চোখ বন্ধ করে কি ভাবা যায়! কিনা কি মাথায় আসবে তা আবার বলতে হবে তারপর শুনে আবার হাসবে সবাই। বাদ দিই.ভাবনা নিয়ে ভাবনা। ভাবলেই বলতে হবে এমন কোনো কথা নেই। যদি জিজ্ঞেস করে শুরুটা না হয় বলা যেতে পারে। বাকিটা চাপা থাকবে। না হয় একটা চাপা মেরে দেওয়া যেতে পারে। শুরু হোক তাহলে ভাবনা। চোখ বন্ধ। বিরক্ত লাগে এদিক ওদিক থেকে হঠাৎ শব্দ এলে। চোখ বন্ধ করে ঘুমানো যায় বা ঘুমানো চেষ্টা করা যায়। কিন্তু ভাবা যায়!
চোখ তো বন্ধই। মরার কাক! এভাবে ডাকে কেনো। কোনো বিপদটিপদ আছে নাকি! কাকটি ডাকতে ডাকতে উড়তে লাগল। উড়তে উড়তে আরেক জায়গায় বসছে। কিছু দানাদার পেয়ে খেয়েই আবার উড়াল। এবার দেখি ঝাঁক বেঁধে উড়ে এলো। জায়গা পাওয়া যাবে তো। বাড়ির ছাদে কে যে অমন ভাত ছিটাল কে জানে! যায় ছো মারি একটা। ওমা আমার ঠোটে তোলা ভাত তুই কেন টান দিস। না দিব ন্ট… দূরে গিয়ে মর! দিব না। দু পা আগাবি তো খবর আছে। যা… আরো যা! গেছে দেখি। আবার আগায়! যাক, পেলাম কিছু। এবার উড়াল।
প্রতিদিনকার মতো আজও দল বেঁধে আবার ডাকতে ডাকতে ভোর নামলো। ভোরে ভোরে উড়ে উড়ে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। কিন্তু কোনো ফায়দা নেই। এই দিলাম উড়াল। দেখি, ওই ঝাঁকে গিয়ে দেখি কি হচ্ছে। উঠোনে নামছে। গ্রিলের জানালার বাইরে এক হাত বাড়িয়ে কি যেন ছুঁড়ে দিচ্ছে উঠোনের দিকে। আর সব কাকের দল প্রতিযোগিতায় নেমে খাওয়ার তালে আছে। দেখি আমার সুযোগ হয় কিনা! হাত বের করে আবার ছুড়ে দিচ্ছে মুড়ি। ধরি তো উড়ে এসে! মাটিতে পড়তে দিব না, তার আগেই গপাস। বেশ ধরতে পারছি তো উড়ে উড়ে! আমার দেখা দেখি দেখে বাকিরাও উড়ে উড়ে ধরছে, মাটিতে পড়তে দিচ্ছে না। এবার একটু পিছিয়ে পড়লাম। অপেক্ষা করলাম। হাতগুলো তখনও ঘন ঘন জানালার বাইরে রেখে ছুঁড়ে দিচ্ছে মুড়ির দানা। আমি সাহস করে জানালার ওর গিয়ে বসি। লক্ষ করলাম এক বয়স্ক মহিলা। চামড়া কুচকানো কালো। গায়ে চাদর। জানালার বাইরে হাত বের করে খাবার ছুঁড়ে দিয়ে বিড়বিড় করে কিছু একটা বলে আর একটু হাসে। জানালার গ্রিলে বেশিক্ষণ পা দিয়ে আঁকড়ে রাখা সম্ভব না। আরেকটা গ্রিলে গিয়ে বসি। দেখি আরেকটু সুযোগ হয় কিনা। না বুড়ির মুখোমুখি চলে আসায় তালি বাজিয়ে তাড়াল। আজকের মতো এখানেই শেষ। তবে দানাদার কত রকমের খাবার! ভালোই ছিল। আগামী কয়েকদিন এই দিকটাই আবার আসবো। চিনব কিনা কে জানে! পুরোনো তিনতলা বাড়ি, নিচে উঠান। বাড়ির পাশে সুপারি গাছ আর আরেকটা নারকেল গাছ। বাড়ির সামনে উঠান, তারপর দেয়াল দিয়ে ঘেরা। দেয়ালের বাইরে এক কোণায় একটা ইলেক্ট্রিকের খাম্বা আর এই খাম্বার সাথে যুক্ত লম্বা কয়েকটা তার গিয়ে আরেকটা দূরের খাম্বায় মিলিয়ে গেছে। উড়ে গিয়ে দেখে আসা যাবে কোনো এক সময় ওই খাম্বার আশে পাশে কি আছে। যাগ গে, বুড়ির ঘর খুঁজে পাওয়ার জন্য এই যথেষ্ঠ। না হলে আবার কি ঝাঁকের কাকগুলোকে অনুসরণ করবো!
ভোর তো হলো। ছুটাছুটিও হলো। কালকের মতো প্রতিযোগিতায় নামার সুযোগ এখনো পাইনি। এপাশ ওপাশ উড়ে কলাগাছ পেলাম। কিন্তু ওখানে বসা যায়! কি যে করি! জায়গাটার কাছাকাছি বোধ হয় আছি। ওই, ওইতো ঝাঁক বেঁধে আসছে। দেখি আরেকটু আগায়। আরে বাহ! জায়গা বরাবর। সেই তো বিস্কুটের দানা। বুড়ি জানালা দিয়ে ছুঁড়ে মারতেই ঠোঁট খুলে ঢুকিয়ে নিই। জা্নালার কাছে একটু আগে গিয়ে বসি। ভালোইতো জুটছে। আমার পাশে বসছে আরেকটা। যা… খা…হারামি! বুড়ির হাতে ঠোঁট মারতে গেলি কেন! দূর হো। বুড়ি কি দিবে না আর! দিচ্ছে তো!। বুড়ি বলে দিচ্ছে। ওর ছেলে-পুলে ধারে কাছে থাকলে নির্ঘাত তাড়াত। আমি জানালার গ্রিলগুলো একটা একটা পাড় করে আকড়ে ধরি আর দেখি বুড়ির মশারি দড়ি এখনো গ্রিলে গিট্টু মারা। জানালার কাছে বিছানায় বুড়ি বসছে আর কিসের যেন একটা প্যাকেট থেকে খুলছে। এদিকে আমরা ডেকে অস্থির। বুড়ি বিড় বিড় করে কি যে বলে বুঝি না। দাঁড়াব না যাব! বুঝতে পারছি না। প্যাকেট খুলছে। দিচ্ছে, দিচ্ছে এইতো দিচ্ছে! এই যা খালি করে দিলো! যাক খাওয়াও হলো বেশ। আজ গতকালের তুলনায় আমরা সবাই একটু বেশি ছিলাম। এই ঝাঁকটি আমার চেনা হয়ে গেছে। কতদিন ধরে বুড়ি এই ঝাঁককে খাওয়ায় কে জানে! কাল আবার আসব।
সকাল হতেই উড়াল! আজ আগে ভাগে হাজির। আমার সাথে আরো নামছে। বুড়ির জানালা এখনো খোলা হয়নি। দোতলার কার্ণিশে কিছু পাই কিনা দেখি। নাহ সব শ্যাওলা। ছাদে একটু ঘুরে আসি। পানির টাংকি আর নলের উপর কিছুক্ষন চড়ে বেড়ালাম। মাছের শুকনো কাঁটা ছাড়া কিছু নেই। তাও আবার ওই কাঁটাগুলোয় পিঁপড়া ধরে গেছে। যাই এতক্ষণে মনে হয় বুড়ি জানালা খুলেছে। ঝাঁকের বাকিরাও এসে গেছে সময়মতো। কিন্তু বুড়ি কোথায়? আজ এতক্ষন। একটু উড়ে গিয়ে জানালার সামনে বসলাম। আমার জানলার ওপর আকড়ে ধরা দেখাদেখি দেখে বাকিরা আসার চেষ্টা করছে। কিন্তু জানলার ওপরে এত কাক কিলবিল কিলবিল আর ছুটাছুটি করছে দেখলেতো বুড়ি তালি মেরে হুস হুস করে তাড়িয়ে দেবে। কিন্তু বুড়ি কোথায়! বিছানাটা তো গোছানো। মশারিটাও গুটানো। বুড়ির দেখা নাই । জানালার ধারে কাছে আর কেউ নেই। আর জানালার বাইরে এই কাকের দল ছাড়া কেউ নেই। কা কা কা করতে করতে ক্লান্ত। বুড়ি কি জানতো না আজ আমরা আসব! ওরে কাকের দল আস্তে আস্তে! জানালা দিয়ে ঢুকে পড়লে আরেক আপদ। কি এক ব্যাপার দেখালাম জানালায় ঝুলে থাকা! ঝাঁক বেঁধে গিয়ে ছোট্ট একটা জানলার গ্রিল ধরে টানাটানি! তোদের ভয়েই তো কেউ আর জানলার সামনে আসবে না। সত্যিই তো এখনো কেউ আসছে না! তবে কি এখানেই শেষ! আবার নতুন কোনো বুড়িকে খুঁজতে হবে! দূর এইখানে আর কতক্ষণ দাঁড়াব! বুড়ির অনুপস্থিতিতে আমাদের এই কা কা কি কেউ শুনতে পাচ্ছে না! ঐ, ওই তো আসছে! জানলার সামনে কেউ একজন আসছে। যাই একটু দূরে গিয়ে দেখি। ওরে সর সর তোরা! যা হুশ করে খেদালো তো! কিন্তু বুড়ি তো না, কে সে? বুঝে উঠার আগে দপাস করে জানলা দিল বন্ধ করে! হলো তো! আর কি! খালি মুখে এবার উড়াল দিই। আর ভালো লাগছে না। ক্লান্ত লাগছে। অনেক্ষণ জানালায় ঝুলে খালি মুখে ফিরবো? যাই এই একটু উপড়ে কোথাও গিয়ে বসি। দেখা যাক কোনোদিকে যেতে পারি। এই খাম্বাটায় বসলে অনেক ওপড় থেকে রাস্তারগুলো দেখা যায়। বুড়ির বাড়ির সামনের খাম্বার তার গুলো যেদিকে গেছে তা অনুসরণ করলে নতুন কোনো জায়গা মিলবে। আশা করি নতুন কোনো বুড়ির খাবার জুটবে। ঝাঁকের কিছু কাকের সাথে জুটলাম, সবার কপাল আমার মতো, তাই একজোট। খাম্বার এই তারের ওপর চড়ে বেশ ভালোই লাগছে। তারের এরকম দুলুনীটা এই ক্লান্ত দেহে বেশ লাগছে। চিঁত চিঁত কিসের শব্দ! এরা আবার পাশ থেকে কোথায় উড়াল দিচ্ছে। অদ্ভুত! চিঁত চিঁত ছ্যাঁত ছ্যাঁত ঠুস… দুরুম!
ঠাস! ঠাস! ঠাস! কাঁপুনি দিয়ে চোখ খুললাম। এমন জোরে তালি বাজাতে হয়। তাও একটা না দুইটা না তিনটা তালি। ভয় পেয়ে গেছিলাম। আমার শিউরে ওঠা দেখে পাশেরকয়েকজন মুচকি হাসে। ফাঁকিবাজ!





Users Today : 141
Views Today : 181
Total views : 182029
