২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত প্রায় ৯,৩৮,০০০ কোটি টাকার বাজেটটি দেশের উন্নয়নকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়ার একটি বড়ো মহাপরিকল্পনা—এই বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মতো বেশ কিছু বড়ো চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য শিক্ষা খাতে প্রায় ১,৩৬,৬০৬ কোটি টাকা (জিডিপির প্রায় ২%) এবং স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ৬৯,৪০৯ কোটি টাকা (জিডিপির প্রায় ১%) বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে বোঝা যায়, মানবসম্পদ উন্নয়নের দিকে সরকারের নজর তুলনামূলকভাবে আরও বেড়েছে।
বাস্তব দিক থেকে দেখলে এই বরাদ্দ এখনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় কম। সাধারণভাবে শিক্ষা খাতে জিডিপির প্রায় ৪% এবং স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ৫% বরাদ্দকে যথাযথ ধরা হলেও, বাংলাদেশ এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি, ফলে কাঠামোগত ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ১৫.৩৯% এবং জিডিপির প্রায় ২.১%। আগের অর্থবছরে এই বরাদ্দ ছিল প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা, অর্থাৎ এবার প্রায় ১৪-১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়লেও বাস্তবে এর বড়ো অংশই সঠিক মানুষের কাছে পুরোপুরি পৌঁছায় না। অনেক সময় একই ব্যক্তি একাধিক কর্মসূচির সুবিধা পেয়ে যায়, আবার প্রকৃত দরিদ্রদের একটি অংশ তালিকার বাইরে থেকে যায়—এটাই মূল ‘টার্গেটিং সমস্যা’। শুধু ভাতা-নির্ভর সহায়তা দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য কমাতে যথেষ্ট নয়, কারণ এতে সাময়িক স্বস্তি মিললেও মানুষের আয়-উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ে না। এর কার্যকারিতা নির্ভর করছে সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন, স্বচ্ছ ডাটাবেস এবং মাঠপর্যায়ের শক্তিশালী ব্যবস্থাপনার ওপর।
বাজেটে নিত্যপণ্যে উৎসে কর ৫% থেকে কমিয়ে ০.৫% করা হয়েছে। প্রায় ৬০টি পণ্যে কর-শুল্ক হ্রাস, ফ্রিল্যান্সিং ও কন্টেন্ট ক্রিয়েশন করমুক্ত এবং প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বড়ো কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ ৪৮,২৯২ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রায় ৬০,৭৩০ কোটি টাকা করা হয়েছে, অর্থাৎ প্রায় ১২,৪৩৮ কোটি টাকা বা প্রায় ২৫% বৃদ্ধি। বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের কারণে এ খাতে বাড়তি বিনিয়োগ প্রয়োজন। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। তাই এই বরাদ্দ বৃদ্ধি যৌক্তিক ও উন্নয়নমুখী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
প্রস্তাবিত বাজেটটি আকারে প্রায় ৯,৩৮,০০০ কোটি টাকা, যেখানে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৬,০৪,০০০ কোটি টাকা এবং বাজেট ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২,৪৩,০০০ কোটি টাকা। বর্তমানে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র প্রায় ৭.৫% এর কাছাকাছি হওয়ায় এই উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন। বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার যদি অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়, তবে তা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দেবে এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট ও সুদের হার বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করবে।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে, যা মূলত বৈদেশিক ঋণ (১.১৬ লাখ কোটি টাকা) এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে পূরণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী জিডিপির ৫% এর নিচে ঘাটতি সাধারণত সহনীয় ধরা হয়, তাই আপাতদৃষ্টিতে এটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি একদিকে যেমন উন্নয়নমুখী ও সামাজিক কল্যাণকামী, অন্যদিকে তেমনি এটি বড়ো ধরনের কাঠামোগত ও বাস্তবায়নজনিত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর জন্য নেওয়া বড়ো পরিকল্পনাগুলো প্রশংসনীয় হলেও, দেশের সীমিত রাজস্ব আয় (মাত্র ৭.৫% কর-জিডিপি অনুপাত) এই উচ্চাভিলাষী বাজেটকে অনেকটাই ঋণ-নির্ভর করে তুলেছে। অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ও বৈদেশিক উৎস থেকে এই বিশাল অংকের ঋণ নেওয়া এবং তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই হবে আগামী দিনের মূল অর্থনৈতিক পরীক্ষা। যদি সরকার অপচয় রোধ, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট এড়াতে কঠোর মনিটরিং বজায় রাখতে পারে, তবেই এই বাজেটের হাত ধরে বাংলাদেশ সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে একটি উন্নত ও স্বনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে।





Users Today : 13
Views Today : 16
Total views : 183437
