জীবনের বিশেষ দিকগুলোর বিষয় চিন্তা করতে গেলেই রবীন্দ্রনাথের দ্বারস্থ হতে হয়। বাঙালি জীবনে চিন্তা-ভাবনার কোনো বিষয় আর তিনি বাকি রেখে যাননি, যেখানে তাঁর চিন্তা ও মননশীলতার বিকাশ ঘটেনি। নববর্ষ উপলক্ষে সকলেরই মনে একটা আশা থাকে বছরটা যেন ভালো যায়। গত বছর এমনি একটা সময় সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা জানিয়েছিলাম-বলেছিলাম প্রভু এই বছরটা যেন ভালো যায়। আসলে কতটুকু ভালো গিয়েছে সেই বিষয়ে প্রতিবারের মতো এবারো ৩১ ডিসেম্বর রাতে ধ্যান করছিলাম-কোন কোন পীড়াদায়ক বিষয় আমার জীবনকে ব্যতিব্যস্ত করেছে। সেই সমস্ত পীড়া আমাকে শয্যাশায়ী করতে পারেনি ঠিক আমি আবার উঠে দাঁড়িয়েছি তাও ঠিক, কিন্তু যেকোনো পীড়ায় আমার মনভঙ্গের কারণ হয়ে আমার পীড়াকে প্রলম্বিত করেছে। তাই নতুন বছরের প্রাক্কালে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় প্রার্থনা জানাই, “বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে যেন আমি না করি ভয়, দুঃখ-চিতে ব্যথিত তাপে নাই বা দিলে সান্তনা, দুঃখ যেন করিতে পারি জয়”।
গত বছরের দুঃখ সহ্য করতে পেরেছি বলে একটি নতুন বছরে প্রত্যুষে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করার জন্য উপস্থিত হয়েছি। জানি অনেক অযাচিত দুঃখ এসে এবারও আমার জীবনকে ব্যথিত করবে কিন্তু এ-ও ঠিক প্রতিবারের মতো এবারো আমি দুঃখকে জয় করে আরেকটি নতুন বছরের দ্বারপ্রান্তে এসে উপস্থিত হব। বলব, দুঃখ তুমি কোথায়? সুখের অন্বেষায় আমি আবার ছুটে চলব নতুন উদ্যমে, নতুন ভরসায়। এভাবেই চলবে আশাবাদী জীবনের চক্র।
প্রতিদিন দৈনিক প্রত্রিকায় চোখ বুলালেই অনেকের মতো আমাকেও আশাহত হতে হয় যখন দেখি আমাদের দেশের মেয়েরা ধর্ষিত হচ্ছে পুরুষদের লালসায়। প্রতিদিন ধর্ষণের যত খবর বেরয় তার শতকরা ৫ ভাগও খবর বেরয় না যে, কোনো ধর্ষিতার বিচার হয়েছে। এই যদি সমাজের চিত্র হয় ধর্ষকরা ধর্ষণের জন্যে অতি মাত্রায় প্রলুব্ধ হবে বৈকি। পৃথিবীব্যাপী সবলের অত্যাচার দুর্বলের প্রতি থাকছেই। পেশিশক্তির জোরে পুরুষরাই ধর্ষণজনিত নিকৃষ্ট কর্মে নিজেদেরকে প্রবৃত্ত করে থাকে। আইনের শাসন না থাকায় এই সমস্ত দুষ্কর্মের হার ক্রমান্নয়ে বেড়েই চলছে। মিডিয়া দুষ্কৃতিকারীদের বিচার হয়েছে এমন খবর বেশি করে ছাপিয়ে এই বিষয়ে একটি বলিষ্ঠ ভ‚মিকার রাখতে পারবে বলে আমার বিশ^াস। কিন্তু ধর্ষণের খবর ছেপে অনেকেই যৌন সুরসুরি অনুভব করে থাকে। কি জানি এই সুরসুরি সৃষ্টি করে বলেই ধর্ষণের খবর পত্রিকায় বেশি ছাপানো হয়। আমরা যে কেউ ইচ্ছা করলে যেকোনো যৌনতার বিষয় নিয়ে সমাজে একটা আন্দোলন সৃষ্টি করতে পারি। এই আন্দোলন সৃষ্টির জন্য সৎ ইচ্ছাই যথেষ্ট। যেকোনো ধর্ষকের দুষ্কর্মকে আমরা সহ্য করে যাব, ধামাচাপা দিব, আন্দোলন করব না আর দেশে ন্যায্যতা ফিরে আসুক, সুশাসন ফিরে আসুক, রাজনীতিবিদরা সকলেই দেশপ্রেমিক হয়ে যান এটা আমরা যতই কামনা করি না কেন তা হবে বাস্তবতা বিবর্জিত। আমার যেমনি ‘খোঁপা তেমনি রবে চুল ভিজাবো না’ এই নীতি নিয়ে চললে সমাজ কি কখনো এগুবে-কখনোই না । তাই এই বছরের প্রথমেই মঙ্গল কামনার সাথে, আমাদের প্রত্যেকেরই একটা মঙ্গল ইচ্ছা পালনের প্রতিজ্ঞা করা উচিত। ধর্ষকদের বিচার চাই বলে পল্টন ময়দানে গিয়ে একটি বক্তৃতা দিলেই চলবে এমনটি নয়। বরং ধর্ষণের বিচার চাইবার জন্য আমার নিজেরও একটি ব্যক্তিগত উদ্যোগ থাকা উচিত। সেটা লিখনের মাধ্যমে হতে পারে কিংবা উদ্যোগী হয়ে ঘটনাটির মামলা থানায় গিয়ে দাখিল করার মাধ্যমেও হতে পারে। মোট কথা ছেড়ে দেওয়া যাবে না আমার বলয়ের মধ্যে কোনো ধর্ষণজনিত ঘটনা ঘটলে আমাকে অবশ্যই একটি সুনির্দিষ্ট ভ‚মিকা পালন করতে হবে। সেই ভ‚মিকা পালনের মধ্যে দিয়েই আমাদের প্রতিবাদ জানানো হবে একটি যথাযথ প্রচেষ্টা। সুযোগ পেলেই এইমতো প্রচেষ্টা পালনে আমি যেন বিরত না থাকি সেটাই হচ্ছে বছরের প্রারম্ভে আমার প্রতিজ্ঞা।
রাজনীতির নামে আমাদের দেশে যে বিভাজন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ১৯৪৭ সনে। সেই বিভাজন প্রক্রিয়া এখনো দেখি সমানভাবে এগিয়ে চলেছে দল ও লীগের নামে । স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা এসে সম্মুখে এসে দাঁড়ালে আমরা প্রশ্ন করতে দ্বিধা করব না জিজ্ঞাসা করতে, আপনি দল না লীগ? এই বিভাজনের খেলা পৃথিবীর সব জায়গায়ই চলছে। তবে আমাদের দেশে মাত্রাটি যেন মাত্রাতিরিক্ত। এই বিভাজনের প্রক্রিয়া আমাদের এমনিভাবে বিভাজিত করেছে যে পরিবার প্রিয়জনের বিষয়টি এর মাঝে পরে তুচ্ছ হয়ে যায়। রাজনীতি যখন আমাদের দেশে ব্যবসায় পরিণত হয়েছে তখন যেকোনো রাজনীতি বা যেকোনো ব্যবসা নিজ নিজ স্বার্থেই আইনসিদ্ধ হয়ে যায়। তারপর আস্তে আস্তে এর সামাজিক ব্যাপ্তি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। তারপর আমিও সামাজিক জীব হিসাবে এই সত্যকে মেনে নেই। ইংরেজিতে একটি কথা আছে- Behind every success there is a crime । তাই কৃতকার্যতার বিষয়গুলো মাপতে হলে সেই কৃতকার্যতার পশ্চাদে থাকা অপরাধগুলোকেও সামনে নিয়ে আসতে হবে। সেই রকম দুঃসাহসী লোক কি আমাদের দেশে আছে? বরং বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আপোশকামী মনোভাব আমি দেখেছি সর্বোচ্চভাবে। যেই বুদ্ধিজীবীরা তাদের জ্ঞান ও বিদ্যার প্রখরতায় আমাদের পথ দেখাবেন তারাই যখন আপোশকামী হয়ে পড়েন তখন আমরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি জীবনে অন্ধকার নেমে আসে। সুপথে চলার পথ হারিয়ে ফেলি।
সমাজে প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধিজীবীদের কাছে আমার একান্তভাবেই প্রার্থনা। এ বছরটা যেন তারা নির্মোহ হয়ে তাদের আপোশকামিতা দ্বারা সমাজকে কুলষিত না করেন। সঠিক কথা সত্যভাবে বলতে পারেন না পারেন কিন্তু মিথ্যা প্রবঞ্চনা দিয়ে আমাদেরকে যেন বিপথে চালিত না করেন। আমি জানি বুদ্ধিজীবীদের সকলেই সম্মান করে থাকেন, আমিও করি। কিন্তু তাদের মিথ্যাকামী দ্বিচারিতা আমাদের সমাজের যে প্রভ‚ত ক্ষতি করে থাকে সেই উদ্দেশ্যে বছরের প্রথমেই এই সাবধানবাণী উচ্চারণ করলাম বলে আমাকে ক্ষমা করবেন।
রাজনীতিবিদরা যে সুযোগ পেয়েছেন সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার তো তারা করবেনই কিন্তু সেই সুযোগের নেশায় বুদ হয়ে থেকে তারা যেন আরও ক্ষতিকারক কিছু না করেন দেশ ও দশের জন্য মঙ্গল সাধন করেন সেই প্রার্থনা জানাই। নিছক জন-সাধারণের মঙ্গলের জন্য কোনো চিন্তা ভাবনা না থাকলে বছরের শুরুতে সেই বিষয়ে চিন্তা করতে অনুরোধ জানাই। রাজনীতিবিদরা ইতিমধ্যে অনেক আইন প্রনয়ন করেছেন দেশের মঙ্গলের জন্য কিন্তু সেই আইন যে প্রতিপালিত হচ্ছে সেই বিষয়ে লক্ষ করাও তাদের কর্তব্য। কারণ যে আইনটি তারা পাশ করেন জনসাধারণ সেই আইনের মর্মার্থ বোঝেন না, তাই কেবল আইন প্রণয়নের মাধ্যমে মঙ্গল সাধন হবে এমন নয় বরং জনস্বার্থে প্রণিত আইনসমূহ নিয়ে এক দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। যে আন্দোলনের মাধ্যমে জনসাধারণের অধিকারকে রক্ষা করা যাবে একইভাবে সরকার সেই আইন ও তার প্রয়োগ সম্পর্কে সজাগ থাকবে।
বছর আসে বছর যায় এইভাবেই আমাদের প্রার্থনা মাঠেই মারা যায়। বছরের প্রথমদিক দিয়ে আমাদের যে সমস্ত চাওয়ার বিষয় ছিল বছরের শেষ দিকে এসে সেই সমস্ত বিষয়ে আমরা পেলাম কী পেলাম না তার হিসাব আমরাই রাখি না। অর্থাৎ কালের চক্রে আমরা ঘুরে চলেছি চাওয়া ও পাওয়ার দাবি দিয়ে জীবনকে মুখরিত করেছি। জীবনে কী পেলাম, কী পেলাম না তা নিয়ে আত্মসন্তুষ্টি ও খেদ নিয়ে জমা করে রাখছি। এই আত্মসন্তুষ্টি ও খেদের সমাহার দিয়েই এ বছরটাকে সাজাতে হবে। আমরা যারা একটু সচেতন মানুষ একটু চেষ্টা করলেই আমরা আমাদের খেদের মাত্রা কমিয়ে আত্মসন্তুষ্টির মাত্রা বাড়াতে পারি। আপনার জীবনেও এ বছরে খেদের পরিবর্তে আত্মসন্তুষ্টির পরিমাণ বেড়ে যায় এই কামনা করে আজ শেষ করছি।
এলগিন সাহা : এনজিও ব্যক্তিত্ব ও কলামিস্ট।





Users Today : 113
Views Today : 123
Total views : 177374
