গাইবান্ধার আদিবাসী সাঁওতালদের রক্তক্ষরণ যেন আরো বাড়িয়েছে ‘পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন’ (পিবিআই) প্রদত্ত চার্জসিট রিপোর্ট। ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের ৬ নভেম্বর প্রকাশ্যে দিনের আলোয় চিহ্নিত ব্যক্তিবর্গের ইন্ধনে, চিহ্নিত ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে জয়পুর—মাদারপুর সাঁওতাল পল্লীর অসংখ্য ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ৩ জনকে গুলি করে হত্যা এবং বহু সংখ্যক ব্যক্তিবর্গ সংঘর্ষে আহত হয়েছিলেন। রোদ—ঝড়—বৃষ্টি মাথায় নিয়ে আগুনে পোড়ানো ঘরের পাশেই দিনের পর দিন গাছপালার ডাল, পলিথিন দিয়ে ছাউনি করে ন্যায় বিচারের আশায় বুক বেঁধেছিলেন ঘর পোড়া মানুষগুলো। স্বজন হারানোর বেদনা, নাড়ি পোতা ভূমি থেকে উচ্ছেদ এবং শারীরিক যন্ত্রণাময় জীবনে তৎকালীন সময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রেরিত খাদ্য সহযোগিতা প্রথম পদক্ষেপে ফিরিয়ে দিলেও তাঁর সদর্প হস্তক্ষেপকে সম্মান জানিয়ে সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুসলমানরা ফিরিয়ে দেওয়া ত্রাণ গ্রহণে গুটানো হাত বাড়িয়েছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনা’র প্রতি আস্থা, বিশ্বাস, সম্মান, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা থেকেই সাঁওতালরা দুহাত প্রসারিত করে ঘরে এনেছিলেন ত্রাণসামগ্রী। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার ন্যায় বিচারের প্রতি দৃঢ়চেতা মনোভাব, অসত্যের সাথে আপোশহীন এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক বলেই সাঁওতালরা তাঁর প্রতি দুর্বল, তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টায় রত এবং ন্যায় বিচারের প্রত্যাশী।
ইতোমধ্যে বেশ কয়েক বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, সরকারি কর্মকর্তাগণ কিংবা প্রশাসনে যারা যুক্ত রয়েছেন; হয়তো তারাও বেমালুম ভুলে গিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে উপদেষ্টা—মন্ত্রীগণ আদিবাসীদের জন্য কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—
১. গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের ভূমিহীন সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষকে আশ্রয়ন প্রকল্পের আওতায় ঘরবাড়ি বানিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল (১৬.১১.২০১৬ বাংলা নিউজ ২৪.কম)
২. শেখ হাসিনা ভালো শাসক। তার চেয়ে আপন, আপনারা অন্য কাউকে পাবেন না। তার সিদ্ধান্ত মেনে নেন। গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের (২৩.১২.২০১৬ রাইজিং বিডি ডট কম)
৩. সাঁওতাল আদিবাসীদের দুঃখ-দুর্দশার কথা চিন্তা করে আপনাদের জন্য দুটি আশ্বাসের কথা আমি প্রধানমন্ত্রীকে জানাব। একটি হচ্ছে আদিবাসী ভূমি কমিশন গঠন, অপরটি মনোরঞ্জন শীল গোপাল এমপির উত্থাপিত কাহারোল উপজেলায় ইপিজেড স্থাপন—প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্ট ড. গরহর রিজভী (২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ভোরের কাগজ)।
আদিবাসীরা বারং বার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে স্মারকলিপি প্রেরণ করেছেন স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে। সত্যিই কি সেই স্মারকলিপি মহানুভব প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পৌঁছিয়েছে! বিশ্বাস করি যদি পৌঁছাত, তাহলে আজ বিচারের নামে প্রহসন কিংবা তদন্তের নামে এরূপ লুকোচুরি খেলা হতে পারতো না। তাঁর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় স্বীকারোক্তি করেছেন, ‘১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহ না হলে আমাদের স্বাধীনতা আসত না। সাঁওতাল বিদ্রোহই পাকিস্তানিদের বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, আমাদের তীর-ধনুকের কাছে তাদের কামানের গুলি তুচ্ছ।’ যে সাঁওতালরা জীবনের মায়াকে তুচ্ছ করে লড়েছিলেন, আজ তাদেরই অস্তিত্ব প্রশ্নের সম্মুখীন!
দীর্ঘ দিন পর গাইবান্ধা গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল পল্লীর চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। অত্র এলাকার নেতৃবৃন্দরা যে বিষয়টি ধারণা করেছিলেন, সেটিই রূপায়িত করলেন পিবিআই। তৎকালীন সময়ের গণমাধ্যম থেকে জেনেছি-সাঁওতালরা তৎকালীন সাংসদ আবুল কালাম আজাদ, চিনিকলের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুল আউয়াল, গাইবান্ধা জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ হোসেন ফকু, তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান, উপজেলার কাটাবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রফিকসহ চিহ্নিতদের নামে এজাহারভুক্ত করেছিলেন; উপস্থাপিত চার্জশিটে তাদের নাম অনুপস্থিত রয়েছে। সরকারের দক্ষ ও নিষ্ঠাবান বাহিনী হিসেবে পিবিআই বেশ সুনাম ও সুভাস ছড়িয়েছি। তবে হ্যাঁ, পিবিআই’র প্রতি আদিবাসী সাঁওতালদের যে বিশ্বাস, আস্থা ও ভালোবাসা ছিলো, এরূপ একটি বিতর্কিত চার্জশিট জমা করে ভালোবাসার রংকে বিবর্ণ করে তুলেছে; বিশ্বাস ও আস্থার জায়গাকে করেছে কর্দমাযুক্ত।
আমরা দেখেছি, গাইবান্ধা আদিবাসী সাঁওতালরা শান্তিপূর্ণভাবে পিবিআইয়ের দাখিলকৃত চার্জশিটের বিরুদ্ধে অবস্থান ধর্মঘট, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সমীপে স্মারকলিপি প্রদান এবং সচেতনতা গড়ে তুলতে বক্তব্য দিয়েছেন। আদিবাসী সাঁওতালরা পিবিআইয়ের জমাদানকৃত চার্জশিটের ৯০ জনের পরিবর্তে উল্লিখিত ৩৩ জনের নামে মামলা দায়েরকৃত ব্যক্তিবর্গের নামে চার্জশিট প্রদানের দাবী করেছেন। ‘দৈনিক প্রথম আলো’ সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করেছে, ‘…এই প্রেক্ষাপটে পিবিআইয়ের অভিযোগপত্রে তাঁদের নাম না থাকার বিষয়টি সত্য আড়াল করার প্রয়াস ছাড়া কিছু নয়। তদন্তের নামে এ ধরনের প্রহসন কাম্য নয়। আগেও দেখা গেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কেউ জড়িত থাকলে তাঁদের রক্ষা করতে তদন্ত দল নানা কারসাজি ও অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে থাকে। পুলিশ বিভাগের কোনো সদস্যের অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত কিংবা বিচারের মুখোমুখি হওয়ার দায় পুরো পুলিশ বাহিনীর ওপর পড়ে না। বরং অপকর্মের সঙ্গে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাকে বাঁচাতে গেলে সেই দায় বাহিনীর ওপরই পড়ে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নিজেই যদি আইনের নিজস্ব গতিকে এভাবে রুদ্ধ করে দেয়, তাহলে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার আর উপায় থাকে না’ (প্রথম আলো ৩১.৭.২০১৯)। অনুরূপভাবে দৈনিক সংবাদ ৩০ জুলাই, ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করেছেন, ‘…আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব সংস্থার কাজই যদি এভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর আস্থা নেই বলেই তো দেশে গণপিটুনির মতো ঘটনা ঘটছে। যার পেশিশক্তি আছে, সে নিজেই যার বিরুদ্ধে যেমন ইচ্ছা ব্যবস্থা নিচ্ছে। আর সাঁওতালদের মতো দুর্বল যারা, তারা বারবার অন্যায়-অপরাধের শিকার হচ্ছেন। রাষ্ট্র তাদের সহায় হচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিতর্কিত ভূমিকার কারণে তারা আইনের আশ্রয় বা প্রতিকার কোনটাই পাচ্ছেন না। আমরা বলতে চাই, পিবিআইয়ের চার্জশিট গ্রহণযোগ্য নয়। সাঁওতাল পল্লীতে হামলার ঘটনার পুনঃতদন্ত করতে হবে। সেই তদন্তে ভিডিও ফুটেজ, গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি, চাক্ষুস সাক্ষ্য, মামলার এজাহার প্রভৃতিকে আমলে নিতে হবে।’
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি গাইবন্ধার সাঁওতালদের বিষয়ে অবগত রয়েছেন, অবগত রয়েছেন তাদের প্রতি অবহেলা, অন্যায্য ও অবিচার সম্পর্কে। সাঁওতালরা আপনাকে আপন ভেবেই স্মারকলিপির মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য, সত্য জানানোর শান্তিপূর্ণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে; দয়া করে শোনার চেষ্টা করুন। উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী হলেও তারা আজ অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সংগ্রাম করছে, তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করুন। আপনার সহানুভূতি এবং সামান্যতম ইচ্ছায় সাঁওতালদের ন্যায় বিচারের রুদ্ধ দ্বারকে উম্মুক্ত করবে।
মিথুশিলাক মুরমু : আদিবাসী বিষয়ক গবেষক ও লেখক।





Users Today : 3
Views Today : 3
Total views : 180737
