মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষ যেন সবসময়ই সুস্থ থাকে ঈশ^র সেটাই চান। সবকিছু মানুষের প্রয়োজন আছে কিন্তু তা কতটুকু, তার জ্ঞান ঈশ্বর মানুষকে দিয়েই দিয়েছেন। আমরা কীভাবে কতটুকু নিতে পারছি সেটাই হলো বড়ো কথা। হৃদরোগ এখন পৃথিবীর বৃহত্তর অংশের মানুষের বড়ো সমস্যা। আমাদের জীবনের জন্য হার্টের ভ‚মিকাই মূল তাই তো হার্টের বিষয়ে আমাদের অবশ্যই জানতে ও সচেতন হতে হবে। হার্টের আর একটা নাম হৃদ, তাই তো হার্টের রোগকেই হৃদরোগ বলে। ছোট্ট একটা জিনিস যা আমাদের হাত মুষ্টিবদ্ধ করলে যেটুকু হবে ততটুকুই মাংসপিণ্ড। আমাদের এই বিশালাকায় দেহকে বাঁচিয়ে রেখেছে আমাদের এই হার্ট। আমরা যখন মায়ের পেটে তখন থেকে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে এই ছোট্ট মাংসপিণ্ডটি যা খুবই সুরক্ষিত ভাবে ঈশ্বর রেখে দিয়েছেন। সেই যে শুরু আর মৃত্যু দিয়ে শেষ হবে তার কাজ। আমরা বলেও বন্ধ করতে পারি না তার কাজকে। কোনোই বিশ্রাম নেই, ঘুমায় না, ক্লান্ত হয় না, রাগ করে না, কোনো সময় বলে না যে এখন না আর একটু পরে করছি। আমাদের সমস্ত শরীরকে সব কিছু দিয়ে সচল রেখেছে এই মাংস যন্ত্রটি। অথচ দেখুন আমাদের মস্তিষ্ক নাকি মাত্র তিন সেকেন্ড যদি তার প্রয়োজনীয় খাদ্য না পায় তবে সে তার কাজটা বন্ধ করে দেয়, অথচ আমাদের হার্ট সেই ক্ষেত্রে অনেক আগেই আমাদের জানান দেয় যে, তোমরা আমার প্রতি অবিচার করছো। আমি ছোট বলে তোমরা আমার প্রতি অবহেলা করেই যাচ্ছো। এখন সাবধান হও। আমাকে সঠিকভাবে কাজ করতে দাও। আমরা আসলে হার্টের ভাষাটা বুঝতে চাই না অথবা বুঝেও না বোঝার ভান করে থেকে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনি। আর সেটাই হয় আমাদের জীবনের শেষ পরিণতি।
হার্ট বা হৃৎপিণ্ড হলো ছোট্ট একটা মাংস যার ওজন, বয়স, স্বাস্থ্য ও লিঙ্গ ভেদে হয়ত ২৫০ গ্রাম থেকে ৩৫০ গ্রাম হয়ে থাকে। এই সুরক্ষিত যন্ত্রটি যে মাংসপেশী দিয়ে তৈরি তার নাম ‘মায়োকার্ডিয়াম’। আবার এটার বাইরে একটা আবরণ আছে সেটার নাম ‘পেরিকাডিয়াম’। আমরা যদি এই হার্টকে কেটে দেখি তবে দেখব যে চারটি খোপ বা প্রকোষ্ঠ আছে যার ওপরের দুটোকে বলে অলিন্দ আর নীচের দুটোকে বলে নিলয়। আর এই খোপগুলোর মধ্যেই আছে আমাদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সকল কৌশল যা চারটি ভাল্ব যথা মাইট্রাল ভাল্ব, ট্রাইকাসপিড ভাল্ব, পালমোনারি ভাল্ব ও অ্যাওরটিক ভাল্ব। জন্মগতভাবে আমাদের ভাল্বের ত্রুটির কারণেও হৃদরোগ দেখা দিতে পারে। একটা সুস্থ হৃদয় ৭০/৭২ বার পাম্প করে শরীরের প্রয়োজনীয় সব কিছুই পৌঁছে দেয় একেবারে শেষপ্রান্ত পর্যন্ত। প্রতিদিন প্রায় ১০৩৬৮০ বার স্পন্দিত হয়ে কাজ করেই যাচ্ছে আমাদের এই হৃৎপিণ্ড। আর সারাদিনে যে এতটাই কাজ করছে সে কিসে সুস্থ থাকবে বা তার এই চলার পথে কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা, অথবা তার একটু বিশ্রাম দরকার কিনা কোনো সময় কি আমরা ভাবি? যে কিনা প্রতি মিনিটে প্রায় ৫ লিটার রক্ত রক্তনালীর মাধ্যমে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে পৌঁছে দিচ্ছে। কেননা আমাদের রক্তনালীগুলো যদি লম্বালম্বিভাবে রাখা যায় তবে তা হাজার হাজার কিলোমিটারই হবে, যেহেতু সেই লম্বা অংশ দিয়ে এই পৃথিবীকে প্রায় ৫/৭ বার পেঁচানো যাবে। আর এই প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্ত পর্যন্ত এই খাদ্য পৌঁছানোর কাজটি যিনি করেই চলেছেন, আমরা খেয়ে উঠেই তার কাজটা বেমালুম ভুলে যাই।
হার্ট যেমন আমাদের বাঁচিয়ে রাখে ঠিক তেমনই তাকে বেঁচে থাকতেও পরিমিত খাদ্য, অক্সিজেন ও পুষ্টির দরকার হয়। আমাদের শরীরে খাদ্যের কোনো ঘাটতির কারণে যেমন কোনো কোনো অংশের স্বাভাবিক কাজের ব্যাঘাত ঘটে তেমনই হার্টের ক্ষেত্রেও তাই হয়ে থাকে। আর তার নিজের খাদ্য সাপ্লাই দেওয়ার দায়িত্বটা যে নেয় তার নাম হলো করোনারী আর্টারি। মেইন দুটো করোনারি আর্টারি আছে যা রাইট করোনারি ও লেফট করোনারি আর্টারী নামে পরিচিত। এই করোনারী আর্টারির ব্যাস এতটাই সূক্ষè যে সর্বোচ্চ ৫ মিলি মিটার থেকে শুরু হয়ে সূক্ষè থেকে সূক্ষèতর হয়ে হার্টের বিভিন্ন দিক দিয়ে বেষ্টনি দিয়ে তার প্রয়োজনীয় সব কিছুই যোগান দিয়ে থাকে। যেমন ডান দিকে পিডিএ বা প্রক্সিমাল ডিস্টাল আর্টারি যা আবার ভাগ হয়ে প্রক্সিমাল থার্ড, মিডল থার্ড ও ডিস্টাল থার্ড নামে নামকরণ আছে। আবার যেটা বাম দিকে আছে বা বামের দিকে তার প্রয়োজনীয় সবকিছু সাপ্লাই দেয় তার নাম হলো লেফট মেইন। এটা আবার ভাগ হয়ে লেফট সাককমফ্লেক্স আর্টারি নামকরণ হয়েছে। আবার এই অংশে কিছু কিছু আর্টারির প্রান্তভাগ ভোঁতা থাকে যাকে বলে অবটিউস মার্জিনাল।
হৃদরোগ তখনই হয় যখন আমাদের হৃদয় তার প্রয়োজনীয় খাদ্য থেকে একটু একটু করে কম পাওয়া শুরু করে। আর তার প্রধান কারণ রক্ত নালীর ভেতরের জায়গা কমে যাওয়া। আর এগুলোর মূল কারণ হলো রক্তের ভেতরে জমা ভাসমান কোলেস্টেরল। এই কোলেস্টেরলের দানাগুলো যখন রক্তে ভাসতে ভাসতে কোনো নালীর গায়ে লেগে রক্ত চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে অথবা বন্ধ করে দেয় আর তখনই দেখা দেয় বিপত্তিটা যা আমাদের মৃত্যু পর্যন্ত উপহার দিতে পারে।
আমরা কি জানি যে, কী করলে আমাদের হৃদয় সুস্থ থাকবে। আর হৃদয় সুস্থ মানে তো আমি নিজেও সুস্থ। আর এই সুস্থ থাকতে যেটা প্রথম কাজ তাহলো, আমাদের উচ্চতা অনুসারে আমাদের ওজনের নিয়ন্ত্রণ। আর তা ঠিক রাখতেই আমাদের খেয়াল রাখতে হবে খাদ্যের দিকে। খাদ্য যেমন আমাদের জীবন বাঁচায় তেমনই খাদ্য আমাদের অপমৃত্যুর দিকেও নিয়ে যায়। তাই তো খাদ্যের আরেক নাম হলো খানা। খেতে যেমন বলেছেন তেমনই না খেতেও বলেছেন। আমাদেরকে যেসব খাদ্যের বিষয়ে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে তা হলো-তেল, ঘি, মাখন, দুধ বা দুধের তৈরি খাদ্য, মাছ, মাংস, ডিম, মিষ্টি জাতীয় খাদ্য। আসলে এই রোগটাকে লোভের পাপের ফসল বলা যেতে পারে। কেননা এই রোগে অকালে কত ভালো প্রাণ ঝরে যাচ্ছে।
মানসিক চাপ হৃদরোগের আরেকটা কারণ। আর মানসিক চাপ তৈরি হয় আমাদের ব্যক্তিগত চাহিদা ও সাফল্যের অতিরিক্ত চাহিদা থেকেই। আমাদের চাহিদা যদি পরিমিত হয় এবং অতিরিক্ত সাফল্যের আশায় আমরা যদি গা এলিয়ে না দেই, তবে এই মানসিক চাপ কম রাখা সম্ভব বলে আমার মনে হয়। আমরা মনে করি ধুমপান বা তামাক দ্রব্য বা যেকোন নেশা আমাকে মানসিক চাপ কমিয়ে দিতে পারে কিন্তু তা মোটেও ঠিক নয় বরং আমাকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাওয়াই তার কাজ। কেননা তামাকের নিকোটিন রক্ত নালীর মধ্যে আঠালো ভাব সৃষ্টি করে যাতে কিনা সেই কোলেস্টেরলের দানাগুলো খুব সহজেই রক্ত নালীর মধ্যে আটকাতে সাহায্য করে। তাই তো হৃদয়ের সুস্থতার জন্যে আমাকে অবশ্যই অনেক জিনিসের সাথে শত্রæ সুলভ আচরন করতেই হবে কেননা হৃদয় সুস্থ তো আমি সুস্থ।
আবার অনেক সময় আমরা হৃদয়ের ভাষা বুঝতে পারি না। সেটাকে অন্য কিছু ভেবে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিতে থাকি। এইটা আমাদের আরেকটা ভুল। আর এই ভাষা যদি বুঝতে না পারি তবে তো মৃত্যু আমাকে হাতছানি দেবেই। আমার মনে হয় সতর্কতার সাথে একটু ভাবলেই আমরা এটার বিষয়ে বেশ অনেকটাই সতর্ক হতেই পারবো। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে হাঁটতে হয় না এমন সংখ্যা হয়ত খুবই নগণ্য। আর সেটা বাড়িতে বা বাজারে বা ঘরের ছাদে। কোনো কোনো সময় হয়ত সিঁড়ি দিয়ে একটু উঠতেই হয়। কোন সময় কি ভেবেছেন বা কারো সাথে কোনো আলোচনা করেছেন যে এই দৈনন্দিন কাজের সময় আমার বুকে কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা বা মনে হচ্ছে কিনা যে আর পারছি না, একটু জিরিয়ে নিই। হয়ত-বা আর একটু কাজ করলেই আমার শ^াসকষ্ট শুরু হবে অথবা স্নœানের সময় যখন মাথায় জল ঢালছি তখন কেন যেন বুকের বাঁ দিকটাতে কেমন যেন চাপ ধরা ভাব লাগছে। এই মাত্র ভুরিভোজ খেয়ে একটু বিশ্রাম নিতে যাচ্ছি তখনই বুকের বাম দিকটা বিদ্যুচ্চমকানোর মতো চিড়িক মেরে উঠলো এবং এই চিড়িক মারা ভাবটা যেন ঘাড়ের দিকে বা হাতের দিকে ছড়িয়ে গিয়েই থেমে গেল। কিছুক্ষণ পরেই দিব্বি ভালো লাগছে। কিন্তু এই বিষয়টাই যে আপনাকে জানান দিচ্ছে যে হার্ট একটু সমস্যায় পড়েছে। তার সমাধান প্রয়োজন। আর এই প্রাথমিক যে অবস্থা তার নামই হলো এনজাইনা। হার্টের প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও নিউট্রিশানের ঘাটতি যা হার্টকে সুস্থ রাখতে পারে। আর এ থেকেই হতে পারে ইনর্ফাকশন যা পরবর্তীতে হার্ট অ্যাটাকের দিকে নিয়ে যায়। এই গুলো বুঝতে যেটা সবচেয়ে বেশি দরকার সেটা হলো, এই রোগ সম্মন্ধে সচেতনতা, রোগীর জ্ঞান ও তার দৈহিক কাজের ওপর। কেননা আমাদের সেই রক্তনালীর ৫০%-৬০% কাজ বন্ধ করলেও হয়ত আমরা তা বুঝতে নাও পারি কিন্তু যখন ৭০% বা তার বেশি কাজ বন্ধ হয় তখন এটা আর আমাদের অনুভবের বাইরে থাকে না। আর তখনই আমরা যাওয়ার চিন্তা করি কোনো হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের কাছে।
আজ সারা পৃথিবীতে অসুস্থতা ও মৃত্যুর প্রধান কারণই হলো এই হৃদরোগ। আমরা অনেক নামেই চিনে থাকি এই রোগগুলোকে। যেমন করোনারী হার্ট ডিজিজ, করোনারি আর্টরি ডিজিজ, এনজাইনা পেক্টোরিজ, মায়োকার্ডিয়াল ইনর্ফাকশন, হার্ট অ্যাটাক ছাড়াও আরো অনেক পরিচিত অপরিচিত নামে নামকরণ আছে এই রোগের। আর এই সবগুলোর একটাই মুখ্য কারণ আর তা হলো অবরোধ সৃষ্টি বা অক্সিজেন বা নিউট্রিশন চলাচলে বাধা। আর এই বাধার কাজটা যে শত্রু আমার হৃদয়ের রক্তনালী মধ্যে করেই যাচ্ছে তাকে আমরা জানি, চিনি, এবং সাদরে গ্রহণ করছি প্রতিদিনই আমাদের খাদ্যের মধ্যে। কোলেস্টেরল যা বেশিরভাগই পাই প্রাণীজ উৎস থেকে, আর তেল যার বেশিরভাগই আসে উদ্ভিদ থেকে। যেহেতু প্রাণী আর উদ্ভিদ নিয়েই আমাদের বেঁচে থাকতে হবে তাই তো হার্টকে সুস্থ রাখতেই শুধু হৃদরোগের ডাক্তার দিয়ে সম্ভব না। সেই সাথে বেশি দরকার খাদ্যাভাসের পরিবর্তনের। আর তার জন্যে দরকার একজন ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ। যা হৃদরোগ পরবর্তীতেও আমাদেরকে নতুনভাবে হৃদরোগ থেকে মুক্ত রাখতে পারে।
অলোক মজুমদার : চিকিৎসক ও লেখক।





Users Today : 8
Views Today : 10
Total views : 175514
