প্রতিবেশী দেশ ভারতের ‘ইউনিট বুক সেন্টার’ থেকে সদ্য প্রকাশিত ‘অভিনব বাংলা অভিধান’-এ অধ্যাপক দেবাশিস দত্ত সাঁওতাল শব্দের সংজ্ঞা করেছেন- ‘সাঁওতাল পরগনার আদিম অধিবাসী, অসভ্য জাতি বিশেষ।’ এই সংজ্ঞার ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করেছেন যাদবপুর বিশ^বিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মেরুনা মুরমু। ক্ষুব্ধ হয়েই বলেছেন, ‘হ্যাঁ আমরা অসভ্যই তো।’ আমরাও অবশ্যই এই সংজ্ঞায়নের প্রতিবাদ ও ধিক্কার জানাই। সাঁওতাল শব্দের অর্থ খোঁজার আকাক্সক্ষা আরো বেড়ে গিয়ে বই-পুস্তক ঘাটাঘুটির প্রয়াস চালিয়েছি।
১. আমাদের বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধানÑপরিমার্জিত সংস্করণ’-এ পাওয়া যায়Ñ সাঁওতাল: {শাঁওতাল} বি ভারতীয় উপমহাদেশের আদিম জাতি বিশেষ।
২. Det Norske Videnskaps Akademi I Oslo থেকে প্রকাশিত P. O Bodding কর্তৃক প্রণীত A Santal Dictionary -তে পাওয়া যায়- The word is used by foreigners about the Santals and may be used by Santals to foreigners who are thought not to know better. The word is explained by the Santals themselves as meaning ‘one who belongs to Sant or Sãot, or Sãt a country in the Midnapur district (the present silda pargana). The name may also be connected with Santbhum (also Samantabhum) in the Bankura district, the Santals simply saying that it is on the other side of Sikhar. Sãt is probably an abbreviation of Skr. Samanta, boundary; the meaning might thus be ‘a borderman’. Some have thought it should be derived from samantawala. In English, the word is written also Santhal and Sonthal; the district where more Santals live then in any other, is the Santal Parganas (also written in several ways Santhal or Sonthal Parganas or Pergunnahs, etc.). If the Santal explanation is correct… ’
৩. খেরওয়াড়দের একটি অংশ কীভাবে সাঁওতাল নামে পরিচিত হলো এ সম্পর্কে একটি অতি প্রাচীন লোককথার এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত¡ বিভাগের প্রধান কে. পি চট্টোপাধ্যায় এটি সংগ্রহ করেছিলেন। পূর্বকালে খেরওয়াল সমাজে বিবাহিত স্ত্রীর মৃত্যু হলে মৃতদেহ দাহ করার পর অর্ধেক অস্থিভস্ম স্বামীর গ্রামে সমাহিত করা হতো এবং বাকি অর্ধেক জন্মস্থানে সমাহিত করার জন্য পিত্রালয়ে মেয়ের বাবা কিংবা ভাইয়ের হাতে তুলে দেওয়া হতো। একবার এক ব্যক্তি মৃতা স্ত্রীর অস্থিভস্ম তার পিত্রালয়ে দিতে যায়। ঐ দিনই গ্রামে এক বিবাহ অনুষ্ঠান ছিল। অস্থিভস্ম গ্রহণ করলেই সমস্ত গ্রাম অপবিত্র হবে এবং বিবাহ অনুষ্ঠান আটকে থাকবে বলে গ্রামের কিছু লোক মেয়ের বাবাকে সেদিন অস্থিভস্ম গ্রহণ করতে নিষেধ করল। মেয়ের বাবা তাদের কথামতো অস্থিভস্ম না নিয়ে জামাইকে অন্য একদিন আবার আসতে বলল। জামাই এতে অপমানিত বোধ করল এবং মেয়ের বাড়ির লোকজনের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি শুরু হলো। শেষে সে রাগ করে সেখানেই অস্থিভস্ম রেখে নিজের গ্রামে ফিরে গেল। মেয়ের বাবা ও ভাইরাও রেগে অস্থিভস্মের আধারটা পাশের নদীতে ছুঁড়ে ফেলে দিলো। ব্যাপারটা কিন্তু এখানেই মিটল না। গ্রামে দুটো দল দেখা দিল। কিছু লোক মেয়ের বাবাকে আর কিছু লোক জামাইকে সমর্থন জানাতে লাগল। একদল বলতে লাগল যে, অস্থিভস্ম গ্রহণে বাধ্য করে গ্রামবাসীদের অপমান করার অধিকার জামাইয়ের নেই। অন্যদল বলতে লাগল, অস্থিভস্ম গ্রহণ না করে মেয়ের বাবা নীতি বিরুদ্ধ কাজ করেছে। শেষে দুদলের মধ্যে বিবাদের মাত্রা এত বেড়ে গেল যে, কথাটা দেশের আদিবাসী রাজা সান্তার কানে গিয়ে পৌঁছাল। খেরওয়াল রাজা সান্তা বিরোধ মিটাবার জন্য নদীর ধারে এক বিরাট সভার আয়োজন করে সমস্ত খেরওয়াল গোষ্ঠীকে সেই সভায় ডাকলেন। রাজা সান্তা সেই সভায় বললেন, যে অস্থিভস্ম সমাহিত করার অনুষ্ঠান (জাঙ তপা) নিয়ে সারা দেশে প্রবল অশান্তি দেখা দিয়েছে, সেজন্য তিনি এটা অবিলম্বে মিটিয়ে ফেলতে চান। সঙ্গে সঙ্গ আরো কয়েকটি সমস্যারও সমাধান করতে চান। প্রথমত, বিবাহের পণের টাকা খুশিমতো নেওয়া হচ্ছে বলে অনেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করছে। এমনকি এই পণের টাকা নিয়ে প্রায় ঝগড়াঝাটি হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ‘জাঙ তপা’ অনুষ্ঠানে কোনো আত্মীয় যদি কোনো কারণবশত উপস্থিত হতে না পারে, তাহলে তার প্রতি নানারকম অশালীন মন্তব্য করা হয়। এ নিয়েও প্রায় কলহ-বিবাদ দেখা দিচ্ছে। তাই তিনি পুরাতন রীতি-নীতির বদলে নতুন কয়েকটি নিয়ম সমাজে চালু করতে চান। সেগুলি হচ্ছে-বিবাহের পণের টাকা নির্দিষ্ট করা হবে। বিবাহিত স্ত্রীর মৃত্যুর পর সৎকার একমাত্র স্বামীর পরিবারই করবে। আর ‘জাঙ তপা’ অনুষ্ঠান বলে কোনো অনুষ্ঠান থাকবে না, অস্থিভস্ম দামোদরে বিসর্জন দেওয়া হবে। কিন্তু অনেকেই পুরাতন প্রথা তুলে দিয়ে নতুন প্রথা চালু করতে রাজী হলো না। রাজা তখন ভোট নিতে চাইলেন। এদিকে দুপুর পেরিয়ে গেছে, প্রত্যেকের বেশ খিদে পেয়েছে। এ অবস্থায় ভোট নেওয়া সম্ভব নয়। রাজা সান্তা বললেন, যারা তাঁর নতুন বিধান গ্রহণ করতে চায় তারা শালপাতায় (সারজম সাকাম) এবং অন্যরা শিয়াড় পাতায় (লাড় সাকাম) খাবার খাবে। খেরওয়ালরা দুদলে বিভক্ত হয়ে খাওয়া-দাওয়া শুরু করল। দেখা গেল দুদলই সমান সমান। সুতরাং নতুন বিধান জোর করে চাপানো গেল না। কিন্তু খেরওয়াল সমাজ দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। যারা সান্তার নতুন বিধান মানতে লাগল, তারা সান্তাড় বা সান্তাল নামে পরিচিত হলো। অন্যরা লাড় পাতায় খাবার খেয়েছিলো বলে ‘লাকড়া’ আখ্যা পেল। এই লাড়কাদেরই ‘হো’ বলা হয়। পরবর্তীকালে লাড়কাদের সঙ্গে সাঁওতালদের বহুদিন ধরে যুদ্ধ চলেছিল।
উপমহাদেশে সাঁওতালরা স্মরণাতীতকাল থেকেই বসবাস করে আসছে। আদিম জাতি হিসেবে সুপরিচিত, এটিতে ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক কিংবা নৃতাত্তি¡ক দিক থেকে কোনো সন্দেহ নেই। তবে হ্যাঁ, আদিম হলেও তাদের মধ্যে সমাজ পরিচালনার কাঠামো, সামাজিক শৃঙ্খলার কঠোরতা এবং পারস্পরিক সম্মানবোধের যেসব দৃষ্টান্ত ধারাবাহিকভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্মরা আঁকড়ে রেখেছে, সেটিকে কখনোই আদিম বা অসভ্য বলে প্রতীয়মান হয় না।
অসভ্য শব্দটি খুবই অসম্মানজনক, যার অর্থ হতে পারে মানুষ হিসেবে তারা সেটি কখনো করতে পারে না। মানবতাবোধ তাদের মধ্যে অনুপস্থিত, হিংস্রতা তাদের পশু তুল্য। আর যদি খাদ্যাভাস কিংবা জীবন যাপনের মাপকাঠিতে বিচার করা হয়, তাহলে শুধু সাঁওতাল কেন সমগ্র মানবগোষ্ঠী কোনো না কোনো সময় কাঁচা মাংসা খেয়েছে, নেংটি পরেছে। সাঁওতালরা বন্য শূকর থেকে শুরু করে আকাশের শকুন পর্যন্ত খেয়েছে। সাঁওতাল বিদগ্ধ ব্যক্তি বলেছেন-‘আকাশের উড়োজাহাজ আর জলের জল জাহাজ ছাড়া সাঁওতালরা সবকিছুই খেয়ে হজম করেছে। অর্থাৎ স্রষ্টার সৃষ্টিতে খাবার রুচি থাকলেই খাওয়া যায়’। তারপরও সভ্য-অসভ্যতার দিকগুলো বিবেচনার্থে উল্লেখ করছি-
১. সমাজ পরিচালনার জন্য গ্রাম্য সমাজ-মাজহী পরিষদ, এলাকা নিয়ে দেশ মাজহী এবং নির্দিষ্ট বিশাল এলাকা নিয়ে পরগনা মাজহী ব্যবস্থা স্বীকৃত ও স্বীকার্য;
২. সাঁওতালরা রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়ের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হোন না; নারী-পুরুষের একই টাইটেল হলেও বিবাহ রীতিসিদ্ধ বলে গ্রহণীয় নয়। উল্লেখ্য যে, সমগ্র সাঁওতাল সমাজ ১২টি টাইটেল এবং এই টাইটেল থেকে টোটেম পদ্ধতিতে কমপক্ষে ৪০৫টি উপগোত্র শাখা-প্রশাখার মতো বেরিয়ে এসেছে।
৩. নারীদেরকে ঘরের দেবী (ঙৎধশ ইড়হমধ) হিসেবে সম্মান করা হয়। নারীরা হাটে-মাঠে-ঘাটে পুরুষের সাথে সমানতালে কাজ করতে সমর্থ;
৪. সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে নারী-পুরুষের সমানাধিকার রয়েছে। অর্থাৎ পূজা-পার্বণ, মেলা, বিয়ে কিংবা ছোটোখাটো অনুষ্ঠানাদিতে অংশায়ন নিশ্চিতকরণ করে;
৫. স্বাধীনতার চেতনায় উদ্ভাসিত মানসিকতা-ভারতবর্ষে ব্রিটিশ বিরোধী বিদ্রোহ তিলকা মুরমু’র নেতৃত্বে (১৭৭২), ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫), আদিনা বিদ্রোহ (১৯৩২), নাচোল বিদ্রোহ (১৯৪৯) এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে (১৯৭১) সাঁওতাল নারী-পুরুষের স্বতঃস্ফ‚র্ত অংশগ্রহণ করে। বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক কামরুন নাহার, ‘তোরা কি সাঁওতালই থাকবি, মানুষ হবি না’ শীর্ষক প্রবন্ধ লিখেছেন (উইমেন চেপ্টার, নভেম্বর ১১, ২০১৬)। গৌতম দাস বাউল সাঁওতালদের নিয়ে রচনা করেছেন গান- ‘আমায় সাঁওতাল করেছে ভগবান গো’ অর্থাৎ সাঁওতালদের সৃষ্টিকর্তা মানুষ করেনি। চমকপ্রদ শিরোনাম হতে পারে এবং এটির গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাও থাকে কিন্তু একটি অভিধানে এরূপ লিপিবদ্ধ করা বুদ্ধিদীপ্ত বৈশিষ্ট্যের আওতায় পড়ে না। আমরা অধ্যাপক দেবাশিস দত্তের এহেন সংজ্ঞায়নকে অবজ্ঞা করি, উদ্দেশ্যমূলকভাবে সাঁওতালদের বীর্যের ইতিহাসকে লুপ্ত করতেই হীন প্রচেষ্টা বলে মনে করি। প্রত্যাশা করি, প্রকাশক ‘ইউনিট বুক সেণ্টার’ দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটানের লক্ষ লক্ষ আদিবাসী সাঁওতালদেরকে কৃতার্থ করবেন।
মিথুশিলাক মুরমু : আদিবাসী বিষয়ক গবেষক ও লেখক।





Users Today : 65
Views Today : 68
Total views : 177319
