ঠকাস্ ঠকাস্ ঠকাস্ শব্দ করে, চায়ের কাপে চামচ দিয়ে দুধ–চিনি মিলিয়ে চা বানিয়ে যাচ্ছে চাওয়ালা লোকটা। চুলার ওপর চায়ের কেটলিটা থেকে গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে, সাথে চায়ের পাগলকরা গন্ধ। এর মধ্যে এক কাপ চা শেষ করে আর এক কাপের অর্ডার দিয়েছে শরিফ। একদৃষ্টিতে লোকটার চা বানানো দেখছে , তার লোভাতুর চোখ দেখলে যে কেউ ভাবতে পারে ভীষণ লোভনীয় কোনো বস্তুর দিকে চেয়ে আছে সে। সত্যি বলতে কি, চা জিনিসটাই ভীষণ লোভনীয় শরিফের কাছে। ভেতর ভেতর একটা অদ্ভুত তাড়না অনুভব করছে সে। কখন চা বানানো শেষ হবে, কখন তার হাতে ধরা দিবে কাপটা। তারপর সে একটা তৃপ্তির চুমুক দিবে, এরপর সেই চা তার গলা বেয়ে ধীরে ধীরে নেমে যাবে নিচের দিকে । আহ্ কি তৃপ্তি!
২
শরিফ কখনই সেভাবে চা খেত না। চায়ের প্রতি তেমন টান কখনই অনুভব করত না। অনেককেই সে দেখেছে সকালে এক কাপ চা না খেলে নাকি তাদের মাথাব্যথা শুরু হয়ে যায়। তার সেরকম কিছু কখনই ছিল না। তবে বাড়িতে ছোটোবেলা থেকেই চা খাবার রেওয়াজ ছিল, তাই সেও খেত অল্প একটু-আধটু। কিন্তু অভ্যাসটা কখনও গেঁড়ে বসেনি।
শরিফ তখন ইউনিভারসিটির শেষের দিকে পড়ে। একদিন রাতে শরিফ তার ঘরে ঘুমিয়ে আছে, রাত কত হবে মনে নেই। হঠাৎ খুট-খাট শব্দে শরিফের ঘুম ভেঙে যায়। শরিফ চমকে চোখ খুলে দেখে তার বড়ো ভাই, বিছানার ওপর তার পায়ের কাছে বসে আছে। ঘর অন্ধকার—কিন্তু বাহিরের আলো ঘরে এসে পড়ায় আবছা আলোতে সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সে চোখ খুলে চমকে তাকাতেই তার বড়ো ভাই তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—কিরে তোর ঘুম ভাঙিয়ে দিলাম, না? খুব চা খেতে ইচ্ছা করছিল, কিন্তু কোথাও পেলাম না। বলেই ম্লান হাসল।
৩
এর বছর দুয়েক আগে, শরিফ তখন ইউনিভারসিটির ২য় বর্ষের ছাত্র। অল্প কয়েকদিন পরেই তার ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা। একদিন সকালে বেরিয়ে বাসায় ফিরতে বেশ দেরি হলো। রাত তখন কয়টা হবে? এই ৯টা সাড়ে ৯টা হবে। বাসার সামনে এসে দরজায় বেল দিতেই একটু পর তার ছোট বোন এসে দরজা খুলে দিলো। দরজা খুলে দিয়েই ছোটোবোন ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। শরিফ একটু হকচকিয়ে গিয়েছিল, বাসায় নিশ্চয়ই কারো কিছু হয়েছে। সে চোখ-ভরা প্রশ্ন আর অনেকটা আতঙ্ক নিয়ে ঘরে ঢুকল।
ছোটোবোনকে জিজ্ঞেস করল,
—কী হয়েছে?
কিন্তু সে কোনো উত্তর দিতে পারছিল না। ফুঁপিয়েই যাচ্ছিল। মা তার ঘরে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে, বাবা বসার ঘরে নির্বাক বসে আছে। কিন্তু বড়ো ভাইকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। সে আবার জিজ্ঞেশ করল,
—কী হয়েছে?
ছোটোবোন অনেক কষ্টে ফোঁপানো থামিয়ে বলল,
—বড়ো ভাই দরজা খুলছে না। কাল রাতে যে ঘুমাতে গিয়েছে এরপর আর সারাদিন দরজা খোলেনি, একবারের জন্যও না। সারাদিন ধরে দরজায় ধাক্কা দেয়া হয়েছে , কিন্তু দরজা একবারের জন্যও খোলেনি। সকালে নাস্তা খেতে ডাকা হয়েছে বের হয়নি, দুপুরেও খেতে বের হয়নি । খুব ভয় করছে।
বলেই আবার ফোঁপাতে শুরু করল। এরপর শরিফ অনেকক্ষণ দরজা ধাক্কাল , নাম ধরে ডাকল কিন্তু দরজা খুলল না। শেষ পর্যন্ত দরজা ভাঙা হয়েছিল। ঘরে ওর অচেতন, মৃতদেহটা পাওয়া গিয়েছিল।
৪
মৃত্যুর দুই বছর পর বড়ো ভাই একরাতে ফিরে এসেছিল। সেইটা কি শরিফের স্বপ্ন ছিল না কল্পনা, শরিফ এখনও বুঝে উঠতে পারে না। সেইরাতের পর শরিফ আর কখনও বড়ো ভাইকে দেখেনি। তবে সেই রাতের পর থেকে শরিফের যা হলো তা হচ্ছে চায়ের নেশা , প্রচণ্ড চায়ের নেশা। শরিফ এখন নেশাগ্রস্ত চোখে চা বানানো দেখছে। অধীর আগ্রহে বসে আছে কখন চা ভর্তি কাপটা তার হাতে এসে পৌঁছাবে।





Users Today : 47
Views Today : 51
Total views : 182200
