‘শীত কোথায়’ বলে বহুদিন যাদের হা-হুতাশ করতে দেখেছি তাদেরও এবারের শীতে কাবু হতে দেখছি। যে শীত অস্থি-মজ্জা অব্দি পৌঁছায় তাকে উষ্ণতা দেওয়া শীতবস্ত্রেরও যখন অসাধ্য তখন কি আশ্চর্য, নারীর অগ্রযাত্রার সংবাদ-বৈচিত্র্য এবং নানাক্ষেত্রে তার বিস্ময়কর সাফল্য অন্যরকম এক উষ্ণতার যোগান দেয়। শেখ হাসিনার বার্তা/ নারী-পুরুষ সমতা, শেখ হাসিনার সহায়তায়/ তথ্য আপা পথ দেখায়’- এই স্লোগান নিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে মহিলাদের ক্ষমতায়ন প্রকল্পের আওতায় উপজেলা তথ্য কেন্দ্রগুলোর আয়োজনে যে- সব উঠান-বৈঠক বসছে, সূর্যের দেখা না মিললেও সেসব উঠোনে নারী ও শিশুদের উষ্ণতা আমরা অনুমান করতে পারি। গেল বছরের শেষপ্রান্তে শোনা গেল বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বৈশ্বিক লিঙ্গ-বৈষম্য প্রতিবেদনে চারটি মানদণ্ডে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবার ওপরে। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক ক্ষমতাসূচকে বাংলাদেশ সবচেয়ে ভালো করেছে। ২০২০-এ সেই ধারাবাহিকতায় যদি ‘মুজিববর্ষে’র আলো পড়ে তাহলে নারীর উন্নয়নে আরও কিছু নতুন মানদণ্ড তৈরি হবার কথা। অন্তত নারীর নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আশাবাদী হতেই পারি।
সকলেই জানেন ধর্ষণ, শিশু-ধর্ষণ, ধর্ষণ শেষে হত্যা বা ধর্ষিতার আত্মহত্যার ঘটনা ক্রমবর্ধমান। আমরা এই নতুন বছরের শুরুতে এ-ও দেখতে পাচ্ছি ধর্ষণ এখন আর হাটে-মাঠে, ঘাটে-বাটে, পথে-প্রান্তরে ঝোঁপে-ঝাড়ে নয়, নিজেদের বাড়িতে, নিজের ঘরে কিশোরীকে গণধর্ষণে অচেতন রেখে নিরাপদে ধর্ষক চলে যাচ্ছে। বেড়ানোর কথা বলে উদ্যানে কলেজছাত্রীকে গণধর্ষণের শিকারে পরিণত করছে প্রেমিক। আইন ও সালিশ কেন্দ্র, মহিলা পরিষদ বা কোনো কোনো উন্নয়ন সংস্থার গেল বছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রদত্ত পরিসংখ্যানগত তথ্যে জানা যাচ্ছে ধর্ষিত নারী-শিশু, ধর্ষণের পর হত্যার শিকার এবং আত্মহত্যাকারী নির্যাতিতার সংখ্যা বেড়েছে আগের বছরের তুলনায়। উত্ত্যক্ত ও যৌনহয়রানির শিকার নারীর সংখ্যাও বেড়েছে। ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অভিভাবক। প্রতিবাদ করতে গিয়ে খুন হয়েছে নারী-পুরুষ। প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিসংখ্যান ঊর্ধ্বগামী। সেই সঙ্গে আমরা এ-ও জানি যে, এই পরিসংখ্যান মূলত গণমাধ্যম থেকে পাওয়া খবর থেকে নেওয়া। সুতরাং বাস্তবতা আরও ভয়াবহ বলেই ধরে নিতে হবে। এরই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর দুঃখজনক ধর্ষণের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ সারাদেশে প্রতিবাদ, বিক্ষোভের ঘটনা এখনও চলছে। এরই মধ্যে নারী সংহতির পক্ষ থেকে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল হয়েছে। নারীপক্ষের প্রতিবাদী অবস্থান ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। নারীপক্ষ পথচারী ও যানবাহনের যাত্রীদের কাছে লিফলেট বিতরণ করে। নারীপক্ষের সদস্যরা ধর্ষণ ও নিপীড়নবিরোধী প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন ও প্রতিবাদী গান পরিবেশন করেন। এঁদের কর্মসূচি থেকে ধর্ষণ-নিপীড়নের ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করা হয়।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ কমিটি তৈরির লক্ষ্যে হাইকোর্টের নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা এ বিষয়টিও তাদের কাজের আওতায় থাকবে। প্রসঙ্গত বলি, বিষয়টি নিয়ে সালমা আলী (যিনি ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধে রিট পিটিশনার ছিলেন) শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আদালতের নির্দেশনার প্রয়োজনীয়তা ও প্রয়োগের কথা অন্যত্র বলেছেন, বলে চলেছেন। তিনি এ-ও বলেছেন আমাদের আইনের অভাব নেই। নারী ও শিশুবান্ধব আইনগত সহায়তা ও সুরক্ষায় বিভিন্ন সময়ে দেওয়া উচ্চ আদালতের নীতিমালাও কার্যকর রয়েছে। ধর্ষণের মামলায় আদালতের ছয়টি নির্দেশনার মধ্যে নির্ধারিত একশ’ আশি দিনের মধ্যে মামলা শেষ করার নির্দেশ রয়েছে। ভুক্তভোগীর নিরাপত্তায় তদারকি কমিটি গঠন ও কমিটির জবাবদিহির কথাও বলা আছে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। শাজনীন লতিফের ধর্ষণ ও হত্যা মামলা শেষ হতে সময় লেগেছে ষোলোটি বছর। এটা যেমন দৃষ্টান্ত হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না তেমনি এ-ও হবার নয় যে, নুসরাত হত্যা মামলার মতো সব মামলার পেছনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা থাকবে। এখনও এমন ভুরি ভুরি মামলা চলছে যেসব মামলার গন্তব্য কোথায় কেউ জানে না। কুড়িল বাসট্যান্ড থেকে মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়া গারো তরুণী ২০১৫-র গণধর্ষণের শিকার হয়েছিল। তার অভিযোগ নিতে থানার গড়িমসির বিরুদ্ধে পাঁচ-পাঁচটি মানবাধিকার সংগঠনের করা রিটের শুনানিতে হাইকোর্ট বেঞ্চ থেকে তিনটি রুল ও দুটি নির্দেশনা সত্তে¡ও, মামলার সতেরো জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়া সত্তে¡ও শুধু তদন্তকারী কর্মকর্তার (আইও) সাক্ষীটা বাকি রয়েছে বলে মামলাটা এখনও ঝুলছে। ধরা যাক ন্যায়বিচার পেয়েছে মেয়েটি। তাতেই কি ওর সব দুঃখ সব যন্ত্রণার অবসান হয়? হয় না।
মানসুরা হোসাইন তাঁর ‘ভোগান্তি পিছু ছাড়ে না’ প্রতিবেদনে (নারী মঞ্চ, ১২ জানুয়ারি, প্রথম আলো) দিনাজপুরের পাঁচ বছর বয়সী শিশুটির কথা বলেছেন যাকে আমরা কেউ ভুলিনি। বেøডে ক্ষতবিক্ষত যৌনাঙ্গ এবং সারা শরীরে ছ্যাঁকাপোড়া নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার থেকে মেডিকেল বার্ন ইউনিটসহ বিভিন্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিতে নিতে আজ সে প্রথম শ্রেণির ছাত্রী। এখনও সর্বক্ষণ তার মূত্র ঝরে, তার স্মৃতি ক্রমশ কমে যাচ্ছে এবং অপরিচিত পুরুষে তার সীমাহীন আতঙ্ক। ধর্ষণের শিকার সাভারের এক কিশোরী এক বছর ধরে কাঁদছে। কেঁদেই চলেছে।
এক মায়ের গল্প বলেছেন প্রতিবেদক। প্রেমিকের প্রতারণার শিকার মেয়ের আত্মহত্যার বিচার চেয়ে মেয়ের সঙ্গে প্রতারকের শরীরী সম্পর্কের ভিডিও চিত্র (মেয়ের মোবাইলে) নিয়ে দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। কোথায় বিচার? কে করবে বিচার? মানসুরা বলেছেন, সরকারের সব আছে। মেকানিজম, প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো সব আছে। শুধু সমন্বয় নেই এদের মধ্যে। হ্যাঁ, আমাদের স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পর্যায়ে নারী ও শিশুর সুরক্ষায় কমিটি আছে। এসব কমিটি থেকে নারী ও শিশুর সুরক্ষা বিষয়ে প্রচার-প্রচারণা চলতে পারে। এঁরা জনসচেতনতা তৈরি করতে পারেন। ঘটনা ঘটে যাবার পর ভিকটিমের পাশে দাঁড়াতে পারেন। তার কোথায় যেতে হবে, কার কাছে, কি করতে হবে এই কমিটির সদস্যরা সে দায়িত্ব নেবেন। আসলে একটি মেয়ে নির্যাতিত হলে মেয়েটি তো বটেই তার পুরো পরিবার বিশেষ করে অভিভাবক কতটা অসহায়, কতখানি দিশাহারা বোধ করেন ভুক্তভোগীই জানেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে তাদের পাশে দাঁড়াতেই হবে। মানবিকবোধ বা বিবেকসম্পন্ন মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের সদিচ্ছাও জরুরি নিঃসন্দেহে।
ভালো-মন্দ, আলো-অন্ধকার নিয়েই জীবন। বছরের শুরুটা সেভাবেই হলো আমাদের।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে স¤প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষিত ছাত্রীর পাশে যেভাবে তার পরিবার ও শিক্ষকবৃন্দ দাঁড়িয়েছেন, শক্তি ও সাহস যুগিয়েছেন তার প্রশংসা করতেই হয়। পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের নানা ধরনের সমাবেশ, সমাবেশ থেকে উত্থিত দাবিগুলো শুধু ভিকটিমকে নয়, সমাজকেও ভরসা দিচ্ছে। কিন্তু এখনও নির্মম সত্যটা হচ্ছে এই যে ধর্ষণ মামলায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে দুর্ভোগ, হয়রানি ও দুশ্চিন্তার শেষ থাকবে না- এই মেয়েটি ও তার পরিবারের; অপরাধী শনাক্ত হবার পরেও, অপরাধীর স্বীকারোক্তির পরেও।
আমরা জানি, জানি এই অর্থে যে অহরহ যে কথাটা আমরা শুনে আসছি তা হচ্ছে আমাদের আইনের অভাব নেই। আমাদের আইন কি তবে সাগরের নোনা জলের মতো? নারী ও শিশুবান্ধব আইনগত সহায়তা ও সুরক্ষায় বিভিন্ন সময়ে দেওয়া উচ্চ আদালতের নীতিমালা কার্যকর রয়েছে। ধর্ষণের মামলায় আদালতের ছয়টি নির্দেশনার মধ্যে একশ আশি দিনের মধ্যে মামলাটি শেষ করার নির্দেশনাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভুক্তভোগীর নিরাপত্তায় তদারকি কমিটি গঠন ও কমিটির জবাবদিহির ব্যবস্থার কথাও বলা আছে। যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আইনের একটি খসড়া বহুদিন ধরে পড়ে আছে, চাই যে তার খসড়াত্বের অবসান হোক। আইনটি স্বরূপে আবির্ভূত হোক। চাই যে এই স্পর্শকাতর মামলাগুলো দ্রæত বিচারের আওতায় আসুক। অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। সে শাস্তি কার্যকর হোক ততোধিক দ্রæততার সঙ্গে।
ফেরদৌস আরা আলীম : শিক্ষক ও লেখক।





Users Today : 75
Views Today : 80
Total views : 177331
