একটা মহান সত্য ঐতিহাসিক ঘটনা হলো ইস্টার সানডে। নিজেকে ঈশ্বরের সন্তান বলায় রোমান শাসকগণ মৃত্যুদন্ডেত দন্ডিত করেছিল প্রভু যীশুকে। যিনি নিজেকে খ্রীষ্ট বা মুক্তিদাতা হিসেবে পিতার কাছ থেকে এসেছিলেন বলে দাবি করেছিলেন। পবিত্র বাইবেলের পুরাতন নিয়মে আমরা দেখতে পাই, সেখানে প্রভু যীশুর কথা বিভিন্নভাবেই বলা আছে। তিনি কীভাবে আসবেন, কখন আসবেন, কী করবেন, কীভাবে মৃত্যুবরণ ম করবেন, কীভাবে কবর থেকে উঠবেন, কীভাবে স্বর্গে চলে যাবেন ও কোথায় থাকবেন। জাগতিকতার চোখে আমরা অনেক কিছুই দেখতে পারি না। বিবেকের ওপরে অদৃশ্য আবরণ আমাদের অন্তরের দৃষ্টিসীমার দূরত্ব কমিয়ে দেয়। সেই সময় জাগতিক অমানবিকতায় পিলাতের সামনে প্রভু যীশু। তার সৈন্যদের কতই না উপহাস। মুখে থুতু দেওয়া। মেরে রক্তাক্ত করা। পানির বদলে মুখে সিরকা দেওয়া। মাথায় কাঁটার মুকুট দেওয়া। শেষ পর্যন্ত নিজের ক্রুশ নিজে বহন করা। দুইজন দস্যুর পাশে তাঁকে ক্রুশে দেওয়া। তার মৃত্যু হলে তার সমাধি দেওয়া। মৃত্যু থেকে জীবিত হয়ে অনেক মানুষের সাথে দেখা করা। স্বর্গে উঠে যাওয়া। কতই না ভাবনার জিনিস এইগুলো। কিন্তু আজও আমরা গভীর ঘুমে অচেতন। পুনরুত্থানের পরাক্রম কোথায় আমাদের ব্যক্তি জীবনে বা পারিবারিক জীবনে বা আত্মিক জীবনে। সময়মতো চার্চে যাই কিন্তু কেন যাচ্ছি তা কতজন জানি?
কবরে দেখা করতে গিয়েছিলেন মºলীনি মরিয়ম। দেখলেন কবরের মুখের পাথর সরানো। স্বর্গদূত এসে প্রথম পুনরুত্থানের কথাটা মরিয়মকেই বলেছিলেন। যীশু উঠেছেন তিনি মৃত্যু থেকে জীবিত হয়েছেন। তোমরা তাকে মৃত মানুষের মধ্যে কেন খুঁজছো। আর মরিয়ম দৌড়ে শিমন পিতরকে ও তার শিষ্যদের এই খবরটা দিলেন। কেউই প্রথমে তা বিশ্বাস করেনি। সবাই মিলে কবরের কাছে ছুটে আসলেন আর তার কথার প্রমাণ করলেন। মরিয়ম যীশুর কবরের কাছে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন। যীশু মরিয়মকে পেছন থেকে ডেকেছিলেন । তিনি ফিরে তাকালেন কিন্তু চিনতে পারলেন না। যীশু তাকে বললেন, যাও , যাও, আমার পুনরুত্থানের কথা আমার ভাতৃগণের কাছে বলো । এই কথা কি শুধু মরিয়মের জন্য, নাকি আমার জন্যও সেটা ভাবতে হবে।
যীশু খ্রীষ্টের জীবন শিক্ষা মৃত্যু ও পুনরুত্থানের উপরই খ্রীষ্ট ধর্ম প্রতিষ্ঠিত। খ্রীষ্টের অনুসারী তাই তো আমরা খ্রীষ্টান। ইস্টার সানডে হলো খ্রীষ্ট জীবনের একটা অংশ। শুক্রবার তাঁকে ক্রুশে দেওয়া হয়েছিল। রবিবারে তিনি কবর থেকে জীবিত হয়ে বের হয়েছিলেন। আমরা অনেকে ৪০ দিন উপবাশ শেষ করে শেষের দিনটিই পালন করি এই অলৌকিক ঘটনাটি স্মরণ রাখার জন্যে।
পুনরুত্থানের অনেক আক্ষরিক অর্থ আছে যেমনÑপুনঃ উত্থিত হওয়া, জেগে উঠা, পুনরায় জীবন লাভ করা, পুনরায় আরম্ভম্ভ করা, সতেজ হওয়া, সজাগ হওয়া, পূর্বের অবস্থা থেকে নতুন অবস্থায় ফিরে যাওয়া, নতুনীকৃত হওয়া, নতুন প্রত্যাশায় পথ চলা। এই পুনরুত্থান মানব জীবনের বিভেদ-বিচ্ছেদ দূর করে সত্য ও ন্যায়ের জীবন দ্বারা, ভালোবাসা ও ক্ষমার মহিমা ধারণের শক্তি ফিরে পাওয়ার জীবনে নিয়ে যায়। মার্কের সুসমাচার অনুযায়ী সকাল ৯টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত তাঁর জীবনের সবচেয়ে কষ্টকর মুহূর্ত । গ্রেফতার পরবর্তী নির্যাতন অত্যাচার যা শেষ পর্যন্ত ক্রুশ ও মৃত্যু নিয়ে এসেছিল। তার ক্রুশের মাথায় লেখা ছিল নাসরীয় যীশু। ইনি ইহুদীদের রাজা। তিনি সত্যিই রাজা। তাই তো মৃত্যুর সময় তিনি বললেন, পিতঃ – আমার আত্মা তোমার হাতে সমর্পণ করলাম। এই মহান মৃত্যু একমাত্র বিশ্বাসীদের মুক্তি আনে। ঘৃণীত ক্রুশ আমাদের জীবনে ক্ষমা, ভালোবাসা, শান্তি ও মুক্তি এনে দিয়েছে। তাই তো তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী। আর তার পরেই তিনি বললেন, সমাপ্ত হলো। যার কাছ থেকে পাওয়া জিনিস, সেই পবিত্র আত্মা, তার কাছেই ফেরত দিয়ে নিজের কাজকে সমাপ্ত ঘোণনা ইতিহাসের জীবনে কোনো ছোটো বিষয় নয়। জানি না কতজন নিজের মৃত্যুর সময় এই কথা বলেছেন।
ক্রুশে মৃত্যু নিয়ে আনেকের অনেক মন্তব্য দেখা যায়। যদিও এটা একটা ঐতিহাসিক দলিল ভিত্তিক প্রমাণিত কিন্তু ১৯৬৮ সালে জেরুজালেমের উত্তর পূর্বাঞ্চলে, প্রথম শতাব্দীর ক্রুশবিদ্ধ হওয়া এক ব্যক্তির দেহের পুরাতাত্বিক আবিষ্কার ও সংরক্ষণ পরিষ্কার প্রমাণ করতে পেরেছে যে, ক্রুশবিদ্ধে মৃত্যুর ঘটনা সত্য।
আজ আমি নতুন জীবনে সমস্ত দুঃখ, কষ্ট, লোভ, কামনা, বাসনা, হিংসা, ঘৃণা, অহংকার সব কিছুই ঐ ক্রুশের তলায় সমাধি দিয়ে তবেই নতুন হয়েছি। তাই তো এই পুনরুত্থান আমার কাছে আজ উৎসবের উৎসব, পর্বের পর্ব , মহোৎসবের মহোৎসব। এই কাজ সাধন করে প্রভু যীশু খ্রীষ্টই যন্ত্রণা ভোগ, মৃত্যু ও পুনরুত্থানের নিগূঢ় রহস্য আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। এটার মাধ্যমে তিনি তাঁর মৃত্যু দিয়ে, বিশ্বাসীদের মৃত্যু নাশ করেছেন। নতুন জীবনের সন্ধান দিয়েছেন। অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখিয়েছেন। প্রেম ও মুক্তির দ্বার খুলে দিয়ে, নিশ্চিত স্বর্গের নিশ্চয়তা বিধান করেছেন। তাই আমাদের উচিত নির্ভয়ে তার পুনরুত্থান প্রচার করা।
অলোক মজুমদার : চিকিৎসক ও লেখক; বিশেষ প্রতিনিধি সাপ্তাহিক সময়ের বিবর্তন।





Users Today : 57
Views Today : 60
Total views : 177702
