আচ্ছা মানুষ কেন মানুষকে স্মরণে রাখবে। আমি মানুষের জন্য কি কিছু করেছি। আচ্ছা আমার দুর্বলতার জন্য, নাকি সবলতার জন্যে মনে রাখবে। বারবার এই প্রশ্ন জাগে মনে। নবাব সিরাজদৌলাকে মানুষ যেমন স্মরণ রেখেছে, তেমনই তো তার পাশাপাশি মীর জাফরকেও স্মরণে রেখেছে। আসলে পক্ষ বিপক্ষ থাকবেই। ঈশ্বর ও শয়তান একজন আরেকজনের বিপক্ষ। তেমনই শক্তিশালী-দুর্বল, সুস্থ-অসুস্থ, ভালো-মন্দ, পাপ-পূণ্য , পবিত্র-অপবিত্র, শুচী-অশুচী। অরো কতই না বিপরীত শব্দ আছে। তবে যতই থাকুক না কেন যার যার জায়গায় সে সে সঠিক। আসলে যে আমার পক্ষে না, সেই তো আমার বিপক্ষে। আবার আমিও তো তার বিপক্ষে। তার ভাবনায় বা চেতনায় সে আমাকে তো বিপক্ষ ভাবতেই পারে, এটা তো তার কাছে ভুল না। এটা তার অধিকার। আমরা কারো স্মরণ সভায় দাঁড়িয়ে অবশ্যই তার ভালো দিকটাকে নিয়ে আলোচনা করি, ঠিক যেটা আমার পক্ষে আছে কিন্তু যাদের কাছে পক্ষ বলে কিছু নেই তারা কি করবে। যখন বলি তিনি ভালো মানুষ ছিলেন তখন অবশ্যই ভাবতে হয় জগতের মন্দতা অর্থাৎ ক্ষমতার পূজা, টাকার পূজা, পদমর্যদার পূজা, গর্বের পূজা, ঘৃণার পূজা এগুলো থেকে তিনি নিজেকে সতর্কতার সাথে দূরে রেখেছিলেন। হয়ত সবগুলো নাও হতে পারে। হোক বা না হোক আসলে মৃত্যু দিয়েই তো আমাদের এই জনমের পরিসমাপ্তি ঘটে। তাহলে এত সব মর্যদা প্রভাব প্রতিপত্তি দিয়ে কি হবে। যদি না মানব কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারি। ঠাকুর অনুকুলচন্দ্রের নাম অনেকেই শুনেছি। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি তার শখে বাগান করা মামাকে বলেছিলেন, যেখানে বাগান করলে কাজ হয় সেখানে করছো না কেন মামা। মামা তখন তার কথা বুঝতে না পারলেও, বুঝতে পেরেছিলেন কিছুদিন পরেই, যখন তিনি অসুস্থ হন আর ডাক্তার যখন তার আশা ছেড়ে দিতে বলেছিলেন। তখন তিনি ঠিকই বুুঝতে পেরেছিলেন সেই কথার মর্মবাণী। আমরা অনেক সময় অনেক কিছুই তখন বুঝতে পারি না। আবার বুঝতে চাইলে কত বাধাই না পেরোতে হয়। প্রতিযোগিতা দলবিভেদ আমাদের অনেক সময় বুঝতে পারাটাও না বোঝার দিকে নিয়ে যায়।
রক্তে ভেজা বাংলাদেশের নাম শুনলেই মনটা আঁতকে ওঠে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই মৃত্যু, সেই রক্ত, সেই বর্বরতা, সেই ধর্ষিত বোনের আহাজারি, আর না বলতে পারা আকুলতা ভরা সেই মায়ের চোখ। সবুজের মাঝে লাল এটার যে নিগূঢ় রহস্য তা তো যুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের অর্জন করতে হয়েছে। যার যা আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়। এই দেশকে মুক্ত করে ছাড়বো। এর মধ্যে কোনো জাতি ধর্ম বা গোষ্ঠিভিত্তিক ডাক ছিল না। স্বাধীনতার জন্য ঝাপিয়ে পড়ে মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্রত নিয়ে সবাই এগিয়ে দিয়েছিল নিজেকে। জীবন, সন্তান বা পরিবারের কথা চিন্তা করেনি তারা। কিন্তু সেই স্বাধীনতার মৌলিক স্বাদ কি পেয়েছি, নাকি পাচ্ছি সেটা বুঝতে পারছি না। রাত যায় আর দিন আসে, আবার দিনও চলে যাচ্ছে কোনোমতে। চারিদিকে শুধু নেশার ছড়াছড়ি। কেউবা টাকার নেশায়, কেউবা সম্পদের নেশায়, কেউবা ক্ষমতার নেশায়, কেউবা নেশাদ্রব্য খেয়ে পড়ে আছে। কেউবা অদৃশ্য সাধনার নেশায় নিজেকে মত্ত রেখেছে। এই সব কিছুর সমাধান হৃদয়ের শুদ্ধতা ও ত্যাগ। এগুলো আমাদের মধ্যে আর দেখা যায় না। আর তাই তো প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ আমরা পাই না। মানুষ আর আমাকে মনে রাখে না। মৃত্যু দিয়েই আসলে স্মরণের বিলুপ্তি ঘটে।
অলোক মজুমদার : চিকিৎসক ও লেখক।




Users Today : 43
Views Today : 50
Total views : 189215
