পহেলা মে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’। শোষণের বিরুদ্ধে শোষিতের অধিকার আদায়ের রক্তাক্ত স্মৃতিবিজড়িত এক ঐতিহাসিক দিন। দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের মাধ্যমে আধুনিক বিশ্বায়নের নির্মাতা দুনিয়ার সব শ্রমজীবী মানুষের প্রতি সংহতি, শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানো হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে রাজনৈতিক, সামাজিক ও শ্রমজীবী সংগঠনগুলো মে দিবস পালন করে। বর্তমান সভ্যতা বিনির্মাণের নেপথ্যে রয়েছে শ্রমজীবী মানুষের অশেষ অবদান। তাদের রক্ত ও ঘামের বিনিময়ে আজও সচল রেখেছে আধুনিক বিশ্বের চাকা।
মানবসম্পদ যেকোনো দেশের প্রধান চালিকাশক্তি। বিকশিত মানবসম্পদ যথাযথ শিক্ষা, পরিবেশ এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশের উৎপাদন, উন্নয়ন ও সামগ্রিক অগ্রগতিতে পালন করে থাকে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা। মহান মে দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও স্বার্থরক্ষার সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিপুল জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে পরিণত করতে সংশ্লিষ্ট সকলের সাহায্য সহযোগিতা একান্তভাবে প্রয়োজন। উদীয়মান অর্থনৈতিক দিক থেকে অগ্রসরমান বাংলাদেশে মহান মে দিবসের গুরুত্ব এবং তাৎপর্য অপরিসীম।
মে দিবসের ইতিহাস
মে দিবসের নেপথ্যে রয়েছে রক্তঝরা ইতিহাস। প্রায় ১২৮ বছর আগের কথা। সেসময় দেশে দেশে পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষের সীমাহীন কষ্ট ছিল। সারাদিন হাড়ভাঙা শ্রম দিয়েও শ্রমিক তার ন্যায্য মূল্য পেতেন না। মালিকেরা উপযুক্ত মজুরি দিতেন না, বরং তারা শ্রমিকের সুবিধা-অসুবিধা, মানবিক অধিকার ও দুঃখ-কষ্ট তোয়াক্কা করতে চাইতেন না। মালিকেরা তাদের অধীনস্থ শ্রমিককে দাস-দাসীর মতো মনে করতেন। ফলে শ্রমিকের শ্রমকে যথেচ্ছ ব্যবহার করে মালিক অর্জন করতেন সীমাহীন সম্পদ। এতে শোষণ-নিপীড়ন ও বঞ্চনাই শ্রমিকের পাওনা হয়ে দাঁড়ায়। এভাবে মালিকের সীমাহীন অনাচার, অর্থলিপ্সা ও একপাক্ষিক নীতির ফলে শ্রমিকদের মনে জমতে শুরু করে প্রচ- ক্ষোভ ও দ্রোহ। এমন অবস্থায় আমেরিকার ‘ফেডারেশন অব লেবার’ ১৮৮৪ সালের ৭ অক্টোবর প্রথমবারের মতো প্রতিদিন আট ঘণ্টা কাজের দাবি তোলে। কিন্তু মালিকপক্ষ শ্রমিকদের দাবি তো মানলই না, বরং তারা শক্ত অবস্থান নিয়ে ফেলে।
এক সময় শ্রমিকের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বিস্ফোরণের আকার ধারণ করে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে। কাজের সময় ৮ ঘণ্টা নির্ধারণ, মজুরির পরিমাণ বৃদ্ধি ও কাজের উন্নত পরিবেশ তৈরি করাসহ শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ে ১৮৮৬ সালের পহেলা মে হে মার্কেটের শিল্প শ্রমিকেরা ধর্মঘটের ডাক দেন। এ ধর্মঘটে যোগ দেন ৩ লাখ শ্রমিক। তারা কলকারখানা বন্ধ রেখে নেমে এলেন রাজপথে। এতেও মালিকেরা তাদের দাবির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন না। তারা শ্রমিকদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে পিছু হটানোর কৌশল গ্রহণ করেন। এদিকে পুলিশও কঠোরহস্তে সে ধর্মঘট দমন করার জন্য শ্রমিকদের ওপর চড়াও হলো। এর প্রতিবাদে ৩ মে শ্রমিকেরা এক সমাবেশের ডাক দিলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকেরা এসে এতে যোগ দেন। সেদিন হে মার্কেটের বিশাল সমাবেশে বক্তব্য রাখেন শ্রমিকনেতা অগাস্ট স্পিজ। এই সময় সমাবেশ স্থলে বোমা বিস্ফোরণ ঘটালে একজন পুলিশ সদস্য মারা যান। এতে বিক্ষুব্ধ পুলিশবাহিনী সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরীহ শ্রমিকদের ওপর। এতে মুহূর্তের মধ্যেই মারা যান ১১ জন শ্রমিক।
এ সময় শ্রমিকদের দাবিকে নস্যাৎ রাখার কৌশলে মালিকেরা আরো তৎপর হন। এদিকে শ্রমিক ধর্মঘট সংঘটিত করার অপরাধে শ্রমিকনেতা আগস্টসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। কেবল তাই নয়, অভিযুক্তদের বিচারের মুখোমুখি করে সরকার। এই বিচারের পর ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ২৬ জুন, ১৮৯৩ ইলিনয়ের গভর্নর অভিযুক্ত আটজনকেই নিরপরাধ বলে ঘোষণা দেন এবং হুকুম প্রদানকারী পুলিশের কমান্ডারকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। লুইস লিং নামের এক শ্রমিক ফাঁসির আগের দিন কারাগারের ভেতর আত্মহত্যা করেন। আরেকজনের ১৫ বছরের কারাদ- দেয়া হয়। তারপরও শ্রমিক আন্দোলন দমিয়ে রাখা যায়নি। বরং সারা দুনিয়ায় শিকাগোর রক্তাক্ত ঘটনার উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের ‘দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করার’ দাবি স্বীকৃতি পায়। আর পহেলা মে বা মে দিবস শ্রমিকদের দাবি আদায়ের দিন হিসেবে স্বীকৃতি পায়। পরে ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে শিকাগোর রক্তঝরা অর্জনকে স্বীকৃতি দিয়ে ওই ঘটনার স্মারক হিসেবে পহেলা মে দিনটিকে ঘোষণা দেয়া হয় ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস’ হিসেবে। এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৯০ সাল থেকে প্রতিবছর বিভিন্ন দেশে এ দিনটি ‘মে দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। জাতিসংঘে একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শাখা হিসেবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আই.এল.ও) প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে শ্রমিকদের অধিকারসমূহ স্বীকৃতি লাভ করে এবং সকল দেশে শিল্পমালিক ও শ্রমিকদের তা মেনে চলার আহ্বান জানায়। এভাবে শ্রমিক ও মালিকদের অধিকার সংরক্ষণ করে। বাংলাদেশও আই.এল.ও কর্তৃক প্রণীত নীতিমালার স্বাক্ষরকারী একটি দেশ।
বাংলাদেশে শ্রমিকদের অবস্থান
তৈরি পোশাকশিল্প খাত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ একটি সেক্টর। শ্রমনির্ভর গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে সংস্কার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নসহ এ সেক্টরে উত্তরোত্তর উন্নতি, মজুরি বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ শ্রমআইনের যুগোপযোগী সংশোধনসহ নানাবিধ অভূতপূর্ব অবদানের বিষয়সমূহ উল্লেখযোগ্য। সরকার ‘নিম্নতম মজুরি বোর্ড’ গঠনের মাধ্যমে গার্মেন্টস শ্রমিক-কর্মচারীদের নিম্নতম মজুরি বৃদ্ধি করে একটা সম্মানজনক পর্যায়ে আনার চেষ্টা হয়েছে। এছাড়াও সংশোধিত এ শ্রম আইন কর্মপরিবেশে শ্রমিকদের নিরাপত্তা বৃদ্ধিসহ মালিক শ্রমিকদের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এছাড়াও রানা প্লাজা ও পরবর্তী পরিক্রমায় বর্তমান সরকার, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল, বিজিএমইএ এবং মালিকপক্ষ বেশকিছু কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কিন্তু এখনও অনেক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা বাকি, সেগুলো যথাযথ সম্পন্নে সকল পক্ষকেই নিতে হবে অগ্রণি ভূমিকা।
দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নারী শ্রমিকদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। শহরে নারীরা তাদের শ্রমের স্বীকৃতি পাচ্ছেন। কিন্তু গ্রামিণ সমাজে পুরুষরাই কাজ করত মাঠে আর নারীরা রান্না-বান্না আর সন্তান লালন-পালন নিয়েই ব্যস্ত থাকত। প্রত্যক্ষভাবে কৃষিকাজে এগিয়ে এসেছে নারীরা। তারা পুরুষের সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছে। অনেকে আবার বাড়ির পাশে কিংবা উঠানে অনাবাদি জায়গায় শাক-সবজি, ফলফলাদির আবাদ করে সংসারে বাড়তি রোজগারের পথ করে নিচ্ছে। কিন্তু তাদের সে অবদানের স্বীকৃতি থেকে তারা আজও বঞ্চিত। দেশের চা শিল্পের মতো সমৃদ্ধ খাতের পেছনে নারী চা শ্রমিকদের বড় অবদান রয়েছে। কৃষি ও এর উপখাতের মূল চালিকাশক্তি নারী। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেক যেখানে নারী, সেখানে তাদের উন্নয়ন ছাড়া দেশের সার্বিক উন্নয়ন অসম্ভব। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশে কৃষিকে যেমন উপেক্ষা করার সুযোগ নেই, তেমনি এ খাতে নারীর অবদানও অস্বীকার করার উপায় নেই। কৃষিখাতে নিয়োজিত নারী শ্রমিকের স্বীকৃতি ও তাদের ন্যায্য মজুরি প্রদান নিশ্চিত করতে পারলে এ কাজে নারীরা আরো আগ্রহী হবে এবং দেশে কৃষির উৎপাদন আরো বাড়বে।
নানা সীমাবদ্ধতার কারণে দেশে দক্ষ শ্রমিকের অভাব রয়েই গেছে। উপযুক্ত শিক্ষা, সামাজিকীকরণ এবং প্রশিক্ষণের অভাবে এখনও দক্ষ মানবশক্তি গড়ে ওঠেনি। তারপরও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমাদের জনশিক্ত নিয়োজিত রয়েছে। তাদের প্রেরিত বৈদেশিক মুদ্রায় সচল রাখছে দেশের অর্থনীতির চাকা। কিন্তু বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির কারণে বহু শ্রমিক দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা তাদের শ্রমের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করা আজ হয়ে ওঠেছে সময়ের দাবি হয়ে।
শিশুশ্রম বাংলাদেশের অন্যতম সমস্যা। পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শিশু শ্রম জরিপে জানা গেছে, দেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখেরও বেমি। ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী এ শিশুরা পূর্ণকালীন শ্রমিক হিসাবে কাজ করছে। সব মিলিয়ে দেশে ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু কোনো না কোনোভাবে শ্রমের সাথে যুক্ত রয়েছে। আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ যুক্ত থাকতে বাধ্য হওয়ায় তারা শারীরিক-মানসিকভাবে বেড়ে উঠতে পারছে না। শিক্ষাসহ বিভিন্ন সামাজিক সুযোগ-সুবিধা থেকে তারা হচ্ছে বঞ্চিত। এসব শিশু স্নেহ-ভালোবাসার পারিবারিক পরিবেশের অভাবে এক সময় অপরাধ জগতে পা বাড়ায়। অনেক শিশুই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করছে। সেই সাথে বাসা-বাড়িতেও অনেক শিশু কাজ করছে। বিভিন্ন কারখানায় শিশুদের বয়স বাড়িয়ে কর্মে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। শিশুশ্রম বন্ধে সংশ্লিষ্টদের নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ।
একজন মানুষের জীবনধারণের জন্য যা যা প্রয়োজন, অর্থাৎ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা একজন শ্রমিকের প্রাপ্য। একুশ শতকে এসে শ্রমিকরা এর কতটুকু মর্যাদা বা অধিকার ভোগ করছে? বর্তমান রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে শ্রমিকশ্রেণির স্বার্থ নিয়ে অবশ্যই ভাবতে হবে। কারণ শ্রমিকরা দেশের সম্পদ। তাদের কারণেই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রয়েছে। নিশ্চিত করতে হবে শ্রমিকদের কাজের ও জীবনের নিরাপত্তা। মহান মে দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুধাবন করতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই।




Users Today : 50
Views Today : 59
Total views : 178021
