
যুগে যুগে ন্যায় ও সত্যের জন্য সংগ্রাম করে যারা জীবন উৎসর্গ করে, নবজীবনের সংগীত রচনার ভার যাদের উপর তারাই যুবক। বয়সে নবীন, মন যাদের বিশ্বাসে ভরপুর, যাদের চেখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন, যারা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে না, পুরাতনকে ভেঙেচুরে নতুন কিছু গড়তে চায়, তারাই তরুণ। তারুণ্য স্থবির নয়, সে সদা চঞ্চল, সে পরাজয় মানতে নারাজ, তারা দেশ ও জাতির গৌরব। কিন্তু এ তরুণ বা যুবসমাজই যখন খারাপ পথে পা বাড়ায়, তখন তা জাতির জন্য ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। তাদের বিপথগামিতার কারণে জাতির জীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয়, অন্ধকার।
আমাদের সমাজ নানা অবক্ষয়ের শিকার। এ অবক্ষয় যুব সমাজের চিত্তের দোলা দিয়েছে। নীতি যেখানে পদদলিত, অসৎ পথে অবৈধ অর্থের পাহাড় যেখানে গড়ে ওঠে, বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে যে সমাজে কাঁদে, যে সমাজে নৈতিক মূল্যবোধ ধুলায় গড়াগড়ি খায়। আমাদের যুব সমাজ আজ নানা কারণে ধ্বংসের মুখোমুখি। বেকারত্ব, সন্ত্রাস, রাজনৈতিক কুপ্রভাব, অপসংস্কৃতি, অর্থনৈতিক দৈন্য ইত্যাদি যুব সমাজকে দারুণভাবে প্রভাবান্বিত করেছে। ফলে তারা সুস্থ জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঝুঁকে পড়েছে নানা অবক্ষয়ের দিকে। যুবকদের অবক্ষয়ের বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। যেমন-
প্রথমত: জীবন্ত আদর্শ মূল্যবোধের অভাব : আমাদের তরুণ সমাজের সামনে জীবন্ত আদর্শের বড়োই অভাব। তারা বড়োদের মাঝে খুব কম আদর্শবান ব্যক্তিই খুজে পাচ্ছে, যাদের কাছ থেকে তারা সৎ পথের অনুপ্রেরণা পাবে। বরং তারা দেখতে পাচ্ছে রাজনীতির নামে মিথ্যাচার, সমাজসেবার নামে স্বেচ্ছাচারিতা, আদর্শের নামে প্রতারণা। মূলত সমাজের সর্বস্তরে আজ মূল্যবোধের যে অভাব দেখা দিয়েছে তার দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে আমাদের যুব সমাজ।
দ্বিতীয়ত: অপসংস্কৃতির অভাব : যুব সমাজের উপর সিনেমা, টেলিভিশন, সংবাদপত্র ইত্যাদির কুপ্রভাব অত্যন্ত বেশি। সিনেমার কাহিনী, নাচ-গান, পোশাক-আশাক ইত্যাদি এমনভাবে সন্নিবেশিত যে তাতে তরুণ সমাজ সস্তায় ও সহজেই আমোদ প্রমোদের উপকরন খোজে। তরুণ-তরুণীরা সিনেমার এসব উদ্ভট ও অবাস্তব কাহিনীকে অনেক সময় বাস্তব জীবন বলে মারাত্মক ভুল করে এবং এগুলো অন্ধভাবে অনুকরণ করে। টিভিতেও অনেক সময় যুব সমাজকে আনন্দ দানের জন্য সস্তা ও ধ্বংসাত্মক অনষ্ঠান প্রচার করা হয়। বিশেষ করে আমরা বলতে পারি টিভির বিজ্ঞাপনগুলো যুব সমাজকে ভোগ বিলাসের দিকে আকৃষ্ট করে তোলে। তাছাড়া ইন্টারনেটের মাধ্যমে অশালীন ছবি প্রচার করেও যুব সমাজের নৈতিক অবক্ষয় ঘটানো হয়।
তৃতীয়ত: সংবাদ পত্রের ভূমিকা : অপসংস্কৃতি প্রচারের আর একটি মাধ্যম হচ্ছে সংবাদপত্র। অধিকাংশ সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক পত্রিকায় নগ্ন ছবি, যৌনাবেগ সম্পর্কে কথিকা ইত্যাদি প্রকাশ করে তরুণ-তরুণীদের অবক্ষরেয় পথ সুগম করে। তাছাড়া খুন, যখম, চুরি-ডাকাতি, রাহাজানি ইত্যাদির ডালি সাজিয়ে সংবাদপত্র যে নৈবেদ্য পরিবেশন করে তাও যুব সমাজের মানসিক চিন্তাকে প্রভাবিত করে।
চতুর্থ: মাদক দ্রব্যের ভূমিকা : কোনো দেশে সম্প্রদায় মাদকাসক্ত হওয়ার অর্থ হচ্ছে সে দেশের নৈতিক চরিত্রের দেউলিয়াপনা ও অনিবার্য অধঃপতন। গাঁজা, ভাং, আফিম, হেরোইন, প্যাথড্রিন, কোকেন, এল এসিড, হাসিম, ইয়াবা ইত্যাদি নানা ক্ষতিকর মাদক দ্রব্য আজ সর্বত্র পাওয়া যায়। আর উঠতি বয়সের যুবক-যুবতীরা এ সুযোগ গ্রহণ করে জীবনকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
পঞ্চমত: রাজনৈতিক দলের কুপ্রভাব : রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের উদ্দ্যেশ্য চরিতার্থ করার জন্য তরুণদের দলে টানতে গিয়েও অনেক সময় বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন। রাজনীতিবিদরা তরুণদের তাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। নেতারা তরুণদের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে কুপথে পরিচালিত করেন। এমনকি তারা যুব সমাজকে ভোট ডাকাতি, লুট, হাইজ্যাক, গুন্ডামি করাতেও দ্বিধাবোধ করেন না। যার পরিণাম যুব সমাজের জন্য খুবই মারাত্মক হয়।
ষষ্ঠত: বেকারত্ব : যুব সমাজের বিপথগামীতার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে বেকারত্ব। তরুণ-তরুণীরা পড়ালেখা ছাড়া কোনো কাজ পায় না। তারা বাবা-মায়ের উপরও নির্ভর করতে পারে না। চাকরির চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে তারা অসৎ পন্থায় উপার্জনে নামে। তখন তারা চুরি, ডাকাতি, খুন, রাহাজানি, ছিনতাই, অপহরণ ইত্যাদি জঘন্য অপরাধ করতেও দ্বিধা করে না। এভাবেই বেকার, তরুণ-তরুণীরা জীবন সম্পর্কে হতাশাগ্রস্ত হয়ে নানা অপরাধে লিপ্ত হয়।
সপ্তমত: শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস : শিক্ষা ক্ষেত্রের অবস্থাও অনেক সময় যুব সমাজকে বিপথগামীতায় ইন্ধন যোগায়। ভর্তির সমস্যা, বইয়ের সমস্যা, ফল প্রকাশে অযথা বিলম্ব, যখন তখন ধর্মঘট ইত্যাদি তরুণদের মানসিক জগতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে। তাছাড়া শিক্ষাঙ্গনে মারামারি, বোমাবাজি লেগেই আছে। গুটিকতক সন্ত্রাসী সমন্ত ছাত্র সমাজকে সন্ত্রাসের মাধ্যমে জিম্মি করে রেখেছে, আর এর শিকার হচ্ছে আমাদের যুবসমাজ। নকল করে পাশ করার প্রবণতাও যুব সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
প্রতিকার :
যুব সমাজকে সুপথে ফিরিয়ে আনা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এ দায়িত্ব পালনের ভার সমাজের সচেতন মহলকে অবশ্যই নিতে হবে। ঈশ্বরের বাক্য বলে—“সেই রূপে যুবকদের সংযত হতে আদেশ কর” (পবিত্র বাইবেল, তীত ২:৬ পদ)। এ ব্যাপারে জাতীয় প্রচার মাধ্যমগুলো যথা-টিভি, সিনেমা ও সংবাদ পত্র-পত্রিকাগুলোকে গঠণমূলোক হতে হবে। তরুণ সমাজের জন্য রীতিমত খেলা-ধুলা ও শরীরর্চার ব্যবস্থা করতে হবে। নিস্কলুষ চিত্ত বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। বাক্য বলে—“হে যুবক তমি তোমার তরুণ বয়সে আনন্দ কর, যৌবনকালে তোমার হৃদয় তোমাকে আহ্লাদিত করুক, তুমি তোমার মনোগত পথ সমূহে ও তোমার চক্ষুর দৃষ্টিতে চল কিন্তু জানিও ঈশ্বর এ সকল ধরে তোমার বিচারে আনবেন। অতএব তোমার হৃদয় হতে বিরক্তি দূর কর, শরীর হতে দুঃখ অপসারণ কর, কেননা তরুণ বয়স ও জীবনের অরুণোদয়কাল অসার” (উপদেশক ১১:৯-১০পদ)। যুবকদের ধর্ম শিক্ষায় অনুপ্রাণীত করতে হবে। “তোমার যৌবন কাউকেও তুচ্ছ করতে দিও না, কিন্তু বাক্যে, আচার ব্যবহারে, প্রেমে, বিশ্বাসে ও শুদ্ধতায় বিশ্বাসীগণের আদর্শ হও” (১তিমথীয় ৪:১২পদ)। তাছাড়া সকল মাদক দ্রব্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। অপরদিকে কঠোর শান্তি দিতে হবে। আর তাহলেই আমাদের যুব সমাজের অবক্ষয় রোধ করা সম্ভব।
তরুণরাই হচ্ছে জাতির আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। তাদের বিপথগামীতার অর্থ সমস্ত জাতির জন্য মারাত্মক বিপদ। তাই দেশ ও জাতির কল্যাণ তাদের রক্ষা করতেই হবে। তাদের তারুণ্যকে সৎ ও সঠিক পথে পরিচালিত করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তাহলেই আমরা বিশ্বের দরবারে স্বাধীন জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব।
যুবকদের কাছে আমাদের আশা হচ্ছে—“যুবক কেমন করে নিজ পথ বিশুদ্ধ করবে? তোমার বাক্যনুসারে সাবধান হয়ে করবে। কিন্তু তুমি তোমার যৌবনকালের অভিলাষ হতে পলায়ন কর এবং যারা শুচি হৃদয়ে প্রভুকে ডাকে, প্রেম ও শান্তির অনুধাবন কর। আর যৌবনকালে আপন সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ কর, যেহেতু দুঃসময় আসছে এবং সেই বৎসর সকল সন্নিকট হচ্ছে, যখন তুমি বলবে এতে আমার প্রীতি নেই। যুবকগণ ও যুবতী সকলে, সদাপ্রভুর নামে প্রশংসা করুক, কেননা কেবল তাঁরই নাম উন্নত, তাঁর প্রভা পৃথিবীর ও স্বর্গের উপরিস্থ। বৎস, তুমি আমার ব্যবস্থা ভুলিও না, তোমার চিত্ত আমার আজ্ঞা পালন করুক, কারণ এ-দ্বারা তুমি আয়ুর দীর্ঘতা, জীবনের বৎসর বাহুল্য এবং শান্তি প্রাপ্ত হবে” (গীত ১১৯:৯, ১৪৮: ১২; হিতো ৩:১, ২তিম ২:২২পদ)।





Users Today : 62
Views Today : 70
Total views : 189235
