ভারত আমাদের অনেক ভালো ও ‘পরীক্ষিত’ বন্ধু। বাংলাদেশের যেকোনো বিপদে সবার আগে ভারত এগিয়ে আসে, সেই ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে আজ অবধি তারা পাশে আছে পরম বন্ধু হিসাবে। তার পরেও কূটনৈতিক কারণে কিছু সময় কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছুটা টান-পড়া লাগে। তবে খুব তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক হয়ে যায়। বিশ্ব দরবারে আমরা তাদের সাথে বিভিন্ন সংগটনে যুক্ত থেকে কাজ করে যাচ্ছি। ভারতের সাথে আমাদের যুগান্তকারী কিছু চুক্তি হয়েছে-গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি, ছিটমহল চুক্তি, সীমান্ত চুক্তি, বন্দি-বিনিময় চুক্তি, বাণিজ্য চুক্তি ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি। কিন্তু তার পরেও বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের দাবি তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি যা দীর্ঘদিন থেকে ঝুলে আছে। কোনো সমাধান হচ্ছে না। এ বিষয়ে ভারতের উচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে বাংলাদেশের উচ্চ পর্যায়ের অনেক বার বৈঠক হয়েছে কিন্তু ফলপ্রসূ কিছু হয়নি। তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী-হিমালয়ের চিতাসু পাহাড়ের সিকিমে উৎপত্তি হয়ে ৭০০ কি. মি. পথ অতিক্রম করেছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, দার্জিলিং, শিলাগুড়ি দিয়ে বয়ে বাংলাদেশের নীলফামারীর দহগ্রাম দিয়ে প্রবেশ করে ৫ টি জেলা অতিক্রম করে চিলমারীরতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্রে পতিত হয়েছে।
জলপাইগুড়িতে তিন ধারায় (পূবর্দিকে করতোয়া, পূবর্ভবা, আত্রাই) প্রবাহিত হওয়ার কারণে তিস্তা নামকরণ করা হয়। ১৯৪৭ সালে তিস্তার গতিপথ কিছুটা পরিবর্তন হয়। এই নদীর সঙ্গে ভারতের ৮০ লক্ষ ও বাংলাদেশের ২ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত।
তিস্তা যেহেতু আন্তর্জাতিক নদী সেহেতু আন্তর্জাতিক আইন অনুয়াযী তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি হওয়া উচিত। ২০১৪ সালের পর থেকে খরা মৌসুমে তারা কোনো পানি দেয় না, কিছু বললে তারা বলে নদীতে পানি নাই। এটা সত্যি তিস্তার পানি অনেকটা কমে গেছে। তবে যা পানি আছে তা তো নদী আইন অনুযায়ী বণ্টন করা দরকার, করা উচিত! ১৯৮৩ সালে একবার পানি চুক্তি হয়েছিল মন্ত্রী পর্যায়ে ২৫% পানি নদীর জন্য রেখে বাকি বাংলাদেশ ৩৬% ও ভারত ৩৯% পানি পাবে। এর পর আর কোনো চুক্তি হয়নি। ২০০৭ সালে চুক্তি নবায়ন করার জন্য ২০% সংরক্ষণ করে বাকি পানি সমানভাবে বণ্টনের প্রস্তাব দিলেও কোনো প্রতিক্রিয়া তাদের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। তারা কোনো নদী আইন মানছে না।
তারা বারবার হটকারিতার পরিচয় দিচ্ছে। তারা সমস্যা সমাধান না করে, কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ওপর দোষারোপ করছে, তারা চাইলে উভয়ে মিলে কাজটা করতে পারত। কিন্তু না করে বরং বাংলাদেশের মানুষকে অনিশ্চয়তার মুখমুখি দ্বার করিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশে তিস্তা নদীতে পানি প্রবাহ না থাকার কারণে পলি পড়ছে। আর পলি পড়ার কারণে নদীর গভীরতা কমে হচ্ছে অনকাক্সিক্ষত বন্যা, চর পড়ে, আবাদি জমিতে বালি ও নুড়ি পড়ে। নেপালের এইসিএইএমওডি নামে একটি সংগঠন যারা পাহাড় উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে তাদের তথ্যমতে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২৭টি প্রকল্প করেছেন (২০১২ সাল), এই পানি দিয়ে তারা ৯ লক্ষ হেক্টর জমিতে পানি দেয়, আর বাংলাদেশ চায় ৭ লক্ষ হেক্টর জমিতে পানি দিতে চায়। তারা এই পানি দিয়ে পাওয়ার বিদ্যুৎ প্রকল্প করেছেন, এবং ২১ টি ড্রামে করে পানি জমা করে রাখেন যাতে শুকনো মৌসুমে তা ব্যবহার করতে পারেন। ১০% পানি তারা গজনডোবায় খাল কেটে নিয়ে গিয়েছেন। গজনডোবার ২৫ কি.মি আগে একটা কেনেল কেটে মহানন্দা নদীতে পানি নিয়ে যাওয়া হয়।
এক কথায় বলতে গেলে তিস্তার পানি বাংলাদেশে এখন আর আসে না। যা আসে তা বন্যার পানি, আর বন্যা পানি সবকিছু শুধু ভাসিয়ে নিয়ে যায় না, সর্বসান্ত¦ করে দিয়ে যায়। বন্যা কবলিত মানুষ বন্যার সময় রিলিফ চায় না, তারা চায় তিস্তার সঠিক পানি বণ্টন। খরা মৌসুমে তিস্তা হাহা কার করে এক ফোটা পানির জন্য। কোনো আবাদ হয় না পানির অভাবে। আবার বন্যার মৌসুমে সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। শুধু একবার দুবার নয় বারবার বন্যা আসে এক মৌসুমে। ঘরের চালের ওপর দিয়ে বয়ে যায় সেই পানি। পানি যখন দীর্ঘস্থায়ী হয় তখন তিস্তাপাড়ের মানুষেরও কষ্ট বাড়ে সমান তালে। থাকে না থাকার কোনো ব্যবস্থা। গবাদী পশু-পাখি নিয়ে পড়তে হয় বিপদে অনেক সময়। বন্যার পানি সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সব ধরনের ফসল নষ্ট হয়। আর এই কারণে এই অঞ্চলের মানুষকে চরম আর্থিক সংকটে পড়তে হয়।
নদী আইন অনুয়াযী ভারত দৈনন্দিন ব্যবহারিক কাজে, সেচ প্রকল্প পানি ব্যবহার করতে পারে কিন্তু তারা এই পানি দিয়ে কোনো মেগা প্রকল্প করতে পারে না। আর ভারত সরকার সেটাই করছে। তারা আমাদের পানি না দিয়ে, তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি না করে বরং তাল-বাহনা করছে। বাংলাদেশ চাইলে মহানন্দার পানি দাবি করতে পারে। এই নদী বাংলাদেশে চাঁপাইনবাবগঞ্জ দিয়ে প্রবেশ করেছে।
কিন্তু এখানে একটা প্রশ্ন থেকে যায়। সবকিছুর পরেও কেন আমাদের পরম বন্ধু আমাদের সাথে এই তাল-বাহনা করছে তিস্তা নিয়ে? কেন বারবার গরিমসি করছে চুক্তি না করে? কেনই বা বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক আইন থাকার পরেও কোনো সিন্ধান্ত নিচ্ছে না? কেন নীরব?
সমস্যা মূল কারণ হিসাবে যে সব বিষয়গুলোকে ধরা হয় :
১) প্রকৃত কারণ : এটা সত্য যে তিস্তার পানি কমে গিয়েছে
২) পারিপার্শ্বি কারণ : পশ্চিমবঙ্গ সরকার বলছে, এটা কেন্দ্রের কাজ। আবার কেন্দ্রীয় সরকার আবার মমতা ব্যানার্জিকে দায়ী করছে। এটা তাদের তালবাহনা ছাড়া আর কিছু না। এবং তারা যদি তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি করে তাহলে তাদের মেগাপ্রজেক্টগুলো অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। কথিত আছে, পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলিট শ্রেণীর মুসলিম আছে, যারা বর্তমান আওয়ামী লীগ গভর্মেন্টকে পছন্দ করে না, যেহেতু পশ্চিমবঙ্গে ২৭% মুসলিম তাই মমতা নাকি তাদের ক্ষেপাতে চাচ্ছে না, তাই তিনি নাকি এই চুক্তির বিরোধীতা করছে।
যেহেতু তারা চুক্তি করছে না তাই বাংলাদেশ সরকার আন্তার্জাতিক নদী আইন অনুয়ায়ী বিষয়টি সমাধান করতে পারে। অন্যদিকে সরকার তিস্তা চায়না প্রকল্পও গ্রহণ করতে পারে।
প্রস্তাবিত চায়না তিস্তা প্রকল্প : তিস্তা প্রকল্প বাংলাদেশের সীমানার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদীর ১১৫ কিলোমিটার ব্যাপক খনন করা হবে। এতে নদী শাসন করে অনেক আবাদী জমি উদ্ধার করা সম্ভব। এসব জমিতে বিশাল আকারে চাষের উপযোগী করা যাবে। চার লেনের ১১৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হবে। বর্ষাকালে বিপুল উদ্বৃত্ত জলরাশি সংরক্ষণের জন্য জলাধার সৃষ্টি করে শুল্ক মৌসুমে নদীর তীরে সেচের ব্যবস্থা করা হবে। উভয় তীরে বিশাল বিশাল শিল্পায়ন তৈরি করা হবে। এতে যেমন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে তেমনি উত্তরাঞ্চল হয়ে উঠবে শিল্প ও অর্থনৈতিক নগরী। যার ফলে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটবে। বিভিন্ন সংবাদে জানা যাচ্ছে তিস্তা প্রকল্পটি যেন বাস্তাবায়ন না হয় এর জন্য ভারত সরকার চাপ দিচ্ছে। ভারতের দাবি, তাদের শিলিগুড়ি করিডোরের চিকেন নেকের এত কাছাকাছি তিস্তা প্রকল্পে যে হাজার চীনা নাগরিক থাকবে এতে ভারতের জন্য আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়বে।
অন্য দিকে মোদী সরকার বলে আসছে তারা যদি পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করতে পারে তাহলে তারা চুক্তিটি বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে আবার তৃণমূল সরকার গঠন করেছে। নদী বিশেষজ্ঞদের মতে ভারত সরকার যদি তিস্তা চুক্তিটি করেও তাতে বেশি কিছু লাভ হবে না কারণ তিস্তার পানি অনেক কমে গিয়েছে। তার চেয়ে বরং উত্তম হবে, চীন তিস্তা প্রকল্পটি গ্রহণ করা। সবার আগে আমাদের স্বার্থ। ভারত আমাদের ভালো বন্ধুর মানে এই নয়, তারা আমাদের সবকিছুতে দাদাগিরি করবে। কিছু লোক মনে করে যদি প্রকল্পটি হয়ে যায় তাহলে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাবে। সব আপত্তি সত্ত্বেও এই সরকার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে বদ্ধ পরিকর। বাংলাদেশ কারো কাছে অর্থনৈতিক, আত্ম-নিরাপত্তার জন্য নির্ভরশীল নয়। এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ আরো এগিয়ে যাবে, বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
নাহিদ বাবু : তরুণ লেখক ও কলামিস্ট।





Users Today : 0
Views Today :
Total views : 188344
