বিগত ১৮ই আগস্ট খুব সাদামাটাভাবে পার হলো আলফ্রেড সরেন ১৯তম মৃত্যুবাষির্কী। অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়ায়ে সাঁওতাল ব্যক্তিত্বের কবরে পুষ্পস্তবক প্রদানের প্রাক্কালে উপস্থিত ছিলেন মেয়ে ঝর্না সরেন, বোন রেবেকা সরেন, ভাই মহেশ^র সরেনসহ বেশ কিছুসংখ্যক গুণগ্রাহী। রাজশাহীর স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা ‘সোনার দেশ’-এ একটি ছবি সম্বলিত সংবাদ পরিবেশন করেছে, বলা হয়েছে-‘ভূমি দখলকারীদের হাতে নিহত আলফ্রেড সরেন হত্যার বিচার চাই’। আলফ্রেড সরেন নিহতের সময়ে মেয়ে ঝর্না একেবারেই ছোট্ট ছিল; আজ শৈশব পেরিয়ে যুবতীতে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ ১৯ বছর অতিক্রান্তের পর ঝর্নার ছোট্ট হৃদয়ে দেশের প্রতি কী মনোভাব জন্ম নিলো! ঝর্না সরেন হয়ত উন্মুক্ত আকাশে বলতে পারছে না, আমার প্রিয় বাবার হত্যাকারীরা প্রকাশ্যে দিনের আলোয় ঘুরাঘুরি করছে; তারপরও তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হলো না কেন! বরং আবারো তার প্রজন্মদেরকে প্রচ্ছন্নভাবে হুমকির মধ্যে বসবাস করতে হচ্ছে। তবে কী আমাদের দুর্বলতা রয়েছে! আমাদের কী বিত্তবানদের প্রতি, ক্ষমতাবানদের প্রতি নৈতিক সমর্থন রয়েছে! তাহলে আমাদের গলদ কোথায়? আমাদের পবিত্র সংবিধানে লেখা রয়েছে-‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী’।
সাঁওতাল এই একনিষ্ঠ অধিকার কর্মী নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর উপজেলার ভীমপুর গ্রামে চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। প্রান্তিক-অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষের অধিকারের কথা ছিল তার কণ্ঠে। সেই কণ্ঠকে স্তব্ধ করতেই হত্যার মতো বর্বরতম পথ বেছে নেয় হত্যাকারী ‘হাতেম-গদাই’রা। কন্যা সন্তান ঝর্না এখন জানতে পেরেছে, বাবা আলফ্রেড সরেন মানুষের কল্যাণের লক্ষ্যে কাজ করত; যারা ন্যায্য মুজরী পেত না, তাদের পক্ষাবলম্বন করতেন। জাতিগত কিংবা ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা এলাকায় বৈষম্যের শিকার হলে তিনি প্রতিবাদ করতেন; তাদের সুখ-দুঃখে, অভাব-কষ্টে পাশে থেকে সহযোগিতা করতেন। তাহলে কী এ জাতীয় সামাজিক, সাংস্কৃতিক কিংবা অর্থনৈতিক কর্মকা-ে সচেতন মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়ানো অন্যায়! এসব প্রান্তিক লোকেরা দু-মুঠো মোটা চালের ভাত, মোটা কাপড় কিংবা মাটির সংস্পর্শে থেকে বাঁচতে চেয়েছে, এগুলো প্রত্যাশা কিংবা সাদা মনে স্বপ্ন বোনা কী অন্যায়! শুধু ঝর্না সরেন কেন, অনেক ঝর্না সরেন এরূপ প্রশ্নের উত্তর খোঁজ করে থাকেন! আর এখানেই বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।
সাঁওতাল মেয়ে ঝর্না সরেন বোধকরি পড়াশোনা করেছে, বেশি দূর না হলেও জনমানুষের অধিকার ও চেতনাবোধ জাগ্রত করার মতো অক্ষরজ্ঞান তার নখদর্পণে। ঝর্নার পিতার প্রতি আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র কিংবা বিচার ব্যবস্থার যে উদাহরণ; এটি কী ইতিবাচক হতে পারে, কখনোই নয়; কারণ কোমল মনে যেটি স্বচক্ষে দেখেছে, যেটি হৃদয়ের গভীরে বিশ্বাস করেছে, সেটি তো মিথ্যে নয়! ১৯টি বসন্ত পেরিয়েছে, এ সময়ে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-ব্রহ্মপুত্রে শত সহস্র কিউসেক জল গড়িয়েছে কিন্তু যেটি পরিবর্তন হয়েছে-সেটি হতে পারে সরকার, দায়িত্বরত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিচারক, আদালত এমনকি মানুষের চিন্তা-চেতনাও; শুধুমাত্র পরিবর্তন হয়নি আলফ্রেড সরেন হত্যার বিচার। আমরা এই নতুন প্রজন্মের সামনে কোনো ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছি। উত্তরবঙ্গের আলোচিত হত্যাকা- হিসেবেই দেশব্যাপী সর্বস্তরের মানুষজন প্রতিবাদে সামিল হয়েছিলেন; আজ বহমান স্রোতের মতোই আমরা ভুলে যেতে বসেছি। তবে নাট্যজগতে ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিথযশা নাট্যকার মামুনুর রশীদ রচনা করেছেন ‘রাঢ়াঙ’ নাটক। রাঢ়াঙ সাঁওতালী শব্দ, এর অর্থ দূরাগত মাদলের ধ্বনি। দূরাগত মাদলের ধ্বনির সঙ্গে শোসিত সাঁওতালদের জেগে ওঠার আহ্বান জানানো হয়েছে এ নাটকে। রাঢ়াঙ নাটকের প্রথম মঞ্চায়ন হয় ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে; এরপর ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার বেশ কয়েকটি নাট্যোৎসবে অংশ নিয়েছে আরণ্যকের রাঢ়াঙ। নাট্যজগতে সাড়া জাগানো এই নাটকটি স্বল্প সময়ে অর্থাৎ ২০১১ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যেই শততম প্রদর্শনী মঞ্চস্থ হয়েছে। বাংলাদেশে আরণ্যকই প্রথম দল যারা সরকারি অর্থায়নে বিদেশের মাটিতে নাটক মঞ্চস্থ করেছে। আর সেই মঞ্চায়িত নাটকটি হচ্ছে রাঢ়াঙ।
কখনো কখনো বাতাসে কান পাতলে শুনিÑঝর্না সরেন আমাদের কাছে অভিযোগের সুরে বলছে, তোমরা আমার বাবার হত্যার বিচার করতে পারোনি! তোমরা বাবার খুনিদের খুনি হিসেবে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছো! খুনিরা দেশের আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করেছে। তাহলে কী আমাদের বিচার ব্যবস্থায় খুঁত রয়েছে! সেটি তো নয়, বিচারের সাথে যুক্ত ব্যক্তিরাই মামলাকে হিমাগারে রুদ্ধ করে রেখেছে। ধর্মীয় কিংবা জাতিগত সংখ্যালঘু হিসেবে ঝর্না কি ভাবতে পারে না, এমন হত্যাকা-ে রাষ্ট্রজুড়ে হৈচৈ হলেও; এমনকি বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিগত নির্বাচনী ইশতেহারে ‘আলফ্রেড সরেন’ বিচারের প্রতিশ্রুতি দিলেও কেন নিষ্পত্তি হয়নি। শুধু কী আদিবাসী সাঁওতাল, সংখ্যালঘু কিংবা অজো পাড়াগায়ের অধিবাসী বলে! ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী বলেছেন, যে দেশের সংখ্যালঘুরা যত বেশি স্বাধীন, মর্যাদা ও অধিকার ভোগ করে; সে দেশ তত সভ্য এবং উন্নত। আসুন, আমরা আমাদের কর্মের মধ্যে দিয়ে সংখ্যালঘুদের আস্থা ও বিশ^াস স্থাপনে যতœবান হই।
সাম্প্রতিক সময়ে ‘জাতিসংঘের নির্যাতন বিরোধী কমিটি’ আমার বাংলাদেশ সম্পর্কে ২০টি বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। উদ্বেগের অন্যতম জায়গা হচ্ছেÑ‘ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর ওপর সহিংসতার বিষয়ে কমিটি স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।… ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পুলিশ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য কারও সহিংসতার ঘটনাগুলোও তদন্ত এবং বিচারের কথা এ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে’ (প্রথম আলো ১০.৮.২০১৯)। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা যারা বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম যেন বিশ^াসে, আস্থায়, স্বপ্নে কিংবা দেশ গঠনে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ববান এবং একে-অপরের মধ্যে সৌভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক বিদ্যমান হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, ‘এই বাংলায় হিন্দু, মুসলমান, বাঙালি-নন বাঙালি, যারা আছে তারা আমাদের ভাই, তাদের রক্ষার দায়িত্ব আমাদের উপরে।’ রক্ষার মধ্যে নিহিত রয়েছে ন্যায্যতা, সত্য এবং ন্যায়বিচার। প্রত্যাশা করি, ঝর্না সরেন কিংবা আমাদের কন্যাদের ন্যায় বিচার প্রাপ্তিতে আর অপেক্ষা করতে হবে না; কারণ বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
মিথুশিলাক মুরমু : আদিবাসী বিষয়ক গবেষক ও কলামিস্ট।





Users Today : 20
Views Today : 22
Total views : 175466
