এই মহাবিশ্বের বিদঘুটে, কিম্ভূত ‘রাক্ষস’গুলির মাথায় চুল নেই একটাও! মস্ত ‘টাক’ থাকে ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বরের। তাই চাল-চুলো আলাদা হলেও, চুলের বিচারে একটা ব্ল্যাক হোল থেকে অন্যটাকে আলাদা করে চিনে নেওয়ার কোনও উপায়ই নেই আমাদের হাতে। তারা সবাই গিলে খাচ্ছে, নাগালে যা পাচ্ছে, তার সব কিছু। গিলে খাচ্ছে আলো। তারাদের। গিলে নিচ্ছে যাবতীয় তথ্যাদি (ইনফরমেশন্স)-ও।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-জার্নাল ‘ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্স’র সা¤প্রতিক সংখ্যায় প্রকাশিত গবেষণাপত্রে এ কথাই প্রমাণ করল হাতে-কলমে। গবেষকদলে রয়েছেন উইল এম ফার ও ম্যাক্সিমিলানো ইসি, মার্ক এ শিলের মতো বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
‘চুল নেই তো ব্ল্যাক হোলের?’ শেষ বয়সে দ্বিধায় ছিলেন হকিং!
শেষ বয়সে পৌঁছে ‘ইনফরমেশন থিয়োরি’র গোলকধাঁধায় ঢুকে যে সংশয় ইতিউতি উঁকিঝুঁকি মেরেছিল প্রয়াত কিংবদন্তি বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের মনে, তা নিয়ে কিছুটা হলেও, প্রশ্ন উঠে গেল।
মহাবিশ্বের ‘রাক্ষস’কে চেনার কাজটা খুব সহজ!
মহাবিশ্বের রাক্ষুসে ব্ল্যাক হোলগুলিকেও খুব একটা আলাদা করে চেনার উপায় নেই। আমাদের চেনা, জানা রাক্ষসদের মতোই তারা চেহারাটা হয় দু-রকমের। হয় খুব ভারী, না হলে অতটা ভারী নয়। মহাবিশ্বে ‘ক্রিয়াশীলতা’র সময় তাদের ঘূর্ণিতেও আলাদা করা যায়। কেউ যদি এক দিকে ঘোরে, তা হলে অন্য ব্ল্যাক হোলটি ঘোরে উল্টো দিকে। তাই ব্ল্যাক হোলদের চিনে ফেলার কাজটা অনেক সহজ! আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ থেকে অঙ্ক কষে বিশ শতকের প্রায় মাঝপর্বে এই কথাটাই বলেছিলেন বিজ্ঞানীরা। ব্ল্যাক হোলদের ‘আইডি কার্ড’ বানানোর জন্য দেওয়া হয়েছিল ‘নো হেয়ার (কোনো চুল নেই) থিয়োরেম’। বোঝানো হয়েছিল, ভর আর ঘূর্ণি এক হলে মহাবিশে^র দুটি রাক্ষসকে আলাদা করে চেনার আর কোনও উপায় নেই। ‘চুল’ (অন্য কোনো ‘প্যারামিটার’ বা মাপকাঠি) থাকলে হয়ত সে ক্ষেত্রে ‘টাক-মাথা’র ব্ল্যাক হোল থেকে আলাদা করা যেত! কিন্তু তেমন কোনো ‘চুল’ নেই মহাবিশে^র ভয়ঙ্কর রাক্ষসদের মাথায়।
আমাদের সূর্যের ভরের (‘সোলার মাস’) চেয়ে ওজনে সে কতটা বেশি, মূলত সেই তুলাদণ্ডেই আলাদা করা হয় ব্ল্যাক হোলগুলিকে। আর সেই রাক্ষসটা আমাদের কতটা কাছে রয়েছে বা দূরে, তা মাপা হয় আলোকবর্ষের (সেকেন্ডে ৩ লক্ষ কিলোমিটার গতিবেগে ছুটলে বছরে আলো যে দূরত্ব অতিক্রম করে) স্কেলে।
কীভাবে জানা গেল?
কাছাকাছি চলে আসার পর জোরালো অভিকর্ষ বলের টানে একটি ব্ল্যাক হোল যখন আর একটি ব্ল্যাক হোলকে ধাক্কা মারে তখন সেখান থেকে তৈরি হয় একটি আরও বড়ো চেহারার একটি ব্ল্যাক হোল। আর সেই ধাক্কাধাক্কির ফলে একটি তরঙ্গের জন্ম হয় মহাবিশে^র স্থান-কালে (স্পেস-টাইম)। সেই তরঙ্গকেই বলা হয় মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বা ‘গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ’।
পুকুরের মাঝখানে ঢিল ফেললে তৈরি হওয়া তরঙ্গ ধীরে ধীরে ছড়াতে ছড়াতে ঘাটে এসে মিশে যায়। ঠিক তেমনিভাবেই দুটি ব্ল্যাক হোলের মধ্যে কয়েকশো কোটি বছর আগে ধাক্কাধাক্কির ফলে জন্মানো মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ওয়াশিংটনে হ্যানফোর্ড ও লিভিংস্টোনে বসানো ‘লাইগো’র দুটি ডিটেক্টরে ধরা পড়েছিল ২০১৫ সালে।
সেই মহাকর্যীয় তরঙ্গই সূক্ষèভাবে বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকরা। আর সেটা করতে গিয়েই তাঁরা দেখেছেন, ভর আর ঘূর্ণি ছাড়া আর কোনও ‘চুল’ নেই ব্ল্যাক হোলদের মাথায়। যা খাপ খায় নো হেয়ার থিয়োরেমের বক্তব্যের সঙ্গে।
যেভাবে নিশ্চিত হলেন গবেষকরা
মহাকাষ বিজ্ঞানীদের মতে, দুটি ব্ল্যাক হোলের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির ফলে তৈরি হওয়া ব্ল্যাক হোলটি কাঁপতে থাকে। অত জোরে ধাক্কাধাক্কি হলে, কিছুক্ষণের জন্য হলেও, তার একটা রেশ তো থাকবেই। ধাক্কাধাক্কির ফলে জন্মানো নতুন ব্ল্যাক হোলটি কাঁপতে থাকে। সেটা খুব কম সময়ের জন্য। এক সেকেন্ডের পাঁচ ভাগের এক ভাগ সময়। সেই কাঁপার সময় তার মধ্যে কোনো কোনো কম্পাঙ্ক দেখা যেতে পারে, তার একটা ধারণা ছিল বিজ্ঞানীদের। কাছে ছুটে আসা দুটি ব্ল্যাক হোলের ভর ও ঘূর্ণির মান থেকে যে কম্পাঙ্কগুলির হিসাব কষে ফেলা যায়। গবেষকরা দেখেছেন, ধাক্কাধাক্কির ফলে জন্মানো নতুন ব্ল্যাক হোলের ওই স্বল্প সময়ের কম্পনের সময় ছোট, বড়ো যতগুলি কম্পন হয়েছে, তাদের মান, ওঠা-নামা যেমনটা হিসাব কষা হয়েছিল, ঠিক তেমনটাই।
নতুন ব্ল্যাক হোলটির ওই কম্পন না হলে, মহাকর্ষীয় তরঙ্গেরও সৃষ্টি হত না। তাই সেই কম্পন যখন থেমে যায়, তখন সেই ব্ল্যাক হোলটি থেকে আর কোনও মহাকর্ষীয় তরঙ্গের জন্ম হয় না।
প্রয়াত কিংবদন্তি বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং ও তাঁর এক সময়ের অধ্যাপক রজার পেনরোজেরও একই বিশ্বাস ছিল গত শতাব্দীর ছয়ের দশকে।
ব্ল্যাক হোলে ঢোকা পদার্থ, তথ্য কি হারিয়ে যায় চিরতরেই?
ব্ল্যাক হোলে ঢুকে যাওয়ার পর পদার্থ, তথ্যাদির কী অবস্থা হয়? তারা কি হারিয়ে যায় চিরতরে? নাকি থেকে যায় অন্য কোনও ভাবে? অন্য কোথাও? এসব প্রশ্নের গোলকধাঁধায় ঢুকে শেষ জীবনে হকিংয়ের মনে অবশ্য এই সংশয় দেখা দিয়েছিল, সত্যি-সত্যিই ‘চুল’ নেই তো ব্ল্যাক হোলের? ভর ও ঘূর্ণি ছাড়া আর কোনো মাপকাঠি কি সত্যিই নেই একটি ব্ল্যাক হোল থেকে অন্যটিকে আলাদাভাবে চেনার জন্য? হকিং সেই সময় এও বলেছিলেন, ‘‘সামান্য চুল (সফ্ট হেয়ার) থাকলেও থাকতে পারে ব্ল্যাক হোলের।’’ যদিও সেটা শুধুই ছিল তাঁর সংশয়। কোনো সিদ্ধান্তে তিনি পৌঁছতে পারেননি। সংশয়টাকে বাতিল করার সুযোগও পাননি তাই।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক





Users Today : 46
Views Today : 49
Total views : 182408
