২০১৫ সালে সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশের শ্রমিক পাঠানো সংক্রান্ত এক অলিখিত চুক্তি হলো এই যে, একজন নারী গৃহকর্মী পাঠালে দুইজন পুরুষ শ্রমিক নেবে তারা। অনেকদিন ধরে বন্ধ থাকা সৌদি শ্রমবাজার ২০১৫ তে খুলে যায় এরপর। তারপর থেকে সেদেশে নারী শ্রমিক পাঠানোর সংখ্যা বেড়ে যায়।
একইসাথে বেড়ে যায় নারী শ্রমিকের নির্যাতিত এবং যৌন নিগৃহিত হয়ে দেশে ফেরার সংখ্যাও। কিন্তু সবাই বেঁচে ফিরতে পারেন না। সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক বলছে, চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত সৌদি আরব থেকে ফিরেছে ৪৮ নারী কর্মীর মরদেহ। চার বছরে মোট ৩৯০ জন নারী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে, যারমধ্যে সৌদি থেকেই ফিরেছে ১৫২ জনের। বেঁচে ফেরা নারীরা ফেরার পর তাদের বেশিরভাগকেই আর গ্রহণ করে না পরিবার।
এতকিছুর পরেও কেন বন্ধ হচ্ছে না সৌদি আরবে নারী শ্রমিক পাঠানো? কারণ নারী গৃহকর্মী না পাঠালে দুইজন করে পুরুষ তারা নেবে না। বিদেশি ক্রিম রেমিটেন্স বন্ধ হয়ে যাবে তাহলে। তার মানে কি আমরা আমাদের নারীদের রেমিটেন্স মেশিন হিসেবে ব্যবহার করছি? পুরুষ পাঠানোর জন্য ঠেলে দিচ্ছি নারীদের? একজন নারী গৃহকর্মী নিতে সৌদিরা খরচ করে ১ লাখ ৭০,০০০ টাকা। এবং তারপর তারা মনেই করে টাকা দিয়ে দাসী কেনা হয়েছে, যার সাথে যা খুশি তাই করা যায়। বাংলাদেশের নির্যাতিতা নারী বা অন্য শ্রমিকদের সহায়তা দিতে বাংলাদেশ দূতাবাসে বিশেষ ইউনিট আছে। কিন্তু সেই পর্যন্ত অধিকাংশ নারী পৌঁছাতেই পারে না। নির্যাতনের পর তারা এমন ট্রমাটাইজ হয়ে থাকে যে যেকোনো মূল্যে তারা দেশে ফিরতে চায়। কোনোরকম আইনী জটিলতায় যাওয়ার মতো অবস্থা আর তাদের থাকে না। বেশিরভাগ মৃত নারীর ক্ষেত্রে বলা হয় স্ট্রোক বা আত্মহত্যা, এরপরে আর কোনো অনুসন্ধান হয় না। সৌদিরা সবরকম আইনের ঊর্ধ্বে। ফিরে আসার পর এইসব মেয়েদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আর গ্রহণ করতে চায় না পরিবার। এ বছরই ব্র্যাক তাদের সেফ হোমের মাধ্যমে ১৩০০র বেশি নারীকে সবরকম সহায়তা দিয়েছে।
গত কয়েকদিনে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এটা পরিষ্কার হয়েছি যে এই বাজার তারা বন্ধ করবে না। প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী জানিয়েছেন, এখনই বাজার বন্ধ করার সময় আসেনি। আর পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, লাখ লাখ নারী যাচ্ছে তার মধ্যে কয়জন নির্যাতিত হচ্ছে যে বাজার বন্ধ করতে হবে? পার্সেন্টেজ কত? এ সবের বাইরে আছে আমাদের সুবিধাবাদী সমাজ। যারা মনেই করেন, আমার বাড়িতে বান্দিগিরির জন্য তদের পাওয়া যায় না, যাবি সৌদিতে, রেপড হবি না তো কি? এইসব ফইন্নিদের লোভ বেশি, তাদের এতো নাকেকান্না মানায় না-এইরকম ভাবা মানুষের সংখ্যা নেয়ায়েত কম না।
এবং এই সবকিছুর বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমরা চাইবো সৌদিতে আপাতত নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ হোক। এই আওয়াজে কতটুকু কাজ হবে জানি না। কিন্তু আওয়াজ না তুলে আমরা আর কি করতে পারি? আমাদের সবার ঘরেই তো আয়না আছে, তাই না?





Users Today : 115
Views Today : 126
Total views : 177377
