প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন তার জীবনের কখনো না কখনো বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়ে থাকেন বা হতে পারেন। বাংলাদেশের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে ঢাকা পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, শিশু কিশোরদের আঠার শতাংশের বেশি বিষণ্নতায় আক্রান্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ধারণা ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বে আর্থ সামাজিক ক্ষেত্রে বড় সংকটের তৈরি করতে যাচ্ছে এই বিষণ্নতা ।
বিষণ্নতা আসলে কী?
সাম্প্রতিক সময়ে বিষণ্নতাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেননা প্রাথমিক পর্যায়েই এর প্রতি যথাযথ দৃষ্টি না দিলে এ থেকে গুরুতর সমস্যা তৈরি হতে পারে। অথচ বিষণ্নতা বলতে অনেকে মন খারাপকে বুঝে থাকেন।
বিষণ্নতার লক্ষণগুলো
আমেরিকান সাইক্রিয়াটিক এসোসিয়েশন বিষণ্নতার নয়টি লক্ষণ উল্লেখ করে জানিয়েছে কারও মধ্যে এর মধ্যে অন্তত পাঁচটি টানা দু-সপ্তাহ বা তারচেয়ে বেশি সময় দেখা গেলে তাকে বিষণ্নতা বলে চিহ্নিত করা যেতে পারে। এগুলো হলো:
১. দিনের বেশির ভাগ সময় মন খারাপ থাকা।
২. যেসব কাজে আনন্দ পেতো সেসব কাজে আনন্দ ও আগ্রহ কমে যাওয়া।
৩. ঘুম অস্বাভাবিক কম বা বাড়তে পারে।
৪. খাবারে অরুচি তৈরি হওয়া বা রুচি বেড়ে যাওয়া।
৫. ওজন কমে যাওয়া।
৬. কাজে ও চিন্তায় ধীরগতি হয়ে যাওয়া।
৭. নিজেকে নিয়ে নেতিবাচক চিন্তা করা বা নিজেকে দায়ী মনে হওয়া সবকিছুতে।
৮. সিদ্ধান্তহীনতা বা মনোযোগ কমে যাওয়া।
৯. খুব তীব্র হলে আত্মহত্যার চিন্তা পরিকল্পনা ও চেষ্টা করে।
বিষণ্নতা নিয়ে মনোবিদগণ কী বলেন
বিষণ্নতায় আক্রান্ত হলে জীবন ধারণ বোধটাই কঠিন হয়ে যেতে থাকে
ডা. মেখলা সরকার, সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা।
বিষণ্নতা মানুষের মনের একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। একজন মানুষের কোনো বিষয়ে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া বা এ ধরণের নানা কারণে মন বিষণ্ন হতেই পারে। কিন্তু যখনি রোগ হবে সেটা একটু ভিন্ন।বিষণ্নতা হতে পারে বিভিন্ন মাত্রা কিংবা গভীরতায়। মনে রাখতে হবে টানা দুই সপ্তাহ মন খারাপ থাকা বা আগে যেসব কাজে আনন্দ লাগত সেসব স্বাভাবিক কাজগুলোতে আনন্দ না পাওয়ার মতো হলে এটিকে বিষণ্নতার লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
প্রতিক্রিয়া দু-ভাবে হতে পারে যেমন ঘুমের সমস্যার ক্ষেত্রে কারও ঘুম কমে যেতে পারে আবার কারও ঘুম বেড়েও যেতে পারে, আবার কারও ছাড়াছাড়া ঘুম হতে পারে। আবার দেখা যাচ্ছে ঘুম হচ্ছে কিন্তু ঘুম থেকে যে শক্তি আসার কথা শরীরে তা না এসে উল্টো ক্লান্তি অনুভ‚ত হচ্ছে। সেটিও বিষণ্নতার লক্ষণ হতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে খাবারের স্বাদে পরিবর্তন হয়। ফলে খাবার বেড়েও যেতে পারে, তেমনি আবার কমেও যেতে পারে কিন্তু সব মিলিয়ে শরীরের ওজন কমে যায় অনেকের ক্ষেত্রে। কেউ বা আবার মুটিয়ে যায়। বিষণ্নতার কারণে হতাশা বোধ হয়। মনে হয় যে সামনে ভালো কিছু নেই। নিজের সব কিছু নেতিবাচক মনে হতে পারে। তার দ্বারা ভালো কিছু হবে না মনে হয়। অর্থাৎ আত্মবিশ্বাস কমে যায়। আর এসব তার দৈনন্দিন জীবনাচরণে প্রভাব ফেলে।
এর বাইরেও কিছু ল²ণের কথা চিকিৎসকরা বলে থাকেন যার মধ্যে রয়েছে-নানা ধরনের শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়া, হাত পা জ্বালা পোড়া করা, কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হওয়ার অনুভ‚তি কিংবা ভীষণ মাথা ধরা এবং কোষ্ঠকাঠিন্য। বিষণ্নতায় আক্রান্ত হলে জীবন ধারণ বোধটাই কঠিন হয়ে যেতে থাকে যেটি ব্যক্তির মধ্যে ধীরে ধীরে আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি করে।
যেকোনো বয়সেই বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। প্রাপ্তবয়স্কদেরই বেশি দেখা দেয়। তবে যে কোনো বয়সী মানুষ এতে আক্রান্ত হতে পারেন পারিপার্শ্বিক নানা কারণে।
বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার অনেকগুলো কারণের মধ্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ জীনগত ত্রুটি। জেনেটিক কারণে অনেকে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হতে পারেন। বিবেচনায় রাখা দরকার বায়োলজিক্যাল অসুখ-বিসুখকে। এছাড়া নেতিবাচক মানসিক গঠন। কিংবা আশপাশের পরিবেশ যা সে মনে করে যে তার সাথে আর যাচ্ছে না। আবার ব্রেক আপ, ডিভোর্স কিংবা পরিবারের কেউ অসুস্থতায় আক্রান্ত হলে সেখান থেকেওবিষণ্নতা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার চারপাশে সব ঠিক আছে কিন্তু তারপরেও জৈবিক বা অন্তর্গত নানা কারণে একজন মানুষ বিষণ্নতায় আক্রান্ত হতে পারে।
বিষণ্নতা তিন ধরনের হয়-মৃদু, অল্প বা বেশি। মৃদু বিষণ্নতা নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়। আবার অল্প হলে কারও সাথে শেয়ার করা বা সামাজিক মিথস্ক্রিয়া বাড়ালে কাজে লাগে। অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন না থাকা। সবার সঙ্গে মেশা। যাদের সঙ্গ ভালো লাগে তাদের কাছে থাকা। মানুষের কাছ থেকে দুরে সরে না যাওয়ার মাধ্যমেও কিছুটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
বিষণ্নতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো নিজেকে গুটিয়ে নিতে ইচ্ছে করে। এজন্য আমরা বলি শারীরিক পরিশ্রম বা শরীরচর্চা করা। রেগুলার ৩০ মিনিট হাঁটা খুবই ভালো। কেউ বাইরে যেতে নর পারলে ঘরের মধ্যেই ঘোরাফেরা করতে পারে তাতেও উপকার পাবে। একজন মানুষ যতোটা শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকবে ততটাই তার সমস্যা কাটবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানসিকভাবে দৃঢ় থাক ও আত্মবিশ্বাস রাখা যে আমি পারব। এজন্য নিজের ইতিবাচক বিষয়গুলোকে ফোকাস করা যেতে পারে এবং ভালো কাজগুলোর চর্চা করা।
তবে দৈনন্দিন জীবন যাপনের কাজ কিংবা পড়ালেখা বা পরিবারের সাথে সম্পর্ক খারাপ হতেই থাকলে বা কেউ যদি ক্রমাগত নিজে গুটিয়ে নিচ্ছে মনে হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। বিষণ্নতা অনেকটাই নিরাময়যোগ্য তাই একে অবহেলা করা উচিত হবে না।
শিশু-কিশোরদের মধ্যে নানা কারণে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হবার সুযোগ বেশি
ডা. মুনতাসীর মারুফ, সহকারী অধ্যাপক, সাইকিয়াট্রি
শহীদ এম মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজ, সিরাজগঞ্জ।
বিষণ্নতায় আক্রান্তদের মধ্যে পনের শতাংশের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি হয়ে থাকে। একজন মানুষের মধ্যে যেকোনো আবেগগত পরিবর্তন অনেক দিন ধরে দেখা যাচ্ছে এবং সেটা দৈনন্দিন কাজকে প্রভাবিত করছে তখনই সতর্ক হওয়া উচিত। জেলা পর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি প্রাপ্তবয়স্কদের অনেকেই হাসপাতালে আসেন নানা শারীরিক সমস্যা নিয়ে। কিন্তু যখনই একটু ডিটেইলসে যাওয়ার চেষ্টা করি তখন দেখতে পাই শারীরিক সমস্যা আসলে নেই। সমস্যাটা মানসিক এবং বিষণ্নতা থেকে এগুলো হচ্ছে।
শিশু-কিশোরদের মধ্যে নানা কারণে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হবার সুযোগ বেশি। যেমন, প্রেমে ব্যর্থতার কারণে অনেকে এই সমস্যায় আক্রান্ত হন-তাই এ ধরনের ক্ষেত্রে শিশু কিশোরদের মানসিক সহায়তা জরুরি। বিষণ্নতার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সে অনুযায়ী জীবনাচরণ পরিচালনা করতে পারলে এ থেকে সহজেই উত্তরণ করা সম্ভব।
সাক্ষাৎকার ভিত্তিক প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন কায়সার হক, বিশেষ প্রতিবেদক





Users Today : 113
Views Today : 123
Total views : 177374
