সারাবিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে আগেকার যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে বহুগুণ এগিয়ে আছে। দেশের বেশকিছু মেগা প্রকল্পসহ যোগাযোগ অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছে সরকার। গত এক দশকে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে।
এ উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ একদিন সারাবিশ্বের উন্নত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশও স্থান করে নিবে। কিন্তু সবচেয়ে বড়ো দুঃখের কথা হলো, দেশের জনগণের রাজস্বের টাকায় বাস্তবায়িত এসব অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি-অপচয় এখনও বন্ধ হয়নি। এ নিয়ে দেশের গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপকমাত্রায় বিরূপ ধারণা সৃষ্টির পাশাপাশি সরকারের দায়িত্বশীল মহলের মধ্যেও বিভিন্ন সময়ে ক্ষোভ ও উষ্মা প্রকাশ পেলেও এসব অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
দেশের ও দেশের মানুষের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একেকটি অবকাঠামো বাস্তবায়নের কয়েক বছরের মধ্যেই ভেঙে যাচ্ছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দেখতে পাই, দেশের বিভিন্ন জায়গায় সরকারি স্থাপনায় রডের বদলে বাঁশ ব্যবহারের ঘটনাও উদ্ঘাটিত হয়েছে। এমনকি প্রকল্পের কাজ চলমান অবস্থায় এবং আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগেই বিভিন্ন স্থানে ধসে পড়ার অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের রামডাকুয়া গ্রামে তিস্তার শাখা নদীর ওপর সাড়ে ৫ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত একটি ব্রিজের উদ্বোধনের আগেই এর সংযোগ সড়কে ধস নেমেছে। ২০১৯ সালে সেতুটির নির্মাণ কাজ শুরু করে চলতি বছরের এপ্রিলে কাজ শেষ হলেও এরই মধ্যে ৯৬ মিটার দীর্ঘ সেতুর দুই পাশে ৫০ মিটার সংযোগ সড়কে ধস দেখা দেয়ায় সেতুর ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়েছে।
পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার বনগ্রামে আত্রাই নদীর ওপর প্রায় পৌনে তিনকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সেতুর নির্মাণ কাজ গত জুন মাসে শেষ হওয়ার পর উদ্বোধনের আগেই সেতুর সংযোগ সড়কে ফাঁটল ও খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে ও গার্ডারপোল ভেঙে পড়েছে। নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ও শিডিউল বহির্ভূত উপায়ে মানহীন কাজের দরুণ এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয় জনসাধারণ ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। কয়েকদিন আগে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত বরিশালের উজিরপুরে ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সেতু উদ্বোধনের আগেই ভেঙে নদীতে পড়ে গেছে। সারাদেশে এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত ও অভিযোগ নিয়ে চলছে দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচি। এমনিতেই প্রতিবছর বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পের অনেকটাই বাস্তবায়ন করতে পারে না সংশ্লিষ্ট দফতর ও বিভাগগুলো।
আর যে সব প্রকল্প বাস্তবায়িত হয় তার বেশিরভাগই এমন সব অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুটপাটের শিকার হয়। কাজ বাস্তবায়ন করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো অহেতুক সময় ক্ষেপণ, আর্কিটেকচারাল প্ল্যানিং ও নির্ধারিত মানের নির্মাণ সামগ্রীর বদলে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে যেনতেন প্রকারে কাজ শেষ করলেও সংশ্লিষ্ট বিভাগের ইঞ্জিনিয়ার ও প্রকল্প পরিচালকরা যেন এসব অনিয়ম-দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকা পালন করে চলেছে। নির্মাণ ও সংস্কারের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই রাস্তা ভেঙে আবারো খানাখন্দ সৃষ্টির ফলে জনদুর্ভোগ বেড়ে যায়। জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়কের জরুরি সংস্কারে বার বার বাজেট বরাদ্দের নামে দেশের মানুষের রাজস্বের টাকার অপচয়-লুটপাটের মচ্ছব আর বন্ধ হচ্ছে না।
প্রতি বছর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বৃহত্তম অংশ ব্যয় করা হচ্ছে সড়ক ও সেতু বিভাগ এবং সড়ক পরিবহন খাতে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ জেলা-উপজেলা, পৌরসভার মত স্থানীয় সরকারের নিজস্ব উদ্যোগে নির্মিত প্রকল্পের সর্বত্রই অনিয়ম-দুর্নীতি, মানহীনতা ও যথেচ্ছাচার দেখা যায়। শুধু রাস্তা, সেতু-কালভার্টই নয়, স্কুল-কলেজের ভবন, হাসপাতাল, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় শিবির থেকে শুরু করে সরকারের বিশেষ প্রকল্প হিসেবে আশ্রয়ণ প্রকল্পের মত প্রকল্পেও এমন লুটপাট-অনিয়মের চিত্র দেখা গেছে।
দুর্নীতি যদি এভাবে চলতেই থাকে তবে এত এত মেগাপ্রকল্প সত্যিকার অর্থে ততটা ফলপ্রসূ হবে না, উন্নয়নের গতি একসময় স্থবির হয়ে পড়বে। তাই উন্নয়নের গতিকে সচল রাখতে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে যেকোনোভাবেই।





Users Today : 184
Views Today : 230
Total views : 182078
