২০১৯ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। পরীক্ষায় সফলতা অর্জনকারী ছাত্র-ছাত্রীরা আনন্দিত হচ্ছেন। তাদের পাশাপাশি তাদের পিতামাতাগণও সন্তানের সফলতায় আনন্দিত হচ্ছেন। এমনতর অবস্থার মধ্যেও একটা বিষয় ছেলে-মেয়ে আর তাদের পিতামাতার মনে উদ্বেগ আর উৎকন্ঠার সৃষ্টি করে। আর সেটা হচ্ছে ছেলে-মেয়েদের উচ্চ শিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা। এ এক মহাযুদ্ধ। কেননা একজন ভর্তিচ্ছু ছাত্র অথবা ছাত্রীকে দেশের সবকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফরম সংগ্রহ করতে হয়। যথাযথভাবে পূরণ করে তা জমা দিতে হয়। এতে অর্থ, শ্রম ও সময় ব্যয় হয় প্রচুর। বিত্তবান সচ্ছল পরিবারের সন্তানদের কথা বাদ দিয়ে আর্থিক সংকটের মধ্য থেকে যারা লেখাপড়া করছে এবং ভাল ফলাফল করে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছে তাদের পক্ষে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরম সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। ফরম সংগ্রহ ও জমা দেয়ার পর শুরু হয় দৌড় ঝাঁপ। আজ সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে বিকালে ছুটতে হয় চট্টগ্রাম বা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য। এতে তারা হয়রানির শিকার হয়। মানসিকভাবে পর্যুদস্ত বা বিধ্বস্ত হয়। আর শারীরিকভাবে ক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্ত হয়ে যায়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা ব্যবস্থা করা হলে এমনটি হতো না। ভর্তি ইচ্ছুক ছাত্র-ছাত্রীদের পছন্দমত কেন্দ্র থেকে পরীক্ষা দিয়ে যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সুযোগ পেত। এতে করে তাদের হয়রানি কম হত। অর্থের সাশ্রয় তো অবশ্যই হতো।
জানা গেছে, ২০১৯-২০২০ শিক্ষা বর্ষ থেকে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নিতে সম্মত হয়েছে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ও কৃষিতে প্রাধান্য থাকা ৮টি বিশ্ববিদ্যালয়। এ ৮টি বিশ্ববিদ্যালয় হলোÑবাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয় এবং সমধারার পটুয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা উপমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার গুরুত্বের বিষয়টি বলেছেন। কর্তৃপক্ষ যেখানে ইচ্ছুক বা সচেষ্ট সেখানে তা বাস্তবায়ন না হওয়ার কথা নয়। কিন্তু কেন তা হচ্ছে না? নাকি কোন অদৃশ্য শক্তির কালো হাতের থাবায় বন্ধ হয়ে আছে শিক্ষা ব্যবস্থার মতো একটা জাতীয় ও জনগুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার বাস্তবায়ন। মেডিক্যাল কলেজগুলোতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা চালু আছে এবং তা যথেষ্ট সুনামের ও সফলতার সাথে কাজ করছে। মেডিক্যাল ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যদি সমন্বিতভাবে ভর্তি পরীক্ষা নেয়া যায় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ পদ্ধতি প্রবর্তন করা কেন সম্ভব হবে না?
তাহলে কি আমরা ধরে নেব বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চৌকস, বুদ্ধিদীপ্ত, উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন এবং মেধা মননশীল লোকের অভাব বা খরা চলছে, তাই তারা এমন যুগোপযোগী ও সীমিত ব্যয়ের ভর্তি পরীক্ষা প্রবর্তন করতে পারছেন না। এটা তাদের দীনতা আর অপশক্তির নিকট হার মেনে নতজানু হয়ে বসে থাকা। এ হার মানা হার পরে তারা আনন্দ আর তৃপ্তি বোধ করলেও জাতি আর জাতির ভবিষ্যৎ ওই সমস্ত শিক্ষার্থীদের কাছে তারা ঘৃণিত, নিন্দিত আর কলঙ্কিত। কেননা তাদের অপারগতা, নির্লিপ্ততা, উদাসীনতা এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থের প্রতি গুরুত্ব প্রদান না করায় দেশের ভবিষ্যত প্রজন্মের যে ক্ষতি হচ্ছে তার দায়ভার তাঁদেরই। এটা তারা এড়াতে পারবেন না। অস্বীকারও করতে পারবেন না। যে কোনো কাজ তা শুরু করা না হলে তার ভাল মন্দ, দোষ ত্রুটি, লাভ ক্ষতি কিছুই বোঝা যাবে না। সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা চালু না করা হলে এর ফলাফল আশা ব্যঞ্জক, না হতাশাব্যঞ্জক, মঙ্গলজনক না ক্ষতিকর তা জানা যাবে না। আবার চালু না করে হাত গুটিয়ে বসে থাকা আর নদী পাড়ে বসে বসে যাওয়া ঢেউ গোনার সামিল। কোনো ফল বয়ে আনবে না।
তাই বলছিলাম ২০১৯-২০২০ শিক্ষা বর্ষে তো বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা চালু করা সম্ভব হলো না। অপশক্তির কাছে মাথা নত করে পরাজয়ের গ্লানি সহ্য করে যারা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছেন তাদের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ আপনারা আপনাদের বিবেকটাকে জাগ্রত করুন। মেধা ও মননশীলতার গোড়ায় একটু সু আর সৎচিন্তার বাতাস দিয়ে বিকশিত হোন। উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হবার আশা পোষণকারী শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে আগামী ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ থেকে যেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তন করা যায় তার জন্য এখন থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করুন এবং কাজ শুরু করা হোক।
মো. মুরশীদ আলম : কলামিস্ট ও উন্নয়নকর্মী / সাপ্তাহিক সময়ের বিবর্তন





Users Today : 3
Views Today : 3
Total views : 184487
