প্রথমবারের মতো বান্দরবানের খ্রিষ্টিয়ান সমাজ ও চার্চের যাজকগণ রাজপথে দাঁড়িয়েছেন, তারা রাষ্ট্রের কাছে চার্চের এবং নিজেদের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। ২৫ অক্টোবর, ২০২৫ শনিবার বান্দরবান প্রেসক্লাবের সামনে ‘সর্বস্তরের খ্রিস্টান সম্প্রদায়’ ব্যানারে আয়োজন করা হয় মানববন্ধন। উপস্থিত শতশত খ্রিস্টভক্ত, নেতৃবৃন্দ ও যাজক সম্প্রদায় পার্বত্য চট্টগ্রামে জোরপূর্বক খ্রিস্টানকরণের মাধ্যমে খ্রিস্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মিথ্যা অপপ্রচারের প্রতিবাদ করেছেন। সেদিন মানববন্ধনে দাঁড়ানো নারী-পুরুষের হাতে ফেস্টুনে লেখা শোভা পাচ্ছিল―‘পার্বত্য চট্টগ্রামে খ্রিস্টানরা সকল সম্প্রদায়ের সাথে সম্প্রীতিতে সহাবস্থানে বসবাস করতে চাই’, ‘ধর্মীয় উস্কানি বন্ধ করো’, ‘ধর্মকে নিয়ে উস্কানিমূলক বার্তা দেওয়া বন্ধ করুন’, ‘খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের প্রতি মিথ্যা অপবাদ দেওয়া বন্ধ করুন’, ‘আমরা সবাই ভাই ভাই, পার্বত্য চট্টগ্রামে সম্প্রীতি চাই’, ‘এনজিওদের হয়রানি বন্ধ করো’, ‘মানবিক উন্নয়নই আমাদের কাজ’, ‘পারস্পারিক সহযোগিতার মাধ্যমে স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের সুযোগ চাই’, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে খ্রিস্টানদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় বাধা কেন?’ ইত্যাদি। মানববন্ধনে বক্তারা উল্লেখ করেছেন―“পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসন সব সময় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করে। …খ্রিস্টান মিশনারি ও দাতা সংস্থাগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবিক উন্নয়নমূলক কাজ করে থাকেন, ধর্মান্তর করাই তাদের উদ্দেশ্য নয়। খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরা শান্তি প্রিয়, দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তারা কখনো রাজপথে মিছিল মিটিং করে অরাজকতা সৃষ্টি করেন না। …ত্রিপুরা ও বম সম্প্রদায়ের মানুষ শত শত বছর ধরে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। তাই তাদের ‘নতুন করে খ্রিস্টান বানানোর’ অপপ্রচার সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। বরং স্বাধীনতার পর থেকে বান্দরবানের লামা, আলিকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি ও আশপাশের এলাকা থেকে ত্রিপুরা ও ম্রো সম্প্রদায়ের বহু মানুষকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে। …রাজনৈতিকভাবে স্বার্থ উদ্ধার করতে না পারলে কিছু স্বাথান্বেষী মহল ধর্মকে ব্যবহার করে উস্কানি ও বিভাজন সৃষ্টি করে। আমরা পরস্পরকে দোষারোপ নয়, বরং পারস্পারিক সহযোগিতার মাধ্যমে স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের সুযোগ চাই” (দৈনিক গোমতীর বার্তা ২৫ অক্টোবর, অনলাইন পেজ থেকে)। আরো বলেছেন, ‘‘একটি দেশে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ মিলেই রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। খ্রিস্টান হয়ে জন্ম নেওয়া কোনো অপরাধ নয়। এটি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করা হচ্ছে। পার্বত্য অঞ্চলে সব সম্প্রদায়ের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব উদযাপন করে আসছে। পবিত্র বাইবেল নিয়ে ধর্মীয় উপদেশ বা সভা-সমাবেশ করা মনে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র নয়। …আমরা দেশের আইন মেনে চলি, জন্মসূত্রে বাংলাদেশি নাগরিক। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি আমরা গভীরভাবে শ্রদ্ধাশীল। যে রাষ্ট্রে জন্মেছি, তাকে ধ্বংস করার কোনো ষড়যন্ত্র আমরা করতে পারি না।’ আমরা অবগত হয়েছি প্রতিবাদ অনুষ্ঠান শেষে, বাংলাদেশ খ্রিষ্টান এসোসিয়েশন, বান্দরবানের পক্ষ থেকে রেভা. লালজারলম বম (সভাপতি) এবং লেলুং খুমী স্বাক্ষরিত স্মারকলিপি জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা বরাবর প্রদান করা হয়।
ইতিপূর্বে ২০ অক্টোবর ‘লাইফ ওয়ার্ড মিশন’ ((Life Word Mission) নামক একটি প্রতিষ্ঠান পরিকল্পনানুযায়ী বান্দরবান সদরের হোটেল ডি’ মোরে ধর্মীয় সভার আয়োজন করে। এই সভাতে ১১ জন দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিক (ইয়াংসান পার্ক, সুমি লি, বংসুন পার্ক, ইওন কিয়ং ও, ইওন কিয়ং বাইক, চ্যাংহো চো, হুন ইল চোই, সন উং কিম, চ্যাং সান চোই, হিউং ইল কিম, চোল ই হং এবং ১জন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক (ইয়ানা কিম) উপস্থিত ছিলেন। ধর্মীয় সভাতে স্থানীয় পর্যায়ের ৮০/৯০ জন বিশেষত ত্রিপুরা খ্রিষ্টানুসারী উপস্থিত হয়েছিলেন। অভিযোগ রয়েছে ‘বিদেশি নাগরিকগণ সরকারি শর্তসমূহ ভঙ্গ করে পর্যটনের ছদ্মবেশে পার্বত্য জেলা বান্দরবানে গোপনে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। পার্বত্য ৩টি জেলায় বিশেষত বিদেশি নাগরিকদের জন্য পূর্বাহ্নেই অনলাইনে আবেদন করে পাসপোর্ট, ভিসার স্ক্যান কপি ও থাকার জায়গার বিবরণ সমেত জেলা প্রশাসক বা জেলা পুলিশ সুপারের কাছে জমা দিতে হয়। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, বিদেশী নাগরিকদের বান্দরবানে প্রবেশে অনুমতি শুধুমাত্র পর্যটন বা গবেষণার উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয় এবং এতে স্পষ্টভাবে বিধি নিষেধ থাকে যে, তারা কোনো ধর্মীয়, সামাজিক বা সংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না। মিশনারী হিসেবে গণিত বিদেশি নাগরিকরা সরকারি শর্তাবলী ভঙ্গ করে অতি গোপনে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেছে বলে প্রশাসনের অভিযোগ রয়েছে। খতিয়ে দেখা হচ্ছে যে, ওইসব বিদেশি নাগরিকদের গাইডার হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত লালফুনথাং বম’র আদ্যপান্ত; তিনি নাকি একদা কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)-এর সক্রিয় সদস্য ছিলেন। আমাদের প্রশাসন দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের স্বার্থে লালফুনথাং বম’র ধর্মীয় কার্যক্রমের আড়ালে দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত রয়েছে কিনা সেটিও তদন্ত করতে মাঠে নেমে পড়েছে প্রশাসন।
ঘটনাটি লাইম লাইটে আসে ২১ অক্টোবর, ২০২৫ ‘চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ’ যখন বান্দরবান শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে। সংগঠনের চেয়ারম্যান কাজী মুজিবুর রহমান প্রকাশ্যে অভিযোগ করে বলেছেন―‘পর্যটনের নামে বিদেশিরা পাহাড়ে এসে দরিদ্র ও সরল মানুষদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করছে। প্রশাসনের চোখের সামনে এমন অপতৎপরতা চলতে দেওয়া যায় না।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ নিবন্ধনহীন ‘লাইফ ওয়ার্ড মিশন’-র তহবিলের উৎস ও কার্যক্রমের উদ্দেশ্যও সম্পর্কে সন্দিহান। ধারণা করা হচ্ছে―তারা ভ্রমণের ছদ্মবেশে স্থানীয় পাহাড়িদের মধ্যে ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টি এবং প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। প্রশাসনিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ইঙ্গিত রয়েছে―এসব উদ্যোগে অর্থায়ন ও সহযোগিতা দিচ্ছে বিভিন্ন খ্রিস্টান দেশ ও সংস্থা―যার উদ্দেশ্য পার্বত্য অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদে খ্রিষ্টান প্রভাব বিস্তার ও সামাজিক কাঠানো পরিবর্তন। পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে বেশ কিছু বিদেশি এনজিওর আড়ালে মিশনারি কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ রয়েছে। ইতোপূর্বে আমরা অবলোকন করছি―১১ এপ্রিল, ২০২৫ সালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেছেন, ‘বাংলাদেশের বান্দরবান, মিয়ানমারের রাখাইন ও ভারতের মণিপুর, মিজোরাম―এই সমস্ত রাজ্য নিয়ে এখানে একটা খ্রিস্টান রাষ্ট্র করার ষড়যন্ত্র চলছে। সেই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে আমাদের দেশেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য কেউ অগ্রসর হচ্ছে কি না, উদ্যোগ নিচ্ছে কি না, আমরা জানি না। এ ব্যাপারে বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ এমন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলে ওইটা আমেরিকা দখল করবে।’
২০২৪ সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানাপোলিসে প্রবাসী ভারতীয়দের এক অনুষ্ঠানে মিজোরামের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী লালদুহোমা একটি বৃহত্তর খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি কুচি চিন ও জো নৃগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি জাতীয় সত্তা গঠনের লক্ষ্যে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। লালদুহোমা বলেছিলেন, এই নৃগোষ্ঠীগুলো ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকভাবে ঘনিষ্ঠ, তবে আন্তর্জাতিক সীমানার কারণে তারা বিভক্ত। আমি চাই আমাদের সেই বিশ্বাস আর আত্মবিশ্বাস গড়ে উঠুক যে, একদিন আমরা এক নেতৃত্বের অধীনে আমাদের জাতীয়সত্ত্বা গঠনের লক্ষ্যে উঠে দাঁড়াব।’ মিজোরাম ভিত্তিক সংগঠন ‘জো রিইউনিফিকেশন অর্গানাইজেশন’ (তজঙ) সক্রিয় ভ‚মিকা পালন করে আসছে। ২০২৪ সালের মে মাসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছিলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম, মায়ানমার ও ভারতের কিছু অংশ মিলে একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠনের প্রচেষ্টা চলছে, যা তিনি ক্ষমতায় থাকলে সম্ভব হবে না।’
বাংলাদেশের খ্রিষ্টিয় সমাজ সব সময়ই উত্থিত অভিযোগগুলোর যৌক্তিক, সময়োপযোগী ও বিশ্লেষণাত্মক অবস্থান তুলে ধরেছেন। দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ, মমত্ববোধ, সার্বভৌমত্ব, সুনাম ক্ষুণ্নের মতো কোনো কাজকেই সমর্থন করেন না। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাসমূহ খ্রিস্টান রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে ইঙ্গিত দেওয়ার প্রেক্ষিতে খ্রিস্টান ধর্মের পক্ষে ঢাকার আর্চবিশপ বিজয় এন. ডি’ ক্রুজ অবস্থান তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠনের ধারণাটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। বাংলাদেশের খ্রিস্টান সম্প্রদায় এই ধরনের কোনো ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত নয়। খ্রিস্টানরা দেশের সংবিধান এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি আনুগত্য। বাংলাদেশের খ্রিস্টানরা দেশের সকল সম্প্রদায়ের সঙ্গে শান্তিতে এবং সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করছি। তারা দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মানব উন্নয়নমূলক কাজে ভ‚মিকা রাখছে।
দ্বিতীয়ত―পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে বিশেষতঃ বান্দরবান সম্পর্কে পুনর্বার অভিযোগ উত্থিত হয়েছে। অভিযোগটি কেন বারংবার উত্থিত হচ্ছে, সেটি কোনোভাবেই অত্র এলাকার খ্রিস্টান সম্প্রদায় বুঝে উঠতে পারছেন না। বান্দরবানে বম ও ত্রিপুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, রয়েছে আরো কতকগুলো ছোটো ছোটো পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠী। শতবর্ষ পূর্বে ১৯১৯ সালে মিশনারীরা বমদের কাছে খ্রিস্টের বাণী পৌঁছিয়ে দিয়েছিলেন, আর ত্রিপুরাদের খ্রিষ্টিয়ানিটির বয়সও প্রায় ৭৫ বছর। দীর্ঘদিন বম ও ত্রিপুরা সম্প্রদায় শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে বসবাস করে এসেছে, কোনোদিন কোনো রাষ্ট্রদ্রোহীতার মতো ঘটনার উদ্ভব হয়নি। তাহলে কেন হঠাৎ করে কেএনএফ কিংবা অন্য কোনো পার্টির আর্বিভাব হলো, নিশ্চয় তৃতীয় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাত রয়েছে। বম, ত্রিপুরা, ম্রো’রা এই তৃতীয় ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের ষড়যন্ত্রের শিকার বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। খ্রিষ্টিয়ানিটির ধুয়া তুলে নিরীহ, সুনাগরিক, দেশপ্রেমিক এবং দেশ গঠন ও সুনাম অর্জনে খ্রিষ্ট বিশ্বাসীরা নিরলস ও বিশ্বস্তভাবে কাজ করে চলেছে। চার্চের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে যাজকীয় পোশাক পরিহিত যাজক সম্প্রদায় রাজপথের মানববন্ধনে দাঁড়িয়েছে শুধুমাত্র মিথ্যা অপবাদের বিরুদ্ধে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে।
তৃতীয়ত―রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠনগুলো প্রায়শঃই অভিযোগ করে থাকেন―বান্দরবানে জোরপূর্বক খ্রিষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। একটু চিন্তা করুন―দুর্গম রুমা উপজেলায় ১৯১৯ সালে মিশনারীদের উপস্থিতি ছিলো। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও গহীন জঙ্গলে থেকে মানবিক উন্নয়নের প্রাণান্ত প্রচেস্টা করেছেন। মিশনারীরা মানবসেবার উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন―১৯০৭ সালে মিশন হাসপাতাল-চন্দ্রঘোনাতে স্থাপন করে। সত্যিকার অর্থে জোরপূর্বক, লোভ ও ভয় দেখিয়ে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করা যে স্রষ্টার দৃষ্টিতে অমার্জনীয় সেটা তারা জানতেন। পবিত্র বাইবেল বলে―অন্তরে বিশ্বাস ও মুখে স্বীকার ব্যতিত কেউ-ই খ্রিষ্টের অনুসারী হতে পারে না। আর এই অন্তরে বিশ্বাসের ভিত্তিতেই খ্রিষ্টিয়ানিটি প্রসারিত হয়ে থাকে। জোরপূর্বক, লোভ ও ভয় দেখিয়ে খ্রিষ্টের অনুসারী হওয়া যেমন দেশীয় আইনে অপরাধ, আন্তর্জাতিকভাবেও পরিত্যাজ্য। কোনো চার্চই জোরপূর্বক, লোভ ও ভয় দেখিয়ে কাউকেই যীশুর পথে আনেন না। আর যারা জোরপূর্বক, লোভ ও ভয় দেখিয়ে করে থাকেন―তারা যেমন দেশের আইন লঙ্ঘন করে, খ্রিস্টিয়ান সমাজও তাদেরকে ধরিয়ে দিয়ে আইনের হাতে সোর্পদ করতে চাই।
চতুর্থত―চার্চ ও এনজিওয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এনজিওগুলোর কতকগুলো বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যেমন, এনজিও ব্যুরো কর্তৃক নিবন্ধিত হওয়া আবশ্যিক। সুষ্ঠভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে কার্যক্রম, প্রকল্প এবং আর্থিক লেনদেন তদারকি ও পরিদর্শন করতে পারেন। তহবিল আত্মসাৎ, অপব্যবহার বা অননুমোদিত কার্যক্রম পরিচালনা করে, সেক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে। আর আইন বা নিয়ম লঙ্ঘন করলে জরিমানাসহ নিবন্ধন বাতিল হতে পারে। বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম) আইন, ২০১৬ অনুসারে, কোনো এনজিও এমন কোনো কার্যকলাপ করতে পারবে না যা দেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটায়, জনগণের ধর্মীয় অনুভ‚তিতে আঘাত করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে। অপরদিকে চার্চের কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ ভিন্ন। চার্চ পরিচালিত হয়ে থাকে খ্রিষ্ট বিশ্বাসীদের দান ও দশমাংসে, সেটি হোক দেশে কিংবা দেশের বাইরের। বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদে বর্ণিত রয়েছে― ১. আইন, জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতা-সাপেক্ষে (ক) প্রত্যেক নাগরিকের যে কোন ধর্ম অবলম্বন, পালন বা প্রচারের অধিকার রহিয়াছে; (খ) প্রত্যেক ধর্মীয় সম্প্রদায় ও উপ-সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের স্থাপন, রক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অধিকার রহিয়াছে। (২) কোন শিক্ষা- প্রতিষ্ঠানে যোগদানকারী কোন ব্যক্তির নিজস্ব ধর্ম সংক্রান্ত না হইলে তাঁহাকে কোন ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ কিংবা কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা উপাসনায় অংশগ্রহণ বা যোগদান করিতে হইবে না।’ আমরা সহজ সরলভাবেই বিশ্বাস করি, দেশের নাগরিক হিসেবে কোনো ব্যক্তি তার ধর্মকে প্রচার করতে পারে, ধর্ম গ্রহণ করা বা না করা একান্তই সেই ব্যক্তির। তবে অবশ্যই জোরপূর্বক, লোভ কিংবা ভয় দেখিয়ে নয়, সেটি হতে হবে বিশ্বাস, পছন্দ, স্বীকারোক্তি এবং স্বতঃপ্রণোদিতভাবে।
পঞ্চমত―চার্চের কার্যক্রম বলতে শুধুমাত্র গির্জা নয়; এটির আওতায় রয়েছে―বাইবেল স্কুল, চার্চ স্কুল, সানডেস্কুল, কমিউনিটিতে সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা, যাজকীয় পরিচর্যা এবং দায়িত্ববোধ রয়েছে। নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকেই চার্চগুলোতে নিয়মতান্ত্রিক, স্বচ্ছতায় বিশ্বাসীদের আধ্যাত্মিক জীবন যাপনে উৎসাহিত করতে পরিচালিত হয়ে থাকে। এই কার্যসূচিতে নেই কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা, নেই কোনো দূরভিসন্ধি। মানুষের ইণ্টারন্যাল জীবনের পরিবর্তন, ঈশ্বরীয় আদেশ অনুসরণ এবং প্রতিফলন ঘটাতেই চার্চগুলোতে কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়ে থাকে।
ষষ্ঠত―আমরা পর্যবেক্ষণ করেছি যে, ২-৩ এপ্রিল, ২০২৪ সালে কেএনএফের বিদ্র্রোহীরা বান্দরবানের রুমাতে সোনালী ব্যাংক ডাকাতি এবং অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করলে প্রতিবাদে বম জনগোষ্ঠী মানববন্ধন করেছে রুমা বাজারে এবং বান্দরবান সদরেও। ওইদিনও খ্রিস্টান ধর্মযাজকগণ পোশাক পরে উদাত্ত আহবান জানিয়েছিলেন। মানববন্ধন থেকে পথভ্রষ্ট, স্খলিত, দেশদ্রোহী কেএনএফ সদস্যরদের অস্ত্র সমর্পণ এবং লুণ্ঠিত ১৪টি অস্ত্র ও ৪১৫টি গুলি ফেরত দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানান। উল্লেখ্য যে, এই ঘটনায় কেএনএফ সদস্য নিহত ও ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ২৫ জন নারীসহ ৮৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বাংলাদেশ খ্রিষ্টান এসোসিয়েশন, বান্দরবানের পক্ষ থেকে রেভা. লালজারলম বম (সভাপতি) এবং লেলুং খুমী স্বাক্ষরিত স্মারকলিপি জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা বরাবর প্রদান করা হয়। অনুলিপি প্রদান করা হয়― ডা. আ. ফ. ম খালিদ হোসেন, মাননীয় উপদেষ্টা, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়; সুপ্রদীপ চাকমা, মাননীয় উপদেষ্টা, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়; জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা, চেয়ারম্যান, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, ব এসএম রাকিব ইবনে রেজওয়ান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, রিজিওন কমান্ডার, বান্দরবান পার্বত্য জেলা; অধ্যাপক থানজামা লুসাই, চেয়ারম্যান, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ; শামীম আরা রিনি, জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, বান্দরবান পার্বত্য জেলা; কর্নেল জিএস, বান্দরবান শাখা, ডিজিএফআই, বান্দরবান পার্বত্য জেলা; মো. শহিদুল্লাহ কাওছার, পুলিশ সুপার, বান্দরবান পার্বত্য জেলা; জনাব নির্মল রোজারিও, বাংলাদেশ খ্রিস্টান এসোসিয়েশন। উল্লেখিত দাবিগুলো হলো―
১. খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সকল প্রকার বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠন’ মর্মে মিথ্যা অপপ্রচার বন্ধ করতে হবে;
২. সকল প্রকার ধর্মীয় কার্যক্রমে হয়রানি বন্ধ করে স্বাধীনভাবে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে;
৩. খ্রিস্টান ধর্মান্তকরণের নামে এনজিও কার্যক্রম বাস্তবায়নে সকল প্রকার ষড়যন্ত্রমূলক হয়রানি বন্ধ করতে হবে এবং
৪. পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি ও ধর্মীয় বিভেদ উসকে দেওয়ার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
আমরা মনে করি, পার্বত্য জেলাসমূহের খ্রিষ্ট বিশ্বাসীদের দাবি-দাওয়া ও বক্তব্যগুলো সরকারের গুরুত্বসহকারে অনুধাবন করা আবশ্যিক। দেশের অভ্যন্তরের নাগরিকগণ তথা ধর্মীয় বিশ্বাসীগণ একে-অপরের মধ্যে বিভেদ, অনৈক্য এবং দোষারোপ প্রবাহমানভাবে চলতে থাকে; এটি আমাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ, এটির আশু সমাধান দরকার। আমাদের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেই আন্তর্জাতিক চাপ ও ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করা সম্ভবপর।






Users Today : 78
Views Today : 92
Total views : 174645
