বাঙালি রাষ্ট্রের চলমান পুরুষতান্ত্রিক ইতিহাস
বাংলাদেশে আদিবাসীদের যেমন সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নাই ঠিক তেমনি আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধারাও স্বীকৃতি-পরিসংখ্যান এবং গ্রন্থনের জায়গাতে অবহেলিত। রাষ্ট্রের এই অবহেলা ও বৈষম্যের অচলায়তন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকেও বারবার কেবলমাত্র বাঙালি জনগণের লড়াই হিসেবেই জাহির ও হাজির করে। যেখানে আদিবাসীদের আত্মত্যাগ ও সংগ্রাম ইতিহাসের তলানিতেও জায়গা পায় না। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ হয়ে উঠে কেবলমাত্র পুরুষেরও ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণকে এই পুরুষতান্ত্রিক ইতিহাস গ্রন্থন কাঠামো স্বীকার করে না বা করতে চায় না। আবার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধার চরিত্রকে হাজির করা হয় কে কতগুলো গ্রেনেড ছুড়েছে, কে বন্দুক দিয়ে কতজনকে শেষ করেছে এইরকমের কথিত পুরুষালি কায়দার আবহের ভেতর দিয়েই। তাই প্রচলিত ইতিহাস কাঠামোয় মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক জনগণের সত্যিকারের ইতিহাস গ্রন্থন এবং জনগণের সত্যিকারের মুক্তিসেনাদের স্বীকৃতি ও মর্যাদার বিষয়টি নিশ্চিত হয় না। সার্বিক দিক থেকে রাষ্ট্রের পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোই মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত ইতিহাসকে পুরুষতান্ত্রিক পেশীবহুল করে তুলে। নারীর দ্রোহের স্ফ’লিঙ্গকে পুরুষতান্ত্রিক কয়লায় চাপা দিয়ে নারী ধর্ষণ এবং নিপীড়নের পুরুষালি বর্ণনাই হয়ে ওঠে প্রচলিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। যেখানে পুরুষতান্ত্রিক তুষের আগুনে চলমান থাকে নারীর প্রতিরোধের গুমরানো। ‘তিরিশ লাখ মা-বোনের ইজ্জত/সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে’ এই রকমের পুরুষতান্ত্রিক পরিসংখ্যান দিয়েই মুক্তিযুদ্ধে নারীর অস্তিত্বেকে প্রচলিত ব্যবস্থা উপস্থাপন করে, যা একইসাথে মুক্তিযুদ্ধে নারীর ঐতিহাসিক অংশগ্রহণ এবং অস্তিত্বকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। চলমান এই পুরুষতান্ত্রিক ইতিহাস গ্রন্থন প্রক্রিয়া তাই একপেশেভাবেই প্রান্তিক জাতির নারীর মুক্তিযুদ্ধর বিবরণকে পাঠ করে এবং নিজের পাঠ পদ্ধতির মাধ্যমে আমাদেরকে পাঠ করতে বাধ্য করে।




Users Today : 49
Views Today : 60
Total views : 177945
