কিছুই ভালো লাগছে না আজকাল। কেমন করে ভালো লাগবে বলুন, এত দাম দিয়ে ইলিশ মাছ কিনে নিয়ে আসলাম-সবাই বলল, বড়ো ইলিশের স্বাদ বেশি গিন্নি যত্নের সাথে রেঁধেছিল কিন্তু মাছটায় তেমন স্বাদ পেলাম না। আমাদের আটপৌরে জীবনটাও যেন স্বাদহীন হয়ে গেছে। মনের ওপর দিয়ে একের পর এক ঝড়-বন্যা বয়ে গেছে, মনে হয় জীবনে সঞ্চয় বলে কিছুই রইল না, সব শেষ হয়ে গেছে। বিবর্ণ জীবন নিয়ে কার বাঁচতে ইচ্ছা হয় বলুন। আমার এক পাঠক বন্ধু এসে বললেন কী ব্যাপার এত কিছু ঘটে যাচ্ছে চারদিকে আপনি তো কিছুই লিখছেন না এসব নিয়ে? বললাম, একদম লিখছি না এমন নয় তবে সরাসরি কাউকে উদ্দেশ্য করে লিখছি না সেটা ঠিক। কেন? নীতি-দুর্নীতির কথকথা রচনাগুলো পড়েননি? প্রতিদিন চারদিকে দুর্নীতি নিয়ে যেসব ঘটনাগুলো ঘটছে কাগজ ও টকশোগুলোতে তেমনি যে ঝড় তুলছে সেই ঝড়ে যেন কেন আন্দোলিত হতে পারছি না। ইতিমধ্যে আমি বলেছি বস্তুতপক্ষে মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যতা একই আছে। ভালোমন্দ নিয়ে মানুষ, মন্দ মানুষের সংখ্যাধিক্যের জন্যে ভালো বিষয়গুলো ঢাকা পরে যাচ্ছে। দু-একটা ভালো বিষয় যা চোখে পড়ার মতো তাও যেন আজ মনে দাগ কেটে রেখে যেতে পারছে না। ফলে জীবন যেন বিবর্ণ থেকে বিবর্ণতর হতে চলেছে।
আসলে ব্যাপারটা কি সত্যি তাই? মোটেও তা নয়। আমাদের ব্যস্ততম জীবনে এত সমস্ত ঘটনা ঘটে যাচ্ছে বলে কোনো ঘটনা নিয়ে আমরা গভীরভাবে মনোনিবেশ করতে পারছি না। এক ক্যাসিনোর ঘটনা আমাদের যেভাবে আন্দোলিত করল প্রতিদিন দুর্নীতির এত সমস্ত ঘটনা উন্মচিত হতে থাকল যাতে ক্যাসিনোর থিতিয়ে না যেতেই নতুন নতুন দুর্নীতির ঘটনা প্রতিদিন আমাদের ঢেকে দিতে শুরু করল। ফলে যে কোন একটি বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার আর সুযোগ মিলছে না। তাই বলে এতদিন দুর্নীতি বসে নেই। দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষরা প্রতিদিন একটা না একটা ঘটনার জন্ম দিয়ে যাচ্ছে আর আমরা অবাক নেত্রে টেলিভিশনে নাটক দেখার মতো তা দেখে যাচ্ছি। কোনো কোনো বিষয়ে আমাদের উষ্মার সৃষ্টি করলেও কোনো উষ্মাই আমাদের মনে স্থায়ীভাবে বসতে পারছে না। ফলে সব কিছুই গা সওয়া হয়ে যাচ্ছে। ভালো লাগা না লাগার অনুভ‚তিগুলো যেন আর আগের মতো তীব্র নেই। আমরা কি তাই বলে বোধহীন সমাজে পরিণত হচ্ছি?
ভোলায় যে দুর্ঘটনাটি ঘটল সেটা দেখে ও শুনে আমি একেবারে হতবাক। কারণ সেই একই কায়দা, সেই একই স্টাইল, একই কৌশল, একই নিয়মে স্টোরিও ঘটনার মত ঘটে যাচ্ছে। ঘটনাচক্রে এটা প্রতীয়মান হয় যে স্থানীয় পুলিশ বাহিনী ঘটনা ঘটার জন্যে অনেক অংশে দায়ী। ছোটোবেলায় আমরা অনেকে ট্রান্সলেশন পড়তাম। বাংলা থেকে ইংরেজিকরণ-‘চোর পালাইয়া গেলে পুলিশ আসিল’। শত শত বছর ধরে এই প্রবাদ প্রতিম কৌশলটি এখনো একইভাবে চলছে। এই কৌশল ব্যবহারের ফলে হিন্দুরা বিতারিত হলো আমরা পাকিস্তান পেলাম। পবিত্রগণের বসভূমি যা হওয়ার কথা ছিল তাকে অপবিত্র করতে শুরু করলাম। ধর্মনীতি রাজনীতির সাথে মিশে একাকার হয়ে গেল তাদের অবস্থান পাকাপক্ত হবার পর সেই একই রাজনীতি কৌশলের খেলা চলে আসছে দেখে মনটা প্রায়শই খিচরে যায়। সুকুমার রায়ের আহ্বান ওরা শোনেনি, কবিতাও ওরা পড়েনি; বলতে ইচ্ছা হয়-ঐ পুরাতন কৌশল বাদ দিয়ে নতুন কিছু কর। নতুন কিছু কি হচ্ছে? হ্যাঁ, একটু নতুনত্ব রয়েছে সেই কৌশল এখন ডিজিটালাইজড হয়েছে। ফেসবুক হ্যাক করার মধ্যে দিয়ে এখন ধর্মের শুরসুরি জাগিয়ে কৌশলটি প্রয়োগের প্রচলন শুরু হয়েছে। সব কিছুই তো সরকারকে করতে হয় এবং করতে হবে বৈকি! কিন্তু সব কিছুই তো একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। ডিসিদের ডেকে এনে, ওসিদের জমা করে প্রধানমন্ত্রী তো কতই নসিহত করলেন। কাজ হলো কি কিছু? মুক্তিযুদ্ধের সময় ওপার বাংলায় গিয়ে নকশালিদের সংস্পর্শে আসি। এদেশে ছাত্র ইউনিয়নের সাথে সম্পৃক্ত থাকার ফলে ওদের সাথে সম্পর্ক আমার খুব সহজে হয়ে যায়। শ্রেণিশত্রু খতমের লক্ষ্যে ওরা সে সময় পশ্চিম বাংলায় অনেক রাঘব বোয়াল কতল করেছিল। এখন ভাবি দুর্নীতিগ্রস্ত লোকদের তালিকাগুলো সংগ্রহ করে সেই রকম একটা ব্যবস্থাপত্র দিলে কেমন হয়। আমার লেখার সাথে যারা পরিচিত এই কথাটিতে সকলেই হয়ত দুঃখ পাবেন। ১৯৬৯-৭১ এর পর্যন্ত কলকাতায় ক্রসফায়ারে যে কতজন মারা গেছে তার ইয়াত্তা নেই। এই ক্রসফায়ার কৌশলটি সর্বপ্রথম ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী স্বার্থকভাবে প্রয়োগ করেছিলেন। মানবতাবাদীরা দেশ গেল দেশ গেল বলে চিৎকার করবেন তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু দেশকে টিকিয়ে রাখার জন্য এরকম একটা কৌশলের অবশ্যই প্রয়োজন। সড়ক দুর্ঘটায় এই পর্যন্ত বেশ কয়েক হাজার মানুষের প্রাণ বলি দিতে হয়েছে কেন? সেই বিষয়ের কারণটাও একি। সেই ইনডেমনিটিবিল অর্থাৎ দোষীকে শাস্তি দেওয়া যাবে না। অন্যায়ভাবে রাস্তায় যে যুবকটিকে একটি ড্রাইভার হত্যা করল তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। কারণ সে এক দেশব্যাপী সংগোঠনের সদস্য। যে যুবকটি মারা গেল তার তো কোনো সংগঠন নেই। একটি সংগঠনের বিরুদ্ধে একটা মৃত ব্যক্তির বাবা আর কি বা করতে পারে । তাদের প্রতিরোধ করার শক্তি কি তার আছে? তাদের সংগঠনের নেতা শাহজাহান সাহেব প্রকাশেই বলেছেন ড্রাইভার তো আর চাঁপা দিয়ে মারেনি মেরেছে গাড়ি। ট্রাকটির মালিক তো আর ড্রাইভার নয়। যান্ত্রিক ত্রুটিপূর্ণ ট্রাক চালাবার জন্য দুর্ঘনাটি ঘটেছে। সেই যান্ত্রিক ত্রুটিপূর্ণ ট্রাকটি শহরে চলাচল করার অনুমতি দিল কে? সরকারকে এই প্রশ্নের জবাব দিয়ে তারপর আমার ড্রাইভারের ভার নিতে হবে। অর্র্থাৎ সেই একই পন্থা ইনডেমনিটিবিল যেভাবে আমরা আইন করে রেখেছি চারদিকে সেই আইনের বেড়াজালে আজ আমরাই ধরা পড়েছি। আইন থাকবে চিরকাল, আইনের প্রয়োগও হবে কিন্তু দুর্জনদের শাস্তি হবে না। সাম্প্রতিককালে বেশ কয়েক জন যুদ্ধরাধীদের ফাঁসির রায় হয়েছে। অপরাধীদের মধ্যে ইতিমধ্যে একজন মারা গেছেন। আর কিছুদিন ঠেকিয়ে রাখতে পারলে যাদের ধরা হয়েছে তারা হয়ত শীঘ্রই মরহুম হয়ে যেতেন। মারা গেলে পরে তো আর বিচার চলে না তাই বিচার তো হলো কিন্তু কি লাভ হলো তথাপি সুখ এই যে তাদেরকে যুদ্ধপরাধী হিসাবে মারা যেত হলো। যাদের ফাঁসি হয়েছেন তারা প্রায় সকলেই ধর্ম বেশধারী ভ‚ষণে সজ্জিত ছিলেন। ভোলায় ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ধর্ম নিয়ে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় আমরা দেখেছি সেই সমস্ত ধর্মবেশী লোকেরাই রণ হুংকার দিচ্ছে। মনে হচ্ছে ধর্ম নিরপেক্ষতার শ্লোগানটি বাংলাদেশে প্রচলিত হতে পারছে না।
ছোটোবেলায় গান গেয়েছি, সানডে স্কুলে শেখানো গান, বিদেশি মিশনারিরা শিখেয়েছেন-“যাহা বলিবে তাহা কাটিবে, ভালো বীজ বিস্তার ও বপণ করিয়া আসিবে, আনন্দে আটি লইয়া”। বাংলাদেশ সৃষ্টির গোড়ায় যে চারটি মূল বিষয় ছিল তার একটি হচ্ছে ধর্ম নিরপেক্ষতা। মধ্যযুগের ইউরোপের ইতিহাসে দেখা যায় শুধুমাত্র ধর্মের নামেই মানুষ মানুষকে হত্যা করেছে। এত মানুষ হত্যা করা হয়েছিল যে বর্তমানে শিয়া-সুন্নিরাও আজ পর্যন্ত সেই সংখ্যার ধারে কাছে যেতে পারেনি। তবে এত মানব হত্যার পরে ইউরোপ ও পশ্চিমাবিশ্ব একটা বিষয় শিখেছে যে ধর্ম ও রাজনীতিকে তারা পৃথক করতে পেরেছে। কমপক্ষে সরকারের কোনো প্ররোচনা নেই সেই বিষয়ে। তাই আমরা যখন শ্লোগানে বলি, যার যার ধর্ম তার তার কাছে রাষ্ট্রের কি বলার আছে । শুধু রাষ্ট্রের নয় কোনো জনসংগঠনেরও এই বিষয়ে কোনো প্ররোচনা থাকা উচিত নয়। এটা ঘটে আসছে বলেই ধর্ম নিরপেক্ষতার অর্থ আমাদের দেশের মানুষের কাছে অর্থবহ হয়ে উঠতে পারছে না। আমাদের সৈনিকদের পোশাকে চারটি শাপলা ফুল, কাঁচা টাকার মধ্যে চারটি শাপলা ফুল-আমাদেরকে দেশের চারটি মূলনীতির কথা স্বরণ করিয়ে দিচ্ছে কাজীর গরু কিতাবে আছে বাস্তবে নেই। একইভাবে ধর্ম নিরপেক্ষতা বিষয়টি আমাদের সবখানে উল্লেখ থাকলেও দেশের রাজনীতিতে এর ব্যবহার আজ নেই বললেই চলে।
আমাদের কি কিছুই করণীয় নেই? অবশ্যই আছে ভালো লাগা, না লাগার বিষয়গুলো আমাদের মুখ খুলে বলতে শিখতে হবে। কেবলমাত্র রাজনীতিক ফয়দা লুটার জন্য নয় স্বাধীনতাকে অর্থবোধক করার জন্য আমাদের অনুভ‚তির কথা সোজা সাফটাভাবে বলতে হবে।
ড. এলগিন সাহা : এনজিও ব্যক্তিত্ব ও কলামিস্ট/ সময়ের বিবর্তন





Users Today : 37
Views Today : 38
Total views : 177289
