সুখনগর গ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে বিশাখার জন্ম। তার বাবা শ্যামশেখর পাল প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। চার ভাই-বোনের মধ্যে বিশাখা সবার ছোট। পরিবারে ছোট বলে জন্মের পর থেকেই সবার নয়নের মণি সে। বড় বোনের চেয়ে বয়সে আঠার বছরের ছোট বিশাখা। ললিতা ছোট থেকেই তার বোনটিকে মাতৃস্নেহে মানুষ করে তুলেছে। বিশাখার জন্মের পর থেকেই রীতাভরী দেবী অসুস্থ। তাই বাড়ির কাজ তেমন করতে পারত না। ললিতার বিয়ের পর থেকে বাড়ির সমস্ত কাজ বিশাখার বড় দুই ভাই রমেশ এবং রাজেশ করতো। আদরের ছোট বোনকে নিজের হাতে ভাত অব্দি খেতে দিত না। বিশাখার পড়া মুখস্থ করতে ভালো লাগত না, তার দুই দাদা পাশে বসে পড়ে পড়ে শোনাত এবং বিশাখা মুখস্থ করত।
মেধাবী হওয়ায় পরীক্ষার ফলাফল তার সবসময়ই ভালো হতো। উচ্চমাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করার পর বিশাখার ইচ্ছা সে অনার্স করবে, মাস্টার্স করবে। তারপর একটা বড় চাকরি করবে। বিশাখার বাবারও ইচ্ছা মেয়েটা সরকারি একটা চাকরি করুক। ললিতার বিয়ে হয়েছে রাজশাহীতে। তার স্বামী ব্যাংকে চাকরি করে। বিশাখা রাজশাহী কলেজে বাংলায় অনার্সে ভর্তি হয়। শুরু হয় তার নতুন জীবন। চোখে একরাশ স্বপ্ন। তাকে স্বাবলম্বী হতে হবে। কলেজে গিয়ে বন্ধুত্ব হয় কান্তার সাথে। কলেজ শেষে প্রতিদিন কান্তাদের বাড়িতে তার নিয়মিত যাতায়াত। আজ তার কলেজে ভর্তি হওয়ার দুই বছর কেটে গেছে। এই তিন বছরে অনেক কিছু চারপাশে বদলে গেছে শুধুমাত্র একটি ঘটনা বিশাখার জীবনে প্রতিদিন ঘটছে। তার কলেজের সামনে চায়ের দোকানে একটি সুদর্শন ছেলে দাঁড়িয়ে থাকে এবং বিশাখার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। বিশাখা যখন কলেজে যায় তখনও দেখে ছেলেটি দাঁড়িয়ে। আবার যখন কলেজ থেকে বের হয় তখনও দেখে একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এই তিনবছরে কখনো এই ঘটনার ব্যতিক্রম হয়নি। বিশাখার খুব ইচ্ছা যেদিন কলেজ ছেড়ে চলে যাবে সেদিন ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করবে কেন সে এমন করে। তবে সেদিনের জন্য আর তাকে অপেক্ষা করতে হয়নি। সেদিন কান্তাদের বাড়ি থেকে নোট নিয়ে ফিরছে হঠাৎই রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটি। কাছে এসেই হাতে গোলাপ দিয়ে বললো, আমার নাম রবি। আমি তোমাকে ভালোবাসি। বিশাখা অবাক হয়ে গেল। কিছু না বলেই বাড়ি চলে গেল। অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার পর কয়েকমাসের জন্য গ্রামের বাড়ি চলে গেল। কিন্তু বাড়িতে গিয়ে কিছুতেই তার মন বসছিল না। বারবার রবির কথা মনে পড়ে যায়।কয়েক মাস কাটার পর মাস্টার্সের ক্লাস শুরু হলে আবার বিশাখা কলেজ যাওয়া শুরু করে। আস্তে আস্তে রবির সাথে তার একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিশাখা ভেবেছিল রবি হয়ত উচ্চশিক্ষিত হবে। কারণ তার পোশাক,আচরণ সব কিছুতেই শিক্ষার ছোঁয়া আছে। হঠাৎ একদিন বিশাখার কলেজের বন্ধু তিমির ওদেরকে পার্কে ঘোরাঘুরি করতে দেখে। পরের দিনই তিমির বিশাখার কাছে রবির কথা জানতে চায়। বিশাখা জানায়, সে রবিকে ভালোবাসে। তিমির অবাক হয়, বলে একজন শিক্ষিত মেয়ে হয়ে তুমি ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়া একটি ছেলেকে কীভাবে ভালবাসতে পারো? বিশাখার তো মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। রবির সাথে দেখা করে সে জানতে চায়। রবি তার কাছে স্বীকার করে যে সে ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়েছে। কিন্তু বিশাখা ভাবে এতে তো রবির কোনো দোষ নাই কারণ বিশাখা তো কখনো তার কাছে এসব জানতে চায়নি। অন্ধের মতো ছেলেটি তাকে ভালোবেসেছে। মাস্টার্স পাস করে বিশাখা চাকরির পরীক্ষা দেওয়া শুরু করে। তবে এরমধ্যেই তার জামাইবাবু এক ডাক্তার ছেলের সাথে তার বিয়ে ঠিক করে ফেলে। বিশাখা একদিন বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে রবিকে বিয়ে করে। এতদিন পর্যন্ত রবির পরিবার সম্পর্কে বিশাখার কিছুই জানা ছিল না। তার ধারণা ছিল বিয়ের পর যখন সে ভালো একটা চাকরি করবে তখন তার পরিবারের সবাই তাকে আর ভুল বুঝবে না। রবির পরিবার গোঁড়া যৌথ পরিবার। অর্থের অভাব নেই তবে পরিবারের মানসিকতা বিশাখার পরিবারের সাথে কোনোভাবেই খাপ খায় না। বাড়িতে বৌ নিয়ে প্রবেশের সাথে সাথে তাকে বেশ ঘটা করে বরণ করা শুরু হয়ে গেল কারণ রবি তার বিয়ের কথা আগে থেকেই তার বাবার কাছে বলেছিল। বাড়িতে ঢোকার পর রবির বাবা বিশাখাকে বলল তোমার সার্টিফিকেটগুলো সাথে করে এনেছো তো? বিশাখা বাড়ি থেকে আসার সময় এই একটা জিনিসই সাথে এনেছে। কারণ সে জানতো চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এগুলো তার কাজে লাগবে। বিশাখা উত্তরে জানালো এনেছি বাবা। শ্বশুর জ্ঞানদারঞ্জন ম-ল বলল, ওগুলো আমার হাতে দাও। বিশাখা ভেবেছিল, তার চাকরির জন্যই হয়ত শ্বশুর এসব চাইছে। বিশাখা সার্টিফিকেটগুলো হাতে দেওয়ার পর শ্বশুর বললো, এসব এখন থেকে আমার সিন্ধুকে থাকবে। বিয়ে করে এ বাড়িতে এসেছো ঘরকন্না করো। আমার টাকার অভাব নাই, আমার বাড়ির বৌ চাকরি করবে না। সেদিন থেকেই বিশাখার সব স্বপ্ন সিন্ধুকে বন্ধ হয়ে গেল। বাড়ির অমতে বিয়ে করেছিল বলে বাড়ির কেউ তার সাথে যোগাযোগ রাখেনি। শুধু তার দিদির সাথে যোগাযোগ আছে।
বিশাখা এখন রীতিমতো গৃহিণী। এক ছেলে-এক মেয়ের মা। মেয়েটাকে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন। মেয়েটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, বিশাখার ইচ্ছা মেয়েকে সে স্বাবলম্বী করবে, এর জন্যে যদি তার পরিবারের বিরুদ্ধে যেতে হয় তাতেও বিশাখা পিছপা হবে না। কিন্তু এবারও বিশাখার স্বপ্ন অধরা থেকে গেল। বিশাখার একমাত্র মেয়ে কনীনিকা নিজের পছন্দ করা একটি ছেলের সাথে বিয়ে করে গার্হস্থ্য ধর্ম পালনকেই বেছে নেয়।
রবি এখন অনেক বদলে গেছে। এই বয়সে এসে সে অন্য একটি মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে। মেয়েটির নাম মিতা, স্বামী মারা গেছে। এখন সে বিধবা। রবি প্রায় প্রতিদিনই তার বাড়িতে যাতায়াত করে। বিশাখা সব জেনেও চুপ করে থাকে। তার তো যাওয়ার কোনো জায়গা নাই, আজ যদি তার একটা চাকরি থাকতো তাহলে এ বাড়ি থেকে দূরে গিয়ে সে থাকতো। শ্বশুর মারা যাবার আগের রাতে বিশাখার কাছে সেই সার্টিফিকেটগুলো তুলে দেয়। বিশাখা হাতে নিয়ে ভাবে, এগুলো দিয়ে এখন আর কী করবে সে। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে রবির বাড়াবাড়িটা বেড়ে গেছে। রাত করে বাড়ি ফিরছে আর বিশাখার গায়ে হাত পর্যন্ত তুলছে।
ইতিমধ্যে বিশাখার ছেলে নিলয় একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি পায়। বিশাখা এখন নিলয়ের সাথে আলাদা বাসায় থাকে। রবির কোনো খবর আর সে রাখে না।বাড়িতে ছোট বাচ্চাদের সে প্রাইভেট পড়ায়। বাড়ির পাশের একটি বৃদ্ধাশ্রমে সে শিক্ষিকা। এতদিনে তার স্বপ্ন ডানা মেলেছে।





Users Today : 139
Views Today : 179
Total views : 182027
