শিশুর কানফাটানো কান্নার শব্দই জানিয়ে দেয়, সে পৃথিবীর আলো দেখেছে। ভ‚মিষ্ঠ হয়েছে। এও বুঝিয়ে দেয়, শিশুটি জন্মেছে সুস্থ শরীরে। তার শরীরের ‘ঘড়ির কাঁটা’ ঠিকঠাকই চলছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় শিশুদের এই কান্নাকে বলা হয়, ‘বেবি ক্রাই’। অথচ, সেই কান্নায় শিশুর চোখ থেকে এক বিন্দু জলও গড়িয়ে পড়ে না। কেন?
আমরা কেন কাঁদি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কারণটা জানতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে আমরা কেন কাঁদি? কীভাবে আমাদের চোখের কোল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। গালে ও চিবুকে। সেই চোখের জল বা অশ্রুবিন্দু আমাদের চোখকে ভাল রাখে। ভিজিয়ে রাখে। সজীব রাখে।
তা শৈশবেই হোক বা পরিণত বয়সে, আমরা কেঁদে ফেলি মূলত চারটি কারণে। খুব দুঃখ পেলে। খুব রেগে গেলে। গভীর ভালোবাসায় হৃদয় টলমল করে উঠলে। আর গভীর আনন্দে। যার একটা আলাদা নামও রয়েছে। আনন্দাশ্রু!
শরীরের বাড়তি চাপ কমায় চোখের পানি
আমেরিকার স্যাক্রেমেন্টোতে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চিলড্রেন্স হসপিটালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ সেজ টিম্বারলিনের কথায়, ‘‘দুঃখে হোক বা রাগে অথবা অনুরাগে কিংবা আনন্দে, আমাদের মনের স্বাভাবিক অবস্থার ওপর একটা চাপ (স্ট্রেস) তৈরি হয়। কিন্তু প্রকৃতি ও পরিবেশ সব সময়েই থাকতে চায় স্বাভাবিকতায়। একটা স্থিতাবস্থায়। তাই সেই বাড়তি চাপটা কমিয়ে ফেলাটাই তখন মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে আমাদের শরীরের। চোখের পানির মাধ্যমে আমাদের শরীর সেই বাড়তি চাপটা কমিয়ে ফেলে আমাদের স্বাভাবিকতায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়।’’
চোখের পানি বের করে দেয় বাড়তি হরমোনও
চক্ষু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাঁদলেই আমরা কিছুটা স্বাভাবিকতায় ফিরে আসি। সেই স্বাভাবিকতা যে শুধুই আমাদের শরীর আর মনের, তা-ই নয়; ওই সময় স্বাভাবিকতায় ফিরে আসতে বেরিয়ে আসা চোখের জলই চোখকে সুস্থ ও সবল রাখতে সাহায্য করে। চোখকে ভিজিয়ে রেখে।
আমাদের শরীরের যেকোনো অনুভ‚তির পিছনেই রয়েছে বিভিন্ন ধরনের হরমোনের ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া। তাই বিভিন্ন ধরনের হরমোনের নিঃসরণের জন্যই আমরা দুঃখ পেলে কাঁদি, আবেগে কাঁদি আবার আনন্দেও কেঁদে ফেলি। দুঃখ, আবেগ বা আনন্দে আমাদের শরীর ও মনে যে বাড়তি চাপটা তৈরি হয়, তা হয় মূলত বিভিন্ন ধরনের হরমোনের নিঃসরণের দরুন।
বিশিষ্ট চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ জামিল হোসেনের কথায়, ‘‘চোখ থেকে পানি বেরিয়ে আসলে তার সঙ্গে সেই নিঃসৃত হরমোনও বেরিয়ে যায় আমাদের শরীর থেকে। ফলে, শরীর ও মনের বাড়তি চাপটা কমে যায়। তাই চোখে থেকে বেরিয়ে আসা জল যে শুধুই আমাদের চোখকে ভালো, সুস্থ, সতেজ রাখে, তা-ই নয়; শরীরে সৃষ্টি হওয়া হরমোনের বাড়তি নিঃসরণকে শরীর থেকে বের করে দিয়ে সেই নির্দিষ্ট হরমোনের মাত্রা শরীরে স্বাভাবিক রাখে।’’
সদ্যোজাতের কান্নায় কেন বের হয় না চোখের পানি?
জন্মের সময় থেকেই দিনে ঘণ্টায় ঘণ্টায় কাঁদে শিশু। অথচ, অন্তত সপ্তাহ তিন-চারেক সদ্যোজাতের চোখ দিয়ে পানি পড়ে না বিন্দুমাত্র। কেন?
জামিল হোসেন বলছেন, ‘‘সদ্যোজাতের চোখে অশ্রুনালী থাকে বটে; কিন্তু জন্মের পরপরই তা পুরোপুরি গড়ে ওঠে না। জন্মের পর শিশুর সেই অশ্রুনালীর পুরোপুরি গড়ে উঠতে সময় লাগে কম করে সপ্তাহ তিন-চারেক। অশ্রুনালীর গঠন সম্পূর্ণ হয় না বলেই দুঃখে, আবেগে, অস্বস্তিতে, আনন্দে শিশু কেঁদে উঠলেও তার চোখের কোল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে না তার গালে ও চিবুকে। শিশু তার মনের কথা বোঝাতেও কাঁদে। কিন্তু সেই সময় তার চোখের কোলেই জমা হয়ে থাকে অশ্রুবিন্দু । যা সদ্যোজাতের চোখকে ভিজিয়ে রাখতে সাহায্য করে। চোখকে রাখে সুস্থ ও সজীব।’’
হেলথ ডেস্ক / সাপ্তাহিক সময়ের বিবর্তন





Users Today : 17
Views Today : 27
Total views : 186559
