করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) বাংলাদেশের প্রথম আঘাত হেনেছে মার্চ ৮, ২০২০ এবং প্রথম করোনা রোগী মৃত্যুবরণ করেন ১৮ মার্চ। ২৪ মে, ২০২০ তারিখ পর্যন্ত ৩৩,৬১০ জন সনাক্ত, ৬৯০১ জন করোনাকে জয় করেছে এবং হারিয়েছি ৪৮০ জনকে। মরণব্যাধি করোনার যুদ্ধে বিধ্বস্ত মুসলিম সমাজ প্রথম ঈদুল ফিতর উদ্যাপন করতে চলেছেন। ইতিপূর্বে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরাও ৪০ দিনকাল উপবাস এবং গুড ফ্রাইডে, ইস্টার সানডে লকডাউনের মধ্যেই পালন করেছে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বৌদ্ধ পূর্ণিমা নীরবেই পার করেছেন। বাঙালির জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষও করোনার করাল গ্রাসে স্তব্ধ হয়ে গেছে। প্রতিটি ধর্মের ধর্ম বিশ্বাসীরা আকুলভাবে স্রষ্টার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা উৎসর্গ করছে, কিন্তু স্রষ্টা হয়তো তাঁর মুখ লুকিয়েছেন তাঁর সৃষ্টি মানুষের দিক থেকে। হয়ত সৃষ্টির সেরা মানুষেরা স্রষ্টার সীমাকে লঙ্ঘন করেছে, হয়ত স্রষ্টা মানুষের অনুশোচিত হৃদয়, তওবা করার প্রতিশ্রুতি অপেক্ষা করছেন!
ঈদুল ফিতর (আরবি: عيد الفطر অর্থাৎ রোযা ভাঙার দিবস)। ধর্মীয় পরিভাষায় একে ইয়াউমুল জাএজ (অর্থ: পুরষ্কারের দিবস) হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে। দীর্ঘ এক মাস রোযা রাখা বা সিয়াম সাধনার পর মুসলমানেরা এই দিনটি ধর্মীয় কর্তব্য পালনসহ খুব আনন্দের সাথে পালন করে থাকে। রোযাকালীন সময়ে হৃদয়ের শুদ্ধিতার বিষয়টি জড়িত; ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন এবং ধর্মীয় অনুশাসনকে মেনে চলার যে প্রক্রিয়া সেটিকে আস্তস্থ করে জীবনভর মেনে চলা যায়, জীবনকে আনন্দমুখর রাখা যায়। ধর্মীয় বিধিবিধানের মধ্যেই রয়েছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষের বিষয়েও একটি সুন্দর গাইডলাইন।
১. সূরা আনআম: ১০৮-এ বলা হয়েছে, ‘তারা অন্য ধর্মাবলম্বীরা আল্লাহ ছাড়া যাদের উপাসনা করে সেসব দেব-দেবীকে তোমরা গালি দিও না। তাহলে তারা সীমা লঙ্ঘন করে অজ্ঞাতবশত আল্লাহকে গালি দেবে।’
২. মদীনা সনদের ৩. ‘মুসলিম, খ্রিষ্টান, ইহুদী, পৌত্তলিক ও অন্যান্য সম্প্রদায় ধর্মীয় ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবে, কেউ কারো ধর্মীয় কাজে কোনো রকম হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।’ ৬.-এ বলা হয়েছে, ‘অমুসলিমগণ মুসলিমদের ধর্মীয় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে না।’ ১১.-এ বলা হয়েছে, ‘মুসলমান, ইহুদী ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকেরা পরস্পর বন্ধুসুলভ আচরণ করবে।’
৩. অমুসলিমদের মসজিদে বসারও অনুমতি আছে। হজরত হাসান বলেন, যখন সাকিফ গোত্রের প্রতিনিধি রাসুল (সা.)-এর দরবারে হাজির, তখন তারা মসজিদের শেষে গম্বুজের কাছে অবস্থান করে। যখন নামাজের সময় হলো, দলের একজন লোক বলল, হে আল্লাহ রাসুল! নামাজের সময় হয়েছে। এরা একদল অমুসলিম, তারা মসজিদে আছে। তখন রাসুল (সা.) বললেন, অমুসলিমদের কারণে জমিন নাপাক হয় না (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়ব, হাদিস: ৮৫৭৬)।
ঈদ আরবি শব্দ। যার অর্থ ফিরে আসা। এমন দিনকে ঈদ বলা হয়, যেদিন মানুষ একত্র হয় ও দিনটি বারবার ফিরে আসে। এ শব্দ দ্বারা এ দিবসের নাম রাখার তাৎপর্য হলো আল্লাহতায়ালা এ দিবসে তার বান্দাদেরকে নিয়ামত ও অনুগ্রহ দ্বারা বারবার ধন্য করেন ও বারবার তার ইহসানের দৃষ্টি দান করেন। আল্লাহতায়ালা মুসলিম উম্মাহর প্রতি নিয়ামত হিসেবে ঈদ দান করেছেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছ, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনাতে আগমন করলেন, তখন মদিনাবাসীদের দুটো দিবস ছিল, যে দিবসে তারা খেলাধুলা করত। হজরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, এ দুদিনের কী তাৎপর্য আছে? মদিনাবাসীরা উত্তর দিলেন, আমরা জাহেলি যুগে এ দুদিনে খেলাধুলা করতাম। তখন তিনি বললেন, আল্লাহতায়ালা এ দু’দিনের পরিবর্তে তোমাদের এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ দুটো দিন দিয়েছেন। তা হলো ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর (আবু দাউদ: ১১৩৪)। শুধু খেলাধুলা, আমোদ-ফূর্তির জন্য যে দুটো দিন ছিল আল্লাহতায়ালা তা পরিবর্তন করে এমন দুটো দিনে আল্লাহর শোকরিয়া, তার জিকির, তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনার সঙ্গে সঙ্গে শালীন আমোদ-ফূর্তি, সাজ-সজ্জা, খাওয়া-দাওয়া করা হবে। বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ গ্রন্থে ইবনে জারীর (রা.) এর বর্ণনা মতে, দ্বিতীয় হিজরিতে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রথম ঈদ পালন করেছেন।
একজন সত্যিকার ধর্ম বিশ্বাসী হিসেবে আমি যদি নিজ ধর্মকে অন্তর থেকে গ্রহণ করতে পারি, সত্যকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হই; তাহলে আমাদের হৃদয়ে কোনো হিংসা, দ্বেষ, ঈর্ষা, লোভ-লালসা ও অন্যায় পথের দিকে পা বাড়াতে পারি না। প্রত্যেকটি ধর্মের মধ্যেই মহত্বতা রয়েছে, সেটিকে আবিষ্কার করা, চর্চা করা এবং লালন-পালন ও সংরক্ষণ করলে ধর্মের দিকে আকৃষ্ট হতে হবে মানব সমাজকে। ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার হৃদয়ের অন্ধকারকে আলোকিত করতে পারে না, প্রয়োজন ধর্মশাস্ত্রের সংস্পর্শ। নিজের চোখে অবলোকন করা, হৃদয়ে উপলব্ধি করা এবং স্রষ্টার অপার ভালোবাসায় মর্মার্থ খোঁজার অনুসন্ধিৎসু মন থাকতে হবে। স্রষ্টা তো নিজ থেকেই নিজেকে ধরা দেন না; অনেক সাধনা করে, চোখের জলের প্রার্থনায় আমাদেরকে প্রস্তুত হতে হয়; তারপরেও তাঁর দেখা মিলতে পারে, আবার নাও পারে। সিয়াম সাধনা মাসের শেষে কতকগুলো দায়িত্ব পালন করতে হয়, যেমন—যাকাত ইত্যাদি। সত্যিই একটি অপূর্ব সুযোগ এই রমজান মাস, স্রষ্টাকে কাছে পাওয়ার জন্য নিজেদেরকে গড়ে তোলার জন্যে।
আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম সেই অবিস্মরণীয় কথা, সুর ও গান—‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। সবার জীবনের নেমে আসুক অনাবিল আনন্দ, শান্তি, সত্য ও ন্যায্যতা।
● মিথুশিলাক মুরমু : গবেষক ও লেখক।





Users Today : 54
Views Today : 58
Total views : 182207
