বেড়েই চলেছে নিত্য পণ্যের দাম। খাদ্য পণ্যের সাথে দফায় দফায় বেড়েই চলেছে প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় জিনিস, সাবান সামগ্রীর দাম যেমন—গায়ে মাখা সাবান, কাপড় কাচা সাবান, বাসন মাজা সাবান, চুল মাজা শ্যাম্পু, আর দাঁত মাজা টুথপেস্ট। চাল-আটা-তেল-ময়দা-চিনি-ডাল-গুঁড়ো দুধ তো আগেই বেড়েছে। যে সিংগারা বা পরোটা বা রুটি বা নিমকি আমরা ৫ টাকায় খেতাম, তা এখন খেতে হচ্ছে ১০ টাকায়। আগের চেয়ে দামের ফারাক দ্বিগুণ। নদীর মাছ তো এখন স্বপ্ন। ইলিশ আমাদের কাছে ইতিহাস। গরু বা খাশির মাংস যেকোনো ঈদ ছাড়া আর হয়ে উঠে না। কোনো সময় আত্মীয়-স্বজন বাড়িতে এলে, যদিও তাদের সম্মানের জন্য ব্যবস্থা করতে হয়, তাও আবার হাওলাত বা বাকি করে। আর সেটা শোধ দিতে কত দিন যে কষ্ট করতে হয়, তা যে করছে সেই সেটা টের পাচ্ছে। গরীবের আমিষ যে ডিম আর মুসুরের ডাল তাও আবার ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে।
আসলে আমরা যারা নিম্ন মধ্যবিত্ত তারা ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মতোই। অন্যের খাওয়া দেখেই নিজে মনের আনন্দে লাফাতে থাকি। উপায় তো নেই। কেননা ওরা খাচ্ছে আর খাবেই আর আমাদের তা দেখেই যেতে হবে কেননা আমাদের বিভিন্ন আইনে হাত ও মুখ বাধা রয়েছে। দেখলাম পত্রিকায় লক্ষ লক্ষ লিটার ভোজ্য তেল নাকি জব্দ হলো। অনেক প্রতিষ্ঠানেকে অনেক অনেক টাকা জরিমানা করা হলো। আরো হয়ত কোটি লিটার আত্মগোপনে আছে বা চলে গেছে। দেখলাম আর শুনলাম কিন্তু কিছুই বুঝতে পারলাম না যে। এই সব অভিযানে আমাদের মতো নিম্ন মধ্যবিত্তদের বা সাধারণ জনগণের কতটা জীবন ও মানের পরিবর্তন হয়েছে?
আসলে ব্যবস্থা খারাপ হলে যা হয় আমাদেরও ঠিক তাই হয়েছে। নইলে ঠিক কোন ব্যবস্থায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছে আমাদের দেশের প্রথম শ্রেণীর সেই ভদ্রলোক পি কে হালদার মানে প্রশান্ত কুমার হালদার। কোন ব্যবস্থায় প্রায় ৪০টি কাগুজে প্রতিষ্ঠান করেছিল সে। কোন ব্যবস্থায় আবার সেই সব কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে কোটি কোটি টাকা লোন তুলতেও পেরেছিল। কোন ব্যবস্থায় নামে বেনামে কয়েক হাজার শতাংশ জমি কিনতে পেরেছিল। কোন ব্যবস্থায় এই দেশেই বা বিদেশের মাটিতে অনেকগুলো বিলাস বহুল সব বাড়ি করতে পেরেছিল। যার মধ্যে খোদ ইন্ডিয়াতেই এখন পর্যন্ত প্রায় ১১ টি বাড়ির সন্ধান মিেেলছে। বিদেশের মাটিতে নামে বা বেনামে প্রতিষ্ঠান হয়ত আছে। আচ্ছা কোন ব্যবস্থায় পিকে তিন দেশের পাসপোর্ট করতে পেরেছিল। এবং এই টাকা পাচার করতে পেরেছিল। হয়ত দুবাই বা কানাডাতেও আরো অনেক কিছুর তথ্য পাওয়া যেতে পারে সেই হিসেব এখন কষছে আমাদের আইন। যদি পাওয়া যায়ই, তবে তাইবা কোন ব্যবস্থায় করেছিল এত গুণে গুণান্বিত পিকে।
আসলে শুধু পিকেই তো নয়, হয়ত এমন শত শত মুখোশ পরা পিকে আছে আমাদের দেশে। আজ হয়ত তারা ধরা ছোঁয়ার বাইরে। হয়ত তাদের মুখোশও একদিন উন্মচোন হবে। হয়ত এখন অনেক পিকের সহযোগীরা নিজেকে বাঁচানোর লড়াইয়ে ব্যস্ত রয়েছে। কিন্তু কি হবে এগুলো বলে বা লিখে। গতানুগতিক ধারায় তারা কোনো না কোনো দিক দিয়ে আইনের চোখে কালো কাপড় বেঁধে পার পেয়েই যাবে। আজ আমাদের মতো একজন কৃষক বা ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ী কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে লোনের জন্য গেলে বা সরকারি কোনো অফিসে কাজের জন্য গেলে বা সরকারি কোনো হাসপাতালে ভর্তির জন্য গেলে বা বাচ্চার স্কুলে ভর্তির জন্য জন্ম নিবন্ধনের জন্য ইউনিয়ন পরিষদে গেলে, তাদের জন্য আইনের প্রয়োগটা তার ওপরে পূর্ণাঙ্গই প্রয়োগ করা হয়। ভিসা বা পাসপোর্ট বা ইমিগ্রেশন জটিলতায় যেখানে আমাদেরকে আইনের পূর্ণতা মেনেই সমাধান করতে হয়। আর সেখানে সেখানে পিকে বা পিকের মতো মানুষগুলো কোন ব্যবস্থায় এত সহজেই সেগুলো পেয়ে, সেটা আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে।
আসলেই আমাদের মতো মধ্যবিত্তরা তো ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চাই। আর তাই তো লাফিয়েই মজা পাই। এক নম্বর বাচ্চা তারা যারা সুবিধা দিচ্ছে। দুই নম্বর বাচ্চা তারা যারা সুবিধা নিচ্ছে, আর তিন নম্বর বাচ্চা আমরা শুধু নেচেই আনন্দ পাচ্ছি।
আসলে এই রাষ্ট্রের সকল ব্যবস্থার মধ্যে নির্বাচন ব্যবস্থা, রাষ্ট্রের সম্পদ লুটের ব্যবস্থা, বিভিন্ন খাতের দুর্নীতির ব্যবস্থা গুম খুন বা ক্রস ফায়ারের ব্যবস্থা, কৌশলে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের ব্যবস্থা, এগুলো আমাদের রাষ্ট্রের জন্য কোনই সমস্যা নেই কিন্তু মূল সমস্য হলো এই সব কথা বলে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করা যাবে না। এই সব কথা বলে কথিত উন্নয়য়েন গতিপথ রুদ্ধ করা যাবে না। এইগুলো দেখিয়ে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে হেয় প্রতিপন্ন করা যাবে না। হে ঈশ্বর তুমি সবার বোধ জাগ্রত করে দাও।
অলোক মজুমদার : চিকিৎসক ও লেখক;
বিশেষ প্রতিনিধি সাপ্তাহিক সময়ের বিবর্তন।





Users Today : 17
Views Today : 18
Total views : 184430
