বছরের শেষান্তে এসে অনূর্ধ্ব ১৯ নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে বাংলার মেয়েরা শিরোপা জিতেছে। ঢাকার বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে প্রতিবেশীদের ১-০ গোলে হারিয়ে নিজের করে নিয়েছে চ্যাম্পিয়নশিপ ট্রফি। অনূর্ধ্ব ১৯ নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের দলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক খেলোয়াড় ছিল আদিবাসী। সেদিন মাঠে নেমেছিলেন মারিয়া মান্দা (অধিনায়ক), রূপনা চাকমা, আনাই মগিনি, মনিকা চাকমা, ঋতুপর্ণা চাকমা। এছাড়াও বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে আনুচিং মগিনি, কেমি চাকমা, সোহাগি কিস্কু, কোহাতি কিস্কু, শিউলি আজিম, সুরোধানি কিস্কু’দের নিয়মিতই পদচারণা রয়েছে। জেলা, বিভাগ পেরিয়ে জাতীয় দলে নাম লেখানো সহজ কাজ নয়, সেই অজেয় কাজটিই আদিবাসী মেয়েরা প্রতিভার জোরেই নিজেদেরকে মেলে ধরতে পেরেছে। সহজেয় অনুমিত হয় যে, ঝাঁকে ঝাঁকে আদিবাসীরা মেয়েরা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ফুটবলের মাঠকে রপ্ত করে চলেছে। আমরা দেখেছি, জাতীয় ফুটবল দল অনূর্ধ্ব ১৬ তে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার খলিষাখালীর মেয়ে প্রতিমা মুণ্ডা ডাক পেয়েছেন। প্রতিমা গত এক বছর ধরে বিকেএসপির ফুটবল অনূর্ধ্ব ১৬ ফুটবল টিমে খেলে আসছে। সপ্তম শ্রেণীতে পড়–য়া মেয়েটির ফুটবল জাদুর সত্যিকার মূল্যায়নে টিএনও এবং উপজেলা চেয়ারম্যান ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। ইতিমধ্যেই স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিক প্রতিবেদন লক্ষ করেছি, দেশের আদিবাসী মেয়েদের ফুটবলের প্রতি আকর্ষণ ও ভালোবাসা। হবিগঞ্জের চুনারুঘাট চা শ্রমিক পরিবারের মেয়েরা ফুটবলে ঝলক দেখাতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও খেলাধুলা চালিয়ে যাচ্ছে। তালিকায় দেখা যায়-পূজা মুণ্ডা, সুমা রায়, দীপা ওরাঁও, জনিত মুণ্ডা, প্রতিমা ওরাঁও, জ্যোতি ওরাঁও, জবা রাজবংশী, মণি রাজগড়, সুরমণি ওরাঁও, লাবনি নায়েক, রিমি গোয়ালা, দীপা মুণ্ডা, শ্যামলী বসাকসহ অনেকে। সিলেট জেলার স্পার্টান এমকো গ্যালাকটিকো এফসি দলের হয়ে লড়ে যাচ্ছেন অনেকে, আবার কেউ কেউ অখ্যাত দলেও নাম লিখিয়েছেন। তবে আশাজনক কথা হচ্ছে, ইতিমধ্যে ডজনখানেক মেয়ে জেলা পর্যায়ে ফুটবল কসরত দেখিয়ে নির্বাচকদের চোখে স্বপ্ন বীজ গুঁজে দিতে সক্ষম হয়েছেন। উল্লেখ্য যে, এসব আদিবাসী-অন্ত্যজ ও চা জনগোষ্ঠীর মেয়েদের খুঁজে পাওয়া গেছে বঙ্গমাতা ফুটবল খেলার মাঠ থেকে। এখন প্রয়োজন শুধু তাদের ভালোবাসা, যত্ন নেওয়া ও দেশের হয়ে সম্মান বয়ে আনার মানসিকতা তৈরি করা।
২
চাঁপাইনবাবগঞ্জের মেয়ে সুরোধানি কিস্কু রাজশাহী বঙ্গমাতা মহিলা ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২১ অনুষ্ঠিত খেলায় জাতীয়ভাবে সেরা গোলকিপার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। সুরোধানি জেলার মাসুদ-উল হক ইনস্টিটিউট অধ্যয়নরত অবস্থায় ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে নাম লিখিয়েছিল, এখন সে জাতীয় দলের নিয়মিত সদস্য। তার গ্রামের নাম আতাহার। ইনস্টিটিউটের আদিবাসী সাঁওতাল মেয়েদের পায়ের জাদুতেই বিদ্যালয়টি ২০১১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে আন্তঃবিদ্যালয় ফুটবল প্রতিযোগিতায় জেলা পর্যায়ে টানা পাঁচবার ও বিভাগীয় পর্যায়ে দু’বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ফুটবলের পাশাপাশি হ্যান্ডবলেও বেশ সুনাম অর্জন করেছে আদিবাসী মেয়েদের বদৌলতে। ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে ফুটবলে অপেক্ষাকৃত আরো উন্নয়নের লক্ষ্যে এগিয়ে আসে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে অত্র এলাকার ৪টি বিদ্যালয়ের ৩২ জন ছাত্রী নিয়ে ১৫ দিনের প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছিল। মাসুদ-উল হক ইনস্টিটিউট মাঠে অংশ নেওয়া ৩২ জনের মধ্যে ১৮ জনই ছিল আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মেয়েরা; আর ১৮ জনের মধ্যে ১৩ জনই আতাহার গ্রামের বাসিন্দা। এ বিদ্যালয়ের সরল নিয়মই হচ্ছে ৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত খেলাধুলা করতে পারবে শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুজোতা টুডু অভিব্যক্তি হচ্ছে, ‘আমি মাসুদুল হক ইনস্টিটিউটে ক্লাস নাইনে পড়ি, জেলা স্কুল থেকে আমরা খেলি। তাছাড়া আর কোনো খেলার সুযোগ পাই না। আমি চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে রাজশাহী বিভাগে খেলেছি। সেখানে বিভাগ চ্যাম্পিয়ন হয়ে রংপুর বিভাগে খেলেছি, সেখান থেকে আমরা রানার-আপ হয়েছি। আমার ইচ্ছা আছে খেলব, আরও ইচ্ছা আছে আমি ন্যাশনাল টিম থেকে খেলব। যদি আমাদের একটি ক্লাব থাকতো, তাহলে ভালো খেলার সুযোগ পারতাম।’ মাসুদ-উল হক ইনস্টিটিউটের প্রধান শিক্ষক নাসিউল আলম বলেছেন, ‘আমার এই ফুটবলার ছাত্রীরা অত্যন্ত প্রতিভাধর। এদের কল্যাণেই নিজ জেলায় আজ আমাদের মুখ উজ্জ্বল হয়েছে। সুযোগ পেলে এরা অনেক বড়ো ফুটবল খেলোয়াড় হবে।’ আমরা বিশ্বাস করি, আদিবাসীরা মেয়েরা সুযোগ পেলে ফুটবল ও হ্যান্ডবলেও দেশে ও জাতীয় অঙ্গনে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারবে।
৩
জাতীয় মহিলা দলের অধিনায়ক মারিয়া মান্দা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘বাল্যবিবাহ আর দেখতে চাই না। বাল্যবিবাহের কারণে অনেক মেয়ের স্বপ্নই অপূর্ণ থেকে যায়। সে হয়তো খেলোয়াড় হতে চেয়েছে বা অন্য কিছু, সেটা আর হয়ে ওঠে না। তাই দেশে বাল্যবিবাহ আর দেখতে চাই না। এটা বন্ধ হলে বিভিন্ন খেলায় আমাদের খেলোয়াড়ের সংখ্যাও বাড়বে। খেলোয়াড় না হলে কেউ শিক্ষক বা অন্য পেশায় যাবে। গোটা বাংলাদেশই তাতে উপকৃত হবে।’ জাতীয় জীবনে যেমন বাল্যবিবাহের প্রচলন এখন রয়েছে, আদিবাসী সমাজেও রয়েছে এটির প্রকাশ্য প্রভাব। জাতীয় দলের অধিনায়কের অন্তনির্হিত ভাবোক্তিতে বেরিয়ে এসেছে একটি অশনী সংকেত। বিশেষ করে সমকালীন সময়ে যে হারে আদিবাসী নারীরা ঘরে-বাইরে নির্যাতন-অত্যাচার, শ্লীলতাহানী-ধর্ষণের মতো মানবতা বিরোধী অপরাধ বেড়ে চলেছে, এতে করে আদিবাসী সমাজের মা-বাবা’রা নিরাপত্তাহীনতা চরমভাবে উপলব্ধি করে থাকেন। আর এগুলো ঘটে থাকে প্রতিবেশী অর্থ-বিত্ত- রাজনৈতিকভাবে মদদপুষ্ট ব্যক্তিবর্গ দ্বারা। সন্তান-সন্ততিদের বেড়ে ওঠার নিরাপদ পরিবেশের অভাববোধে কিশোরী বয়সেই বিয়ে দিতে উদ্যত হয়ে থাকেন। ব্যক্তিগতভাবে অনেক অভিভাবকদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছি, মোটা দাগে বোঝাতে চেয়েছেন-আমাদের মেয়েদের কোনো দূর্ঘটনা ঘটলে কী হবে? সমাজের চোখে অপাঙ্ক্তেয় হওয়ার চেয়ে বিয়ে দিয়ে বাবা-মায়ের দায়িত্ববোধটিকে সম্পন্ন করা নৈতিক দায়-দায়িত্ব। সত্যিই তো একটিও আদিবাসী নারীদের হত্যা, ধর্ষণ, শ্লীলতাহানী, সামাজিকভাবে অপদস্তের কোনো বিচার নিস্পত্তি হয়নি। বোধ করি, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ন্যায় বিচার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান নিশ্চিত হলেই বিশেষত আদিবাসী মেয়েরা ক্রীড়াজগতকে আরো দিতে সক্ষম হবে; দেশকে উচ্চ থেকে উচ্চে শিখরে পৌঁছতে সর্বশক্তি প্রয়োগে পিছপা হবে না।
২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে ধর্মীয় উগ্রবাদী-মৌলবাদিদের হুমকি-ধামকিকে উপেক্ষা করে ফুটবল ইতিহাসে মেয়েদের ফুটবলের নব অধ্যায়ের সংযোজন হয়েছিল। শম্বুুুক গতিতে অগ্রসর হওয়া দলের আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে প্রথম আমন্ত্রণ পৌঁছেছিল ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে, এ বছর বাছাইপর্ববিহীন মেয়েদের দল খেলেছিল-গুয়াম, হংকং, জাপানের বিপক্ষে। ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দেই আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক হয়েছে বাংলাদেশের মেয়েদের। দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব ১৭ চ্যাম্পিয়নশিপে খেলতে যাওয়া ২৩ সদস্যদের মধ্যে ১১ জনই ছিল আদিবাসী মেয়েরা। দীর্ঘ বছর পর সেই দলের অন্যতম সদস্য অংম্রা বলেছেন, ‘একজন মেয়ে ফুটবলার হিসেবে এটা ভাবতেই অনেক গর্ব হয়।’ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ফুটবলার মেয়ে ভবানী মুণ্ডাকে ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বঙ্গরত্ন’ সম্মানে ভূষিত করেছিলেন। তাঁরই দেখাদেখি এখন জেলা থেকে জাতীয় পর্যায়ের প্রতিটি স্তরই আদিবাসী মেয়েদের পদচারণায় মুখরিত হয়েছে। আমরা স্বপ্ন দেখি, আমাদের মেয়েরা দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে, আঞ্চলিক থেকে বিশ্বা ফুটবলেও প্রতিভা, দক্ষতা ও ট্রফি উপহার দিয়ে সম্মান বয়ে আনছে। দেশের সম্মানে আমরাও সম্মানিত ও গর্বিত হই।
মিথুশিলাক মুরমু : আদিবাসী বিষয়ক গবেষক ও লেখক।





Users Today : 24
Views Today : 25
Total views : 186500
