বিগত ২৪ মার্চ পুনর্বার সরেজমিনে উপস্থিত হয়েছিলাম সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার হরিণখোলাতে। ‘ন্যাশনাল খ্রিষ্টিয়ান ফেলোসিপ অব বাংলাদেশ’র সাধারণ সম্পাদকের সাথে সফরসঙ্গী হয়েছিলাম। প্রথমবার গিয়েছিলাম ৫ নভেম্বর, ২০২১ খ্রিষ্টাব্দে। হরিণখোলাতে পৌঁছে আবার অনুভব চেষ্টা করেছি, খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী তারক দাস ও তার পরিবারের সদস্যদের আতঙ্কিত চোখ-মুখ যেন কথা বলছে। তারকের পরিবারে রয়েছে মেয়ের ঘরের ৭/৮ এক পুত্র সন্তান। আমরা যতক্ষণ ছিলাম, পুরোটা সময়ই আমাদের সাথে সাথেই ছিলে, এ যেন কিছু না বলা কথাগুলোই বলার চেষ্টা করেছে। দীর্ঘ কয়েক মাসের মধ্যেও দুর্বৃত্তদের হামলার চিহ্নগুলো ঘরের টিনের চাল ও বেড়াতে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছিল। তারক দাস আমাদেরকে জানান, ন্যায় বিচারের প্রত্যাশায় প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, লুট করে নিয়ে যাওয়া ছাগল ফিরে পাওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি, শারীরিক-মানসিক ট্রমা থেকে উত্তরণের জন্যে স্থানীয় গণ্যমান্যদের সহযোগিতা কামনা করেছেন কিন্তু বিচারের বাণী যেন নীরবে নিভৃতে কাঁদে। জানাচ্ছিলেন, এখনো চেনা-অচেনা লোকেরা বারংবার হুমকি দিয়ে থাকে, উচ্ছেদ কিংবা মেরে ফেলার মতো দুর্ধর্ষ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে থাকে। বোঝা গেছে, সত্যিই ভালো নেই হরিণখোলার তারক দাসের পরিবার।
জেনেছি মি. তারক দাসের মামলার দায়িত্ব বর্তেছে, পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ওপর। সেই সূত্রে সাতক্ষীরার পিবিআই অফিসে পেীঁছেছিলাম। পিবিআই কর্মকর্তা রইচের সাথে দীর্ঘ সময় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। রইচ আমাদেরকে আশ্বস্ত করেন যে, তারক দাসের মামলার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করবেনই। আমাদের বিশ্বাস সত্য উদঘাটিত হলেই দোষী ব্যক্তিরা আইনানুযায়ী শাস্তি এবং অত্র এলাকায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ-ই নয়, এ সত্যটি হরিণখোলার আকাশ-বাতাসে মিশে গেলে তারক দাসের ঘুরে দাঁড়ানো স্বার্থক হবে। এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করেছি, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রিয় ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের সাথেও। একজন খ্রিষ্টানুসারীর প্রতি এরূপ দুর্বৃত্তমূলক আচরণ, স্থাপনার ক্ষয়-ক্ষতি এবং জীবনের প্রতি হুমকি কোনোভাবেই গ্রাহ্য নয়। যারাই তারক দাসের পরিবারকে সামাজিকভাবে, ধর্মীয়ভাবে অপদস্ত করার অপচেষ্টা করেছে, তাদেরকে আইনের আওতায় আনা আবশ্যিক।
হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-মুসলমান-অন্ত্যজ জনগোষ্ঠী বসবাস সাতক্ষীরার তালাতে। অতীতের ঐতিহ্য ছিল, একে-অপরের সুখে-দুঃখে, উৎসব-অনুষ্ঠানে কিংবা পূজা-পার্বণে সামিল হওয়া, একাত্ম হয়ে যাওয়া; সেটি যেন ক্রমশই ক্ষীণ হয়ে আসছে। রোপিত সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প যেন মহীরুহে পরিণত হতে চলেছে। একটি দৃষ্টান্ত, একটি উদ্যোগ এবং একটি ন্যায় বিচার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপনের পথ দেখাতে পারে।
মিথুশিলাক মুরমু : গবেষক ও লেখক।





Users Today : 4
Views Today : 4
Total views : 180910
