নীরা ছেলেবেলা থেকেই খুব আত্মপ্রত্যয়ী। মেয়ে হয়েও জীবনের কোনো পর্যায়ে সে ভেঙে পড়েনি। পারিবারিক টানাপোড়েন, আর্থিক কষ্ট সবকিছুর পরেও সে টিকে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগদান করেছে। ক্যাডার সার্ভিসে তার চাকরির চার বছর ৬ মাস অতিবাহিত হয়ে গেছে। ব্যক্তিগত জীবনে সে এখনো একাকী রয়ে গেছে। নীরার জীবনে অনেকবার অনেকেই আসার চেষ্টা করেছে কিন্তু নীরার বাইরের একটা শক্ত খোলস কাউকেই তার কাছে আসতে দেয়নি। সে সবসময় এটা মনে করত, যে ছেলে তার জীবনে থাকবে তার বাইরেও ঠিক তেমনি একটা শক্ত আবরণ থাকবে। যে খোলসটাকে নীরা তার ভালোবাসার স্পর্শে ভেঙে দিবে।
হঠাৎই একদিন ফেইসবুকে নীলেন্দুর সাথে পরিচয়। নীলেন্দুও ক্যাডার সার্ভিসে আছে। নীরারই ব্যাচমেট নীলেন্দু। সামনেই দুজনের সিনিয়র স্কেল পরীক্ষা। দুইজনের কথা হতো পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে। দুজন মিলে পরীক্ষা পাসের জন্য পড়াশুনা বেশ জমে উঠেছিল। কয়েকমাসের মধ্যেই পরীক্ষা। যদিও নীলেন্দু নিজের সম্পর্কে কিছুই বলেনি, আর তার ফেইসবুক প্রোফাইলেও কোনো তথ্য ছিল না। তবুও নীরার কেন জানি মনে হতো, নীলেন্দু হয়তো বিবাহিত। একারণে নীলেন্দুকে নিয়ে নীরা কোনো স্বপ্ন দেখেনি। কিছুদিন পরেই সিনিয়র স্কেল পরীক্ষা চলে এল। নীরা ভাবল যেহেতু একই পরীক্ষাকেন্দ্র সেহেতু এখানে হয়ত দুজনের ঠিক দেখা হবে। কিন্তু নীলেন্দুর মোবাইল নম্বর তখনও নীরার কাছে ছিল না। ম্যাসেঞ্জারে কথা হতো দুজনের। নীরার মনে মনে সন্দেহ হয়েছে, ছেলেটা ফেইকও তো হতে পারে? কারণ নীলেন্দুর নীরার সাথে দেখা করার বা ভিডিও কলে কথা বলার কোনো ইচ্ছেই ছিল না। নীরা তখন নিশ্চিত হয়ে গেল, নীলেন্দু বিবাহিত আর একারণেই নীরার বিষয়ে তার কোনো আগ্রহ নেই। আর এজন্যই পরীক্ষার মধ্যে তার সাথে দেখা করতে চাইল না। পরেরদিন পরীক্ষা শেষে ঢাকা থেকে ফেরার সময় নীরা নীলেন্দুকে ম্যাসেঞ্জারে জিজ্ঞেস করলো, তার স্ত্রী সম্পর্কে। নীলেন্দু জানালো তার স্ত্রী চাকরি করে। এজন্যই তারা ভিন্ন জায়গায় থাকে। তারপর কিছুদিন কেটে গেল। তেমনভাবে আর দুজনের যোগাযোগ ছিল না। কয়েকমাস বাদে সিনিয়র স্কেল পরীক্ষার রেজাল্ট বের হলো । দুইজনেই পরীক্ষায় পাস করেছে। তারপর থেকেই হঠাৎ সম্পর্কের সমীকরণগুলো পাল্টাতে শুরু হলো। একদিন নীলেন্দুর কাছ থেকে নীরা জানতে পারল, সে নাকি অবিবাহিত। তার জীবনেও কেউ আসেনি। এমনকি বিয়ে করার কোনো ইচ্ছেই তার নেই। নীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এরকম অনেক ফ্রেন্ডের কথা শুনেছে যে, ছেলেরা প্রেমের শুরুতে এরকম অনেক কথাই বলে। পরে বিয়ের সময় ঠিক পারিবারিক পছন্দেই সেটা করে, কারণ এ ব্যাপারে তারা একরকম মেরুদণ্ডহীন। তবুও নীলেন্দুর কথায় সে বিশ্বাস করেছিল, হয়ত তাদের ক্ষেত্রে এরকম হবে না। নীরার সুপ্ত স্বপ্ন হঠাৎ করেই ডানা মেলা শুরু করে দিল। নীরা ভেবেছিল তার ভালোবাসা দিয়েই সে নীলেন্দুর বাইরের খোলসটাকে ভেঙে দিতে পারবে। এরপর তাদের ফোনে কথা বলা শুরু হলো। নীরা এর আগে কোনোদিন কোনো ছেলের সাথে এতো দীর্ঘসময় কথা বলেনি। তার ধারণা ছিল, ছেলেদের সাথে এতো কী কথা থাকতে পারে? তাই এই প্রেমের ফাঁদে তার জড়ানোর কোনো মনোভাবই ছিল না। কিন্তু নীলেন্দুকে জানার আগ্রহ তাকে আস্তে আস্তে কখন তার মনের কাছে নিয়ে গেছে নীরা তা বুঝতেও পারেনি। নীরার তখন দিন কাটে শুধুই নীলেন্দুর চিন্তা করে। একটিবার তার সাথে কথা বলার জন্য সে অধীর আগ্রহে বসে থাকে। যেন সমস্ত পৃথিবীতে কোনো মানুষ নেই, শুধু নীরা আর নীলেন্দু। নীলেন্দুর ক্ষেত্রে অবশ্য এরকম হয়নি। তার মনের কথা বুঝা মুশকিল। সে নীরাকে পাত্তা দিত না। নীরার অনুভুতির তেমন কোনো দাম তার কাছে ছিল না। তার মধ্যে নিজেকে নিয়ে একটা অহমিকা কাজ করতো। সে ভাবত নীরাকে কেন সে নিজের মতো করে ভালোবাসবে? তাই নীরার খোঁজ সে নিতো না। নীলেন্দু যেমন যেমন পছন্দ করে নীরা সেভাবেই নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টা করে। নীরা ভেবেছিল ভালোবেসে সে নীলেন্দুর সবকিছুকেই ভালোবাসবে। এভাবেই নীরা একটা ছোট সংসারের স্বপ্ন দেখে। ভেবেছিল বিয়ে করে নীলেন্দু তাকে যেভাবে রাখবে সে শুধু সেভাবেই থাকবে। নিজেকে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করবে নীলেন্দুর কাছে। সে ঠিক করে নীলেন্দুকে তার মনের সব কথা খুলে বলবে। হঠাৎ ই সেদিন নীলেন্দুর ফোন আসে। প্রতিদিনের মতোই কথা চলতে থাকে। নীলেন্দু বলে সে তার বাড়ির পছন্দেই বিয়ে করতে যাচ্ছে, সামনেই তার বিয়ে। নীরার মনের কথাগুলো অব্যক্ত থেকে যায়। আর বলা হয়নি নীলেন্দুকে। তার প্রেম চিরকালের জন্য অজানায় হারিয়ে যায়।
নীরার একটা পিএইচডি স্কলারশিপ হয়েছে। আজ চার বছর হলো সে অস্ট্রেলিয়াতে আছে। দেশে হয়ত আর তার ফিরে আসা হবে না। সেদিন হঠাৎ করে নীলেন্দুর ফেইসবুক প্রোফাইলটা চেক করতে গিয়ে দেখে নীলেন্দুর কোলে একটা ফুটফুটে শিশু। নীরার চোখ দিয়ে এক ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। এটা আনন্দের অশ্রু কিনা তা একমাত্র বিধাতাই জানেন!





Users Today : 141
Views Today : 181
Total views : 182029
