বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। কিন্তু সীমিত সম্পদ। বিশাল জনসংখ্যা ও সীমিত সম্পদ দিয়ে কখনো দেশের উন্নয়নকে তরান্বিত করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন যথাযথ পরিকল্পনা ও কার্যকরী উদ্যোগ। যার মাধ্যমে এ বিশাল জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রুপান্তর করা যাবে। বর্তমান সময়ে এটি সরকারের বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা দেশে দারিদ্র্য, বেকারত্ব বেড়েই চলেছে। প্রতিনিয়ত জনগণ বৃদ্ধি পাচ্ছে সেই সাথে জনগণের বহুমাত্রিক চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
দেশে জনসংখ্যা উচ্চ স্তরে কিন্তু জনসম্পদ নিম্নস্তরে। সাধারণভাবে জনসম্পদ বলতে সেই সকল জনগণকে বোঝায় যারা শিক্ষিত, দক্ষ এবং উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত। অর্থাৎ মেধা, দক্ষতা ও শ্রমশক্তিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কাজে লাগানোর সক্ষমতাকেই জনসম্পদ বলে। তাই বাংলাদেশের উন্নয়নে এই অধিক জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করা অপরিহার্য।
বাংলাদেশের জনসংখ্যা নিয়ে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) জানিয়েছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৫৭ লাখে দাঁড়িয়েছে। যার অর্ধেক নারী এবং দুই-তৃতীয়াংশ (১১৫ মিলিয়ন) মানুষ, কর্মক্ষম। এটি ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুফল অর্জনের একটি সুযোগ। জনসংখ্যার ৭ শতাংশ প্রায় ১.২ কোটি মানুষ ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী, যা বয়স্ক জনগণের সংখ্যা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ১৯ শতাংশ (প্রায় ৩৩ মিলিয়ন) কিশোর-কিশোরী এবং ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সি তরুণের সংখ্যা প্রায় ৫০ মিলিয়ন যা জনসংখ্যার ২৮ শতাংশ।
বাংলাদেশের মোট প্রজনন হার (টিএফআর) ২.১, যা মধ্যম স্তরে রয়েছে। তবে দেশের কিছু অঞ্চলে এখনও কিশোর বয়সে নারীদের গর্ভধারণের হার বেশি, যা বাল্য বিবাহ, জন্মনিরোধ ব্যবস্থার সীমিত ব্যবহার এবং যৌনশিক্ষার অভাবে হয়ে থাকে।

দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করে। যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির সাথে জড়িত। যে কৃষি গতানুগতিক ভাবে চলছে যুগের পর যুগ। যার ফলে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার হ্রাস না পেয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পিপিআরসি দারিদ্র্য হার নিয়ে গত আগস্টে জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, ২০২৫ সালে দেশের সার্বিক দারিদ্র্য বেড়ে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ হয়েছে। তাই সরকারের এ বিষয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। গ্রামীণ কৃষিকে আধুনিকায়ন করা অপরিহার্য। নিয়মিত কৃষকদের কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ প্রদান করে পারদর্শী করে গড়ে তুলতে হবে। ফলে একদিকে যেমন মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে আরেকদিকে তৈরি হবে দক্ষ জনশক্তি। সেই সাথে ভাগ্য পরিবর্তন হবে গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের এবং দেশের অগ্রগতি তরান্বিত হবে।
বাংলাদেশের আরেক বড়ো সমস্যা বেকারত্ব। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এর সর্বশেষ ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশে বেকারত্বের হার বেড়ে ৪.৬৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সেই তথ্য অনুযায়ী, বেকারের সংখ্যা ২০২৩ সালে ২৫ লাখ ৫০ হাজার থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ২৭ লাখে পৌঁছেছে।
এছাড়া দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, টেকসই উন্নয়ন ও সুনাগরিক গঠনে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা অপরিহার্য।
একটি দেশের সম্পদ কম হলে সেই দেশের বিশাল জনসংখ্যা অনেক বড়ো সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তবে সেই জনসংখ্যাকে যদি জনসম্পদে রুপান্তর করা যায়, তাহলে দেশের জন্য অনেক বড়ো সফলতা। এ জন্য প্রয়োজন যথাযথ উদ্যোগ ও পরিকল্পনা। এক্ষেত্রে চীন, ভারত বা শ্রীলঙ্কার কথা বলা যেতে পারে, যেখানে সরকার জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করার মাধ্যমে সফলতা দেখিয়েছে। বাংলাদেশেও বিশাল জনসংখ্যা। উপযুক্ত পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করে দেশের জনগণকে দক্ষ জনশক্তি ও জনসম্পদে রূপান্তর করা যায়। এক্ষেত্রে সরকারের নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। যেমন-বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। তাই কৃষিকে পরিপূর্ণভাবে আধুনিকায়ন করতে হবে। কেননা এদেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করে, যার সবাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির সাথে জড়িত। কৃষিকে আধুনিকায়ন করতে পারলে দেশের দারিদ্র্য হ্রাস পাবে। মানুষের অভাব দূর হবে। অভাব দূর হলে মানুষ নতুন কিছু চিন্তা করার সুযোগ পাবে। এভাবেই দেশের বেকারত্ব দূর করা সম্ভব এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার করা। কর্মমুখী শিক্ষা বলতে সেই শিক্ষাকেই বোঝানো হয়, যার মাধ্যমে সহজেই একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করে বেকার না থেকে কোনো না কোনো কাজের সাথে জড়িত থাকতে পারে। এক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা। তৃতীয়ত, তথ্য প্রযুক্তির আধুনিক যুগের সাথে সমন্বয় করে চলার জন্য তথ্য প্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং ইত্যাদি বিষয়ে জনগণের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। চতুর্থ, শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করা জরুরি। চতুর্থত, নারী শিক্ষার প্রসার বাড়ানো। নারীদের শিক্ষা ও অর্থনীতিতে সমানভাবে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একসময় নারীদের অংশগ্রহণ ছিল না, বর্তমান সময়ে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক্ষেত্রে নারী নিরাপত্তা প্রদান করা অপরিহার্য। এবং কর্মক্ষেত্রে নারী পুরুষের বৈষম্য দূর করা।
পঞ্চম, শিশুশ্রম বন্ধ করা। শিশুদের সাধারণ ভাবেই বেড়ে উঠার সুযোগ করে দিতে হবে। শিশু শ্রমিক দিয়ে কখনো দেশের উন্নয়ন হবে না বা দক্ষ জনশক্তি তৈরি হবে না। বর্তমান শিশুদের দ্বারা অসাধু ব্যক্তিরা বিভিন্ন অনৈতিক কাজ করিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করে। পরবর্তিতে এই শিশুরা বড়ো হয়ে সহজেই অনৈতিক কাজের সাথে যুক্ত হয়। তাই শিশু শ্রমের সাথে জড়িত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন কর্মমুখী শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
যে শিশু যে কাজে পারদর্শী তাকে সেই ধরনের শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। তাহলে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা সম্ভব।
ষষ্ঠত, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বিস্তার করা। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মূলত স্ব-কর্মসংস্থান, স্থানীয় কাঁচামাল এবং স্বল্প পুঁজিনির্ভর এমন কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমন, তাঁত শিল্প, মৃৎশিল্প (মাটির পাত্র), বাঁশ ও বেতের কাজ, নকশিকাঁথা এবং হালকা প্রকৌশল, চাল কল, প্লাস্টিক সামগ্রী তৈরি, হোসিয়ারি শিল্প ইত্যাদি।
সপ্তম, জনগণের মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। পুষ্টিকর খাদ্য ও উন্নত চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে জনগণকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখা।
অষ্টম, শিক্ষার বিস্তার করা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। কোনো ক্ষেত্রে বিদ্যালয় নেই, আবার কোনো ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সমস্যা। কম বয়সেই বই ছেড়ে কর্মক্ষেত্রে যাওয়া লাগে। এক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রচুর বৃত্তির ব্যবস্থা এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য বিশ্বের উন্নত ও প্রযুক্তি-নির্ভর দেশগুলোতে প্রেরণ করা। এছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণে রেখে পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করা। সামাজিক বৈষম্য দূর করে সবার জন্য সমান সুযোগ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। দেশকে এগিয়ে নিতে এসকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা ও বাস্তবায়ন করা জরুরি।
মুজাহিদ হোসেন: কলাম লেখক ও শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।





Users Today : 39
Views Today : 51
Total views : 180957
