আশা-নিরাশার খেলায় আমরা দুলছি সবাই। আশাহত হলেই আমরা নিরাশ হয়ে যাই। ইদানীং আমি নিরাশার চরম গর্তে পড়েছি। মাজা সোজা করে আমার আশা জেগে উঠবে এমন সম্ভাবনা আর দেখছি না। যে আশার আলো এত দিন ধরে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেখাচ্ছিলেন সেই জায়গাটা যেন হঠাৎ করেই অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেছে। এত ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে গিয়েও যখন আমরা হাল ছাড়িনি কিন্তু এখন দেখে মনে হচ্ছে হাল বোধহয় ছেড়েই দিতে হবে। কারণ কাণ্ডারির হাতের বাতি এখন নিভু নিভু করছে। সেই বাতি তো আলো ছড়াচ্ছেই না ওপরন্তু মনে হচ্ছে অন্ধকার চারদিক থেকে ধেয়ে আসছে। কেন এমনটি হলো তা ভেবে মোটেই স্থির করতে পারছি না।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের আন্দোলনরত ছাত্রদের উদ্দেশ্য করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যা বললেন তা শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। তিনি কীভাবে এমন একটা বক্তব্য দিলেন তা আমার কোনো মতে বোধগম্য হচ্ছে না। তার বিবৃতিটি আন্দোলনরত ছাত্রদের জন্য অবশ্যই হতাশাজনক। কিন্তু আমরা যারা আন্দোলনের সাথে জড়িত নই তারাও অবশ্যই এই বিবৃতিকে একান্তই নিরাশাজনক বলে মনে করছি। কেন? অবশ্যই কিছু ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্ররা যে আন্দোলন করেছে সেটা নিয়ে কোনোমতেই রাজনীতিকরণ করা উচিত নয়। অথচ সরকার নির্দ্বিধায় তাই করেছেন এবং তা করতে গিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞাশীলতাকে একেবারেই বালখিল্যতার পর্যায়ে নামিয়ে এনেছেন। সাধারণত রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়াগ্রস্ত না হলে কোনো রাজনৈতিক দল এমনটা করে না। তবে কি আওয়ামীলীগ রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়াগ্রস্ত হতে চলেছে। বিরোধীরা বলে বলুক তাই বলে কি সরকারের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে শেখ হাসিনা নিজের কাঁধেই দায়িত্বটি নিয়ে আমাদের সবাইকে নিরাশা করলেন। তার বিবৃতিটি প্রমাণ করে যে তিনি বিষয়টি নিয়ে বেশ বিচলিত। আন্দোলনটি কোনোভাবেই এমনতর পর্যায়ে পৌঁছায়নি যাতে করে খোদ প্রধানমন্ত্রীকেই এমনতর একটি বিবৃতি দিতে হবে। আমি এখনো একটি বিষয়ে স্পষ্টতর নই যেÑসরকার বিচলিত হলো, না প্রধানমন্ত্রী বিচলিত হলেন। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কথাবার্তা বলতে গিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সামনে প্রয়াশই বেফাশ কথাবার্তা বলে ফেলেন। রাজনীতি বিষয়ে পটু গণমাধ্যমের কর্মীগণ সেই বেফাঁস কথার সূত্র ধরে যখন রাজনীতিবিদদের ধরে ফেলেন তখন তাকে বিমুক্ত করার জন্যে তার দলভুক্ত অন্যরা বলেন “বিষয়টি তার একান্তই ব্যক্তিগত মন্তব্য, তার বেফাঁস মন্তব্যটি কখনই আমাদের দলের মতামত নয়।” সরকার প্রধান যখন নিজেই এমনতর একটা বিবৃতি দেন তখন অন্য কেউ এই একটি বিবৃতিকে বেফাঁস বিবৃতি বলে দাবি করতে পারবে না। কারণ সরকার প্রধান নিজেই এই কথা বলেছেন।
মিথ্যে বলার এই সমস্যা যে, একটি মিথ্যেকে ঢাকতে গিয়ে দশটি মিথ্যে বলতে হয়। প্রধানমন্ত্রীর বেফাঁস বিবৃতির ফলে সরকারি দল এখন উঠে পরে লেগেছে বিভিন্ন কথা দিয়ে ব্যাপারটিকে অবগুণ্ঠন করতে। টেলিভিশনের খবরে দেখতে পেলাম, জাহাঙ্গীরনগর আন্দোলনরত ছাত্রদের মাঝে এখন তাঁরা শিবিরের অনুপ্রবেশকারী চরের সন্ধান পেয়েছেন। বিষয়টিকে সেই রকম রঙে রঙিত করার জন্যে যেভাবে প্রমাণদি সাজানো হচ্ছে তা আরো অধিক মাত্রায় হাস্যকর। “কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল যে সে মরে নাই।” আন্দোলনরত ছাত্রদের মাঝে শিবিরের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে গিয়ে এখন বেশ কয়েকজন কাদম্বীনিকে মরতে হবে দেখা যাচ্ছে।
বিরোধী দলের নেতৃবর্গ এক এক করে তাদের এত দিনকার প্রিয় দল বিএনপি ছেড়ে যাচ্ছে। বিএনপির প্রধান নেত্রী কারাগারে, তারেক জিয়া লন্ডনেÑবিএনপির এখন ‘একে একে নিভিছে দেউটি’। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায় আন্দোলনের তেমন কোন চাপ আসছে না। সুতরাং এমনিতর একটি নির্ভার, নিঃস্তরঙ্গ ও নিরুত্তাপ রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যে আওয়ামীলীগকে কোন বিষয়টি বিচলিত করছে জানতে বড়ো ইচ্ছে হয়। সত্তরÑআঁশি বছর সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের নিজেদের রাজত্ব অটুট রাখার পর হঠাৎ করেই তাদের সাম্র্রাজ্য ভেঙে পড়তে শুরু করল। এই ভেঙে পড়ার কারণ বা মূল বিষয় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ইচ্ছাপ্রসূত নয়। ঘটনাটি ঘটেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নেরই নিজেদের মধ্যে থেকে নেতৃত্বের দুর্বলতা থেকে। সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়নকে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন মিখাইল গর্বাচভ ও বরিচ ইয়েলৎসিন প্রমুখ নেতৃবৃন্দ নিজ দলের পক্ষে কঠিনতর ভ‚মিকা রাখতে পারেননি বিধায় সোভিয়েত ইউনিয়ন তার রাজনৈতিক জৌলুস অবস্থা থেকে ধরাশায়ী হতে হয়েছিল। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের পরাজয় একান্তভাবেই চেয়েছিল কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন তাদের কৌশলের ফলে সৃষ্টি হয়নি। নিজেদের নেতৃত্বের দুর্বলতার জন্যই ঘটনাটি ঘটেছিল।
আওয়ামীলীগের নেতৃত্বের দুর্বলতার কথা বলার ধৃষ্ঠতা আমার নেই। প্রধানমন্ত্রী আন্দোলনরত ছাত্রদের শাসন করতে গিয়ে নিজের অজান্তেই নিজের জালে পা জড়িয়েছেন। এই ব্যাপারে তার নির্দোষতা প্রমাণ করতে হলে তাকে এই সময় অবশ্যই সঠিক পদক্ষেপটি নিতে হবে। সঠিক পদক্ষেপটি নিতে অপরাগ হলে নিরাশা থেকে নিষ্ঠুর রাজনৈতিক বালখিল্যতা প্রকাশ হয়ে পড়বে। শুনেছি আন্দোলনরত পক্ষ থেকে ৭২ পৃষ্ঠার প্রমাণাদি শিক্ষামন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে একজন স্বেচ্ছাচারী, সুবিধাবাদী, সুচতুর ও লোভী ভাইস চ্যান্সেলরের দুর্নীতি সম্পর্কিত। একজন দুর্নীতিপরায়ন ভাইস চ্যান্সেলরকে সরকার দিয়েছিল বলে তাকে তার কৃত সমুদয় দুর্নীতিকেও প্রশ্রয় দিতে হবে এমন কোনো বিধান নেই। ন্যায় বিচারের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রীকে অবশ্যই তার ইগোর উর্দ্ধে উঠতে হবে। তা না হলে একজন সফল রাজনৈতিক নেত্রী হিসাবে তার সমুদয় অর্জন তাকে বিসর্জন দেয়ার ঝুঁকি নিতে হবে। যারা ভাইস চ্যান্সেলরের দোষ নিয়ে কথা বলছেন ও বেশ কিছু প্রমাণাদিও যোগাড় করেছেন সেই ক্ষেত্রে শিবিরের নাম ঢুকিয়ে আরেকটি জজ মিয়ার কাহিনী সৃষ্টির চেষ্টা সমীচীন হবে না।
ড. এলগিন সাহা : এনজিও ব্যক্তিত্ব ও কলামিস্ট।





Users Today : 75
Views Today : 80
Total views : 177331
