বিগত কয়েক বছর ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে ক্রমশই কমেছে চামড়াজাত দ্রব্য রপ্তানি; চামড়ার ব্যাপক দরপতনের পর আবার পরস্পরের দোষারোপ শুরু হয় আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের, যা এই শিল্পের সঙ্কটকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। এ বছরের কোরবানি ঈদে তা বিস্ফোরণ আকার পেয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে চামড়া শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে সংশ্লিষ্টরামনে করেন এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
এই পরিস্থিতির জন্য ব্যবসায়ীদের দায় যেমন রয়েছে, তেমনি সরকারি নীতি-নির্ধারকদেরও আন্তরিকতার অভাব দেখা গেছে। এর সামগ্রিক প্রভাবে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই খাত নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির দিকে যাচ্ছে। সমস্যার সমাধানে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সরকারি সংস্থাকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে।
২০১৭ সালে আদালতের নির্দেশে ঢাকার হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলোকে স্থানান্তর করা হয় সাভারের হেমায়েতপুরে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) গড়ে তোলা চামড়া শিল্প নগরীতে। ১৫৪টি কারখানাকে এই শিল্প নগরীতে জমি বরাদ্দ দেওয়া হলেও তিন বছরেও কারখানা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি সবাই। যারা উৎপাদন শুরু করেছেন, তারাও অবকাঠামোগত নানা সমস্যার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছেন।
রপ্তানি হ্রাসা, প্রভাব কাঁচা চামড়ায়ও
২০২১ সালের মধ্যে চামড়া খাত থেকে ৫০০ কোটি ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ২০১৭ সালে চামড়াকে ‘প্রডাক্ট অব দা ইয়ার’ ঘোষণা করেছিল সরকার। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ১১৬০ দশমিক ৯৫ মিলিয়ন ডলার। পরের বছর (২০১৬-১৭) রপ্তানি আয় দাঁড়ায় ১২৩৪ মিলিয়ন ডলার, প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ।
পরের বছর এই খাত থেকে রপ্তানি আয় কমে যায় ১২ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ। সে বছর (২০১৭-১৮) রপ্তানি হয় ১০৮৫ দশমিক ৫১ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। সর্বশেষ ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় আরও ৬ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ কমে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১০১৯ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন ডলার।
এই সময়ের চামড়ার জুতা রপ্তানি অব্যাহত থাকলেও সবচেয়ে বেশি কমে যায় ফিনিশড লেদার ও ক্রাস্ট লেদার রপ্তানি। রপ্তানি ভাটার প্রভাব পড়ে কাঁচা চামড়ারও দামেও।
কতটা প্রস্তুত ছিল সাভার?
চামড়া শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানসম্মত পরিবেশে উন্নীত করতে ২০০৩ সালে সাভারের হেমায়েতপুরে চামড়া শিল্প নগরী গড়ে তোলার কাজে হাত দেয় বিসিক। হাজারীবাগের ট্যানারি মালিকদের অনীহা সত্ত্বেও ২০১৭ সালের এপ্রিলে আদালতের নির্দেশে তাদেরকে সেখানে যেতে বাধ্য হতে হয়।
হাজারীবাগে সব ট্যানারির কাজ বন্ধ করে দেওয়া হলেও সাভারে জমি ইজারা পাওয়া ১৫৪টি কারখানার মধ্যে কাজ শুরু করতে পেরেছে ১২৪টি।
মালিকরা জানান, পরিবেশের কথা বলে সাভারে স্থানান্তর করতে গিয়ে সেখানে নতুন অবকাঠামোর জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হয়েছে তাদের। বিপরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার সিইটিপি, রাস্তাঘাট অপ্রস্তুতসহ বিভিন্ন কারণে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
সম্প্রতি সিইটিপির একটি অংশ প্রস্তুত করা হলেও সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজম্যান্ট সিস্টেম ও ডাম্পিং স্পট এখনও অপ্রস্তুত। বিসিক চামড়া শিল্পের জন্য সক্রিয়তার যে ঘাটতি এটিই তার প্রমাণ।
যদিও বিসিকের চেয়ারম্যান মো. মোশতাক হাসান এ বিষয়ে বলেন, ছয় মাস ধরে সিইটিপি শতভাগ দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তিনটি ডাম্পিং ইয়ার্ড প্রস্তুত হয়ে যাবে।
অবশ্য ট্যানারি মালিকরা দাবি করছেন, যেসব কাজ এখন করা হচ্ছে বা করা হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে সেগুলো ২০১৭ সালেই করে ফেলা উচিত ছিল। করা হয়নি বলেই এর খেসারত দিতে হয়েছে চামড়া শিল্পকে। ডিসেম্বরের মধ্যে ডাম্পিং ইয়ার্ড প্রস্তুত করা অবাস্তব।
কমপ্লায়েন্স?
শিল্প মালিকদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ফিনিশড লেদারের রপ্তানি বাজার ছিল ইতালি, তাইওয়ান, কোরিয়া ও চীন। সাভারের স্থানান্তরের পর অনেকগুলো কারখানায় অন্তত ছয় মাস উৎপাদন বন্ধ ছিল। এই সময়ে অধিকাংশ ক্রেতাই ভারতসহ অন্য দেশে চলে যায়। চীনের কিছু ক্রেতা আবার ফিরে এলেও প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ায় তারা পণ্যের দাম কমিয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের বাজারেও প্রবেশ করতে পারছেন না বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। এক্ষেত্রে সাভার ট্যানারি পল্লীর পরিবেশগত সমস্যা অন্যতম বাধা।
ইউরোপে রপ্তানির জন্য আইএসও সার্টিফিকেট প্রয়োজন। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশেনের পক্ষ থেকে এই সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন করা হলেও সেটি পাওয়া যায়নি। পরিবেশ সমস্যা এই ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দেখা দিয়েছে। এছাড়া লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ নামে ইউরোপের একটি শক্তিশালী পরিবেশ সংস্থার মানেও উন্নীত হতে পারেনি বাংলাদেশের চামড়া খাত।
তবে বিসিকের দাবি, সিইটিপি পুরোপুরি বিসিকের কাছে নয়; বরং এর কিছুটা আবার ট্যানারি মালিকদের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিটি কারখানায় একটি সেডিমেন্টেশন ট্যাঙ্ক করার কথা। কিছু কিছু ট্যানারি মালিক সেটা করেছে, অনেকে সেটা সঠিকভাবে করেননি।
ইউরোপ ও আমেরিকার রপ্তানি বাজার ধরতে এসব ত্রুটি, ঘাটতি সংশোধন করতে হবে যত দ্রুত সম্ভব। সেই কাজটি করার জন্য সাবার আগে কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে নজর দিতে হবে।
জমি ইজারা ও ব্যাংক ঋণ নিয়ে পাল্টাপাল্টি দোষারোপ
সরেজমিনে গেলে ট্যানারি মালিকরা অভিযোগ করেন, সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে ট্যানারি মালিকদের যে জমি ইজারা দেওয়া হয়েছে, তার দলিল এখনও হস্তান্তর করা হয়নি বলে । যদিও বিসিক বলছে, মালিকদেরকে জমির মূল্য ৮০ শতাংশ মওকুফ করা হলেও তাদের অনেকেই বাকি ২০ শতাংশ মূল্য পরিশোধ করছেন না।
২০০৩ সালের পর চামড়া শিল্প নগরীর প্রকল্পের মেয়াদ ৮ বার বাড়ানো হয়েছে। ভূমির ইজারা দলিল না পাওয়ার কারণে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন অনেক ট্যানারি মালিক।
তবে চামড়া ব্যবসায়ীদের মধ্যে বড় বড় ঋণ খেলাপি রয়েছে। ক্রিসেন্ট লেদার নামের একটি প্রতিষ্ঠানের জনতা ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে ৯১৯ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বিদেশে পাচারের অভিযোগ সম্প্রতি আলোচনায় আসে। জাতীয় সংসদে শীর্ষ ঋণ খেলাপিদের যে তালিকা প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী, তাতে চামড়া শিল্পের বেশ কয়েকজন রয়েছেন।
কাঁচা চামড়ার সঙ্কটেও দোষারোপ
গত কয়েক বছর ধরে কাঁচা চামড়ার দাম কমতে থাকলেও এবারের মতো ঘটনা ঘটেনি। এবার ঈদের পর চামড়া বিক্রি করতে না পেরে মৌসুমি অনেক ব্যবসায়ী লাখ লাখ চামড়া রাস্তায় ফেলে দেন কিংবা পুঁতে ফেলেন। এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয় আড়তদাররা ট্যানারিতে কাঁচা চামড়া বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নিলে। আড়তদারদের অভিযোগ, ট্যানারিগুলোর কাছে তাদের শত শত কোটি টাকা পাওনা, তা না পেলে তারা চামড়া বিক্রি করবেন না।
ট্যানারি মালিকদের কাছে সারাদেশের আড়তদারদের চারশ কোটি টাকা পাওনা বলে দাবি করেন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশেনের নেতারা। এই কারণে পুঁজির অভাবে তারা কোরবানির চামড়া সংগ্রহ করতে পারেননি বলে দাবি করেন কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের অনেকেই।
এই পরিস্থিতিতে দেশের ট্যানারিগুলোর কাছে চামড়া বিক্রির পরিবর্তে বিদেশে কাঁচা চামড়া রপ্তানির সুযোগ চায় আড়তদাররা, যে সুযোগ দেওয়ার ঘোষণাও দিয়ে দেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা মনে করেন, সরকার কাঁচা চামড়া বা ওয়েট ব্লু রপ্তানির সুযোগ উন্মুক্ত করলে এই খাতের সক্ষমতা বাড়বে। যখনই দেশে চামড়ার জোগান বেড়ে যাবে, তখনই বাইরে রপ্তানি করা হবে। এক্ষেত্রে কাঁচা চামড়ার প্রতিযোগিতামূলক বাজার থাকবে।
তবে ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা উল্টো অভিযোগ করেন, কিছু আড়তদার সংঘবদ্ধ হয়ে কম দামে চামড়া কিনছে। কিন্তু ট্যানারি মালিকদের কাছে সরকার নির্ধারিত দামেই তারা বিক্রি করছে চামড়া। তারা আরও বলেন, আড়তদাররা কাঁচা চামড়া রপ্তানির সুযোগ তৈরির চেষ্টা করছেন, যা দেশের চামড়া শিল্পকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে।
কাঁচা চামড়া রপ্তানি জটিল এক প্রক্রিয়া
চামড়ার দর বাড়াতে সরকার প্রথমবারের মতো কাঁচা চামড়া রপ্তানির সুযোগ দিলেও এটি সহজ প্রক্রিয়া নয়। এর কারণ, রপ্তানি চেইন না থাকা। কাঁচা চামড়া রপ্তানি করতে হলে যে ধরনের লজিস্টিক সাপোর্ট লাগবে, তা নেই। চামড়া নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কন্টেইনার থাকতে হবে। রপ্তানির বাজার তৈরি করতে হবে। এলসি করতে হবে। আরও অনেক কিছু লাগবে। এসব করতে বেশ কিছুদিন সময় লেগে যাবে। অর্থাৎ বিদেশি ক্রেতা খুঁজে পাওয়া আর চামড়া পাঠাতে যে অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা দরকার, সেটা না থাকা। অর্থাৎ এই মুহূর্তে কাঁচা চামড়া রপ্তানি করার সুযোগ নেই।
তবে এই সিদ্ধান্ত বলবৎ থাকলে এর সুফল আগামী কোরবানির ঈদে মিলবে বলে আশাবাদী কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা।
কাঁচা চামড়া রপ্তানির সিদ্ধান্তে শিল্প হুমকিতে পড়বে-বিটিএ
কাঁচা চামড়া রপ্তানির সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) আশঙ্কা করছে কাঁচা চামড়া রপ্তানির সরকারি সিদ্ধান্তে শতভাগ দেশীয় চামড়াশিল্প হুমকির মুখে পড়বে। এ খাতে সাত হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়বে। সাভারের আধুনিক চামড়াশিল্প নগরী প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অভাবে সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে যাবে।
সংকট উত্তরণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
বেশ কয়েক বছর ধরেই চামড়া শিল্পে সঙ্কট বিরাজমান। ভ্যালু চেইনে কাঁচা চামড়া থেকে শুরু করে লেদার গুডসসহ সব সেক্টরে সমস্যা আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চামড়া খাতের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য ব্যবসায়ী, বিসিক সব পক্ষের অবহেলা এবং সরকারের উদ্যোগহীনতা বহুলাংশে দায়ী। কিছু ব্যবসায়ী সঙ্কটের সুযোগ নিয়ে এই খাতকে ম্যানিপুলেট করছে। তারা নানা রকম সুযোগ নিচ্ছে, আবার অনেকে সুযোগ না পেয়ে পিছিয়ে পড়ছে। সম্প্রতি কাঁচা চামড়ার দাম কমে যাওয়াটা এর একটি গুরুতর প্রভাব। এ সঙ্কট থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলেও সবাইকে সমানভাবে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। এই সমন্বয়ের কাজে মূল ভূমিকা পালন করতে হবে সরকারকে। সরকার তৈরি পোশাক খাতকে যেভাবে গুরুত্ব দিয়েছে, চামড়া শিল্পকেও সেভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে তা দৃশ্যমাণ হতে হবে।
নাজিম উদ্দীন, বিশেষ প্রতিবেদক





Users Today : 18
Views Today : 20
Total views : 175464
