১
ঢাকা আর্চডায়োসিসের নব মনোনীত আর্চবিশপের নাম মহামান্য পোপ ফ্রান্সিস মহোদয় ঘোষণা করেছেন। নব মনোনীত আর্চবিশপ হলেন বিজয় নিসফরাস ডি’ ক্রুজ, তিনি সদ্য অব্যাহতি কার্ডিনাল প্যাট্রিক ডি. রোজারিও’র স্থলে স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। অতি সম্প্রতি তাঁর সাথে মৌলভীবাজারের ‘ব্রাহ্মণবাজার খ্রিষ্টিয়ান হাসপাতাল প্রজেক্ট’ (বিসিএইচপি) তে পর পর দুই দিন সান্নিধ্যে থাকার সুযোগ পেয়েছিলাম। বৃহত্তর সিলেটাঞ্চলে প্রচাররত ‘সিলেট প্রেসবিটারিয়ান সিনড’ নামের চার্চের সমৃদ্ধিকরণ ও গেঁথে তোলাতে নিরলসভাবে সময় ব্যয় করেছেন। একজন ক্যাথলিক বিশপ প্রটেস্ট্যান্টদের আত্মিকভাবে এবং জাগতিকভাবে সহযোগিতার মনোভাব নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনা, পরামর্শ এবং খ্রিষ্ট বিশ্বাসীদের সহযোগিতার মনোভাব আমাদেরকে উজ্জীবীত করেছে। একজন খ্রিষ্টানুসারী হিসেবে তার আচার-আচরণ, নম্র্রতা, স্বভাবসুলভ হাস্যোজ্জ্বল চেহারা যে কাউকেই আকৃষ্ট করে। ইউনাইটেড ফোরাম অব চার্চেস-বাংলাদেশ (ইউএফসিবি) সভাগুলোতে তাঁর সাথে মতবিনিময়ের সুযোগ হলেও এবারই অধিক সময়ব্যাপী কাটানোর অপূর্ব সুযোগ মিলেছিল। ঢাকা আর্চডায়োসিসের আর্চ বিশপ হিসেবে দায়িত্ব পালনের গুরুদায়িত্ব একজন নিষ্ঠাবান খ্রিষ্টানুসারীর কাছে অর্পিত হয়েছে। জেনেছি, তার পরিব্যাপ্তি আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ও শান্তি আনয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। সিলেট ডায়োসিসের বিশপ থেকে ঢাকা আর্চডায়োসিসের আর্চবিশপ হিসেবে উন্নীততে আপনাকে অভিনন্দন জানাই।
২
দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে চোখে পড়েছে ‘সিলেট ক্যাথলিক বিশপ কার্যালয় জায়গা দখল ঠেকাতে পাহারায় পুলিশ, দুজন গ্রেপ্তার’ (প্রথম আলো ২৪.৯.২০২০)। আমরা জেনেছি, একদল উগ্রবাদী ও ধর্মান্ধশ্রেণী দেশের খ্রিষ্ট বিশ্বাসীদের মিশন ও মিশনের কার্যালয় এলাকাগুলোতে অবস্থান নিয়েছে। তারা কৌশলে খ্রিষ্টানুসারীদের বিশ্বস্ততা অর্জন করে, বিভ্রান্ত ছড়াতেও কালক্ষেপণ করে না; কখনো কখনো ধর্মীয় লেবাস পরিহিত হতেও পিছপা হন না অর্থাৎ খ্রিষ্টিয়ান ধর্ম গ্রহণ করে থাকে। দু-একজন বিশ্লেষণ করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন, প্রায় প্রতিটি প্রটেস্ট্যান্ট চার্চগুলোর মিশন প্রতিষ্ঠানে আভ্যন্তরীণ ও বিবাদমান গ্রুপ তৈরি হয়েছে। এই বিবাদমান দলগুলো নিজেদের স্বার্থ চেষ্টাকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে; এতে করে মিশন প্রতিষ্ঠানের, খ্রিষ্ট বিশ্বাসীদের আত্মিকতা কিংবা আধ্যাত্মিকতা নিম্নগামিতা কোনোটিকেই গুরুত্বারোপ করেন না। ধর্মান্ধশ্রেণীরা প্রয়োজনে নতুনত্ব খুঁজে নেবে কিন্তু সমঝোতা বা সম্প্রীতিমূলক সহবস্থান করতে দ্বিমত পোষণ করেন। বিষয়টি সহজভাবে গ্রহণ করার কোনো কারণ নেই, এখনই সতর্কবস্থান ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হলে আমাদের ভবিষ্যৎগুলো আরো অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে বলে সতর্ক করেছে। এরা সহজ-সরল কিন্তু স্বার্থপর, বিশ্বস্ততা অর্জনে সিদ্ধহস্ত তবে নিজেদের স্থান করে নিতে যেকোনো কৌশল অবলম্বন করতে প্রস্তুত। খ্রিষ্টের আদর্শ ধারণ না করলেও খ্রিষ্টের কথাগুলো সর্বদাই আওড়ায়।
আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি, সিলেট ক্যাথলিক ডায়োসিসের প্রধান কার্যালয় অর্থাৎ বিশপ ভবন ও কার্যালয়ের ২ একর ৪৫ শতক জমি দখলের ব্যর্থ পাঁয়তারা চলেছে। জমিটি ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে সমস্ত ধরনের যাচাই-বাছাই করার পরই নিষ্কণ্টক জমি হিসেবেই ক্রয় করা হয়। বিপত্তি হলো ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে, একদল ধর্মান্ধশ্রেণী মালিকানা দাবি করে আদালতের শরণাপন্ন হন। চার বছর পর মালিক দাবি করে কথিত মামলাটিও ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে খারিজ করে দেয় মাননীয় আদালত। জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবর্ষ উপলক্ষে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিগত ১৭ মার্চ থেকে মিশন ক্যাম্পাসে বৃক্ষ রোপণ কার্যক্রম শুরু হয়। অতঃপর বৈশ্বিক মহামারীতে সবকিছু স্থবির হয়ে পড়ে। ২১ সেপ্টেম্বর এবার মিশনের কার্যক্রম সচল হলে এবং নিজস্ব জায়গায় নির্মাণ কাজ আরম্ভ করলে চিহ্নিত ধর্মান্ধব্যক্তিরা নিজেদের একটি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে বেদখল করার চেষ্টা করে। তারা পেশী শক্তি ব্যবহার করতে উদ্যত হলেন। লোকজন নিয়ে দখলের নাটক করেছেন, এ যেন তাদেরই পৈত্রিক সম্পত্তি অন্যজন হস্তান্তর করেছিলেন। পুরো এলাকায় ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরির মাধ্যমে ঘোলাজলে মাছ শিকারের ব্যর্থ প্রচেষ্টা হয়েছে। জায়গার মালিক দাবিদার ইসরাক আলীসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করলে গ্রেপ্তারে চুপসে গেছেন দাবিদারগণ। এই ধর্মান্ধগোষ্ঠীরা অস্থিরতা সৃষ্টি করে সমঝোতামূলকভাবে অর্থের প্রাপ্তির প্রত্যাশা করেছিলেন, তবে মনোবাসনা পূর্ণ হয়নি। বিশপ বলেছেন, ‘তারা চেয়েছিল যাতে আমরা সমঝোতায় এসে তাদের কিছু টাকা দিই। আমরা যথাযথ মূল্যে যাচাই-বাছাই করে জায়গা কিনেছি। তাই আমরা কোনো রকম সমঝোতায় যেতে রাজি হইনি। এ জন্য জায়গা দখলের চেষ্টা হয়েছে। পুলিশ প্রশাসনের কাছে দাবি, আমাদের যেন এই বিপদ থেকে রক্ষা করা হয়।’ উল্লেখ্য যে, ইতিমধ্যেই ২৫ লক্ষ টাকা সমপরিমাণ সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। সিলেট ডায়োসিসের বিজ্ঞবান বিশপ বিজয় নিসফরাস ডি’ ক্রুজ অত্যন্ত দক্ষতা ও সাহসের সাথে বিষয়টি মোকাবেলা করেছেন।
৩
বিগত কয়েকদিন জাতীয় কিংবা স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় রাজশাহী তানোর উপজেলার মুণ্ডুমালা ক্যাথলিক মিশনের ফাদার প্রদীপ গ্রেগরী’র নৈতিক স্খলন এবং সৃষ্টি হওয়া বির্তকের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গাটি হয়েছে ‘ধর্ম’, খ্রিষ্টিয়ান ধর্ম। আমার পৈত্রিক ভূমি এই বরেন্দ্র অঞ্চলেই থাকায়, ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই মুঠোফোনে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। মিশনের ফাদারও একজন মানুষ, মাটির মানুষ; প্রত্যেকটি মানুষই শয়তানের প্রলোভনে পড়ে থাকে, স্বভাবতই ফাদার প্রদীপকেও ফাঁদে ফেলেছে। আমাদের কনসার্ন হচ্ছে—মানুষ ভুল করতে পারে, অন্যায় করতে পারে, খারাপ কাজ করতে পারে; সেক্ষেত্রে ধর্মকে আক্রমণ করে ধর্মের প্রতি বিদ্দেষ ছড়ানো সত্যিই আমাদেরকে আহত করেছে। খ্রিষ্টিয়ান ধর্ম মানুষকে নৈতিকতা সম্পন্ন, বিবেককে জাগ্রত করা এবং মানুষের প্রতি মানুষের দায়দায়িত্বের যত অগ্রাধিকার দিয়েছে, অন্য ধর্মে রয়েছে কি না আমার জানা নেই। তবে হ্যাঁ, গির্জার দায়িত্ব পরিচালনা ব্যক্তি হিসেবে এহেন অবিবেচকের মতো এবং সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক কাজ করাটি অত্র অঞ্চলের খ্রিষ্ট বিশ্বাসীদের মান-মর্যাদাকে প্রচণ্ডভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। আদিবাসীদের মধ্যে খ্রিষ্টের আলো জ্বালানোর ও দৃষ্টান্ত স্থাপনের যে অপূর্ব সুযোগ রয়েছে, সেটিকে ফাদার প্রদীপ গ্রেগরী আরো যোজন যোজন ক্রোশ পিছিয়ে দিয়েছে। খ্রিষ্টের বাণী নিয়ে গ্রাম-গঞ্জে, নগর-বন্দরে কোনো বাণী প্রচারক যেতে নিঃশ্চয় দ্বিধাগ্রস্ত এবং প্রশ্নবানে বিদ্ধ হবেন। একজন খ্রিষ্ট বিশ্বাসী এবং ধর্মের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির মধ্যে সংঘটিত অপরাধেরও একটি মানদণ্ডের ভিন্নতা রয়েছে। যিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাকে শত-সহস্রের দৃষ্টিতে পড়তে হয়, তার প্রতিটি কথাবার্তা, আচার—আচরণ এবং নৈতিকতা অবশ্যই বিচার্য হয়ে থাকে। ফাদার প্রদীপ বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রদীপের আলোকে মশালে পরিণত করতে পারেনি বরং আলোর রাজ্যে অন্ধকার প্রবেশের পথকেই প্রশস্থ করে দিয়েছে।
আমাদের পবিত্র সংবিধানে বর্ণিত রয়েছে—‘আইনের চোখে সবাই সমান’। অপরাধী অপরাধ করলে অবশ্যই তাকে শাস্তি পেতে হবে। ফাদার প্রদীপ ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় আইনে অপরাধী স্যবস্থ হলে তাকেও পরিশুদ্ধ হতে হবে। শুভ্র-সুন্দর হৃদয়ের মানুষ হতে প্রভু যীশু খ্রিষ্ট আমাদেরকে বার বার আহব্বান করেছেন। পাপী নয়, পাপকে ঘৃণা করতে আমাদের শিখিয়েছেন।
● মিথুশিলাকম মুরমু : গবেষক ও লেখক।





Users Today : 159
Views Today : 202
Total views : 182050
