বাংলার রীতি-ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ শাড়ি। সুপ্রাচীন কাল থেকেই শাড়ি ভারতীয় উপমহাদেশে নারীদের প্রিয় অঙ্গভূষণ। গবেষকগণের মতে, প্রাকৃত শব্দ ‘সাট্টিকা’ থেকে শাড়ি শব্দের উদ্ভব। প্রাচীন বৌদ্ধ সাহিত্যেও ‘সাট্টিকা’ শব্দ পাওয়া যায়। প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রে আর প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে যে সেলাইবিহীন দীর্ঘ সূক্ষ্ম বস্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়, তা শাড়ি বলেই ধারণা জন্মায়। রামায়ণ-মহাভারতে তো শাড়ির আকছার ব্যবহার স্পষ্ট।
তবে বর্তমান সময়ে শাড়ির যে রূপ দেখা যায়, তা কালে কালে যোজন-বিয়োজনের পর বর্তমান রূপ লাভ করেছে। বাংলার লোক শিল্পের মতোই শাড়ির ধরন আর বয়নে বিবর্তন এসেছে বারবার। শাড়ি তো এ লোকশিল্পেরই একটি বিশেষ শাখা। শাড়ির মধ্যে জামদানি শাড়ি ভালোবাসেন না, এমন কেউই বোধহয় নেই।
কবি জসীমউদ্দীন তাঁর ‘পূর্ববঙ্গের নক্সীকাঁথা ও শাড়ী’ প্রবন্ধে তার সংগৃহীত কিছু শাড়ির নাম তুলে ধরেছেনÑকালপিন, বাঙ্গনীগরদ, জলেভাসা, একপাছুন্না, কাচপাইড়, জামদানি, জামের শাড়ি, রাসম-ল, সোনাঝুরি, কুসুমফুল, বাঁশিপাইড়, লক্ষ্মীবিলাস, কৃষ্ণনীলাম্বরী, মধুমালা, কুনারি, কলমিতলা…। একেকটি নাম যেন শাড়ির একেক রূপ।
ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বজয়ী ঢাকার শাড়ি বলতে সবার আগ্রে মসলিনের নামটিই চলে আসে। মসলিনের খ্যাতি তার সূক্ষ্মতায় মাঝে, মিহি বুনটে। নকশাদার এই বস্ত্র, মসলিনের ওপর এই জ্যামিতিক বুটিদার কারুকাজ-সাধারণভাবে একেই জামদানি বলা হয়, যা আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মসলিনের একটি ধরনই হলো জামদানি। মূলত এটি শাড়িকে বোঝালেও প্রকৃতপক্ষে ঐতিহ্যবাহী নকশাসমৃদ্ধ ওড়না, কোর্তা, পাগড়ি, রুমাল, পর্দা সবই জামদানির মধ্যেই পড়ে। যদিও বর্তমানে জামদানি নানা স্থানে তৈরি করা হয়, কিন্তু ঢাকাই এর আদি জন্মস্থান বলে গণ্য করা হয়। জামদানির নামকরণ নিয়েও বিভিন্ন মতবাদ প্রচলিত আছে। একটি মতে, ফার্সি ‘জামা’ ও ‘দানা’ শব্দের মিলনে এসেছে জামদানি শব্দটি। ‘জামা’ অর্থ কাপড় আর ‘দানা’ অর্থ বুটি। কাজেই জামদানি অর্থ হলো-বুটিদার কাপড়। আরেকটি মতে, ফার্সিতে ‘জাম’ অর্থ এক ধরনের উৎকৃষ্ট মদ আর ‘দানি’ মানে পেয়ালা। সে অর্থে সুরা পরিবেশনকারী সাকির পরনের পোশাক থেকে এসেছে জামদানি শব্দটি। মুসলমানরাই এ উপমহাদেশে জামদানির প্রচলন ঘটায়। অন্যদিকে কৌটীল্য ‘অর্থশাস্ত্র’, প্লিনির রচনা, চর্যাপদসহ বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থাদিতে বাংলার এ শিল্পের আরো প্রাচীনতার সাক্ষ্য বহন করছে। চতুর্দশ শতাব্দীতে বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা বাংলাদেশ পরিভ্রমণ করেন এবং সোনারগাঁও এলাকার সুতি বস্ত্রের প্রশংসা করেন। ঐতিহাসিক আবুল ফজলও ঢাকার মসলিনের প্রশংসা করেছেন। ঢাকাই মসলিনের স্বর্ণযুগ ছিল মোগল আমল। ‘মলমল খাস’ ও ‘সরকার-ই-আলী’ নামের মসলিন সংগ্রহের জন্য ‘দারোগা-ই-মলমল’ নামে উচ্চপদবির রাজকর্মচারী নিযুক্ত ছিল। এদের প্রধান কাজ ছিল মসলিন ও জামদানি তৈরির বিভিন্ন পদক্ষেপ লক্ষ রাখা। সে সময় ঢাকা থেকে প্রায় এক লাখ টাকা মূল্যের মলমল খাস মোগল দরবারে রফতানি হয়। ১৭৪৭ সালের হিসাব অনুযায়ী দিল্লির বাদশাহ, বাংলার নবাব আর জগত শেঠের জন্য প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকার জামদানি কেনা হয়।
জামদানির এ বিশেষ অলঙ্কৃত বয়ন কৌশল এখনো ধরে রেখেছেন ঢাকার অদূরে ডেমরা ও রূপগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পীরা। এ শিল্পকে ছড়ানোর চেষ্টায় এদের অন্যত্র নেয়া হয়েছিল, কিন্তু সুফল আসেনি। কারণ শীতলক্ষ্যার পানি থেকে উত্থিত বাষ্প সুতা প্রস্তুতি ও কাপড় বোনার অনুকূল। এর দ্বারা এটিই প্রতীয়মান হয় যে, পরিবেশ আর প্রকৃতির প্রভাব অন্যতম প্রধান শর্ত এ শিল্পের জন্য। আদি পিটলুম বা গর্ততাঁতে কাপড় বোনার সময়ই বয়নশিল্পীরা এর নকশাগুলো ফুটিয়ে তোলেন। আর এ নিপুণতার পেছনে তাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা তাত্ত্বিক শিক্ষা নেই, সমগ্র বিষয়টিই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা শ্রুতি ও স্মৃতিনির্ভর অনুশীলন! আর এ স্বাতন্ত্র্যই এদের তাঁতি থেকে বয়নশিল্পীতে পরিণত করেছে। আর এ অতুলনীয় বয়ন পদ্ধতির কারণেই জামদানি ইউনেস্কো কর্তৃক ‘ইনট্যাঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজ’-এর স্বীকৃতি পেয়েছে।
মূলত বাঁশ আর সামান্য কাঠের দ-ের সাহায্যে গড়ে ওঠা এক ছোট্ট তাঁতেই রচিত হয় এ অপূর্ব সৃষ্টি। দুজন কারিগর বসে এ কাজ করেন, যাদের মধ্যে সাধারণত একজন হন অভিজ্ঞ বা ওস্তাদ আর অন্যজন সাগরেদ, যিনি তাকে সহযোগিতার মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য হাতে-কলমে তৈরি হচ্ছেন। দুটো সুচের মতো বাঁশের কাঠিতে নকশার সুতা জড়ানো থাকে। সুচ দুটি দিয়ে অভ্যস্ত হাতের মাপের টানায় সুতার মধ্যে নির্দিষ্ট স্থানে রঙিন সুতা চালিয়ে দেয়া হয়। এরপর পাশের সুতার মাকু একজন তাঁতি পাশ থেকে অন্যজনের কাছে দিলে তা সেদিক থেকে বের করে দেয়া হয়। এভাবে ধীরে ধীরে তৈরি হয় জামদানি আর নকশা।
অতীতে তাঁতি নিজেই ছিলেন বয়নশিল্পী আর নকশাবিদ। রঙ, প্যাটার্ন, সুতার ধরন সবই হয়েছে তার একক সিদ্ধান্তে। তাদের মনের মাধুরী আর শিল্পিত মানসে গড়ে ওঠা পুরোনো জামদানিগুলো এখনো বিস্ময় আর গর্বের। বর্তমানে জামদানির পুরো নির্মাণকাজে বয়নশিল্পী বা তাঁতি ছাড়াও আরো দুটি দল কাজ করে-উপকরণের সঠিক প্রস্তুতি ও কাপড় বোনার সব প্রয়োজন গুছিয়ে দেয়ার জন্য একটি দক্ষ দল বা টিম থাকে, আবার তৈরি কাপড় বাজারজাতের জন্য থাকে আরেক দল। কখনো আবার একই দল এ ভাগ দুটোর দায়িত্ব পালন করে। তবে সবচেয়ে বড়ো কাজ ওই নকশা, যা জামদানির প্রাণ। এ নকশাগুলো আগে কোথাও খসড়া করা থাকে না বা এঁকে রাখাও হয় না। পুরোটাই থাকে তাঁতির মনে, মাথায় আর আঙুলের ডগায়। এ নকশার কিছু নামও আছে। যেমন-শাড়ির পাড়ে ময়ূর প্যাঁচ, কলমিলতা, কাটিহার, কলকা পাড়, কাঠ পাড়, পুইলতা ইত্যাদি; আবার জমিনে গোলাপ ফুল, জুই ফুল, পদ্ম ফুল, কলার ফানা, সাবু দানা ইত্যাদি। ছোট ছোট বিভিন্ন ফুলের কুঁড়ি তোলা জামদানি বুটিদার নামে পরিচিত। ছোট ছোট ফুল, ময়ূর বা লতাপাতার ডিজাইনগুলো যদি বাঁকা বা তেরছাভাবে সারিবদ্ধ থাকে, তবে তার নাম তেরছা জামদানি, আর এ ডিজাইন যদি হয় জালের মতো সমস্ত জমিনে, তবে তার নাম জালার নকশা। সারা জমিনে সারিবদ্ধ ফুলকাটা জামদানি হলো ফুলওয়ার আর ডোরাকাটা হলে ডুরিয়া। নাম বা নকশা যা-ই হোক, এগুলো ফুটিয়ে তোলার নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি নেই, শুধু আছে কিছু নির্দিষ্ট বুলি।
সুতা কাটার ওপর নির্ভর করে জামদানি মসলিনের সূক্ষ্মতা। সুতা কাটার উপযুক্ত পরিবেশ ভোরবেলা, যখন বাতাসের আর্দ্রতা বেশি থাকে। তাঁতিরা টাকু, বাঁশের ঝুড়ি, শঙ্খ ও পাথরের বাটি ব্যবহার করতেন। জামদানি তৈরির আগে তাঁতিরা সুতায় মাড় ও রঙ করে নিতেন। মাড় হিসেবে ব্যবহার হতো খই, ভাত বা বার্লি আর রঙ হিসেবে বনজ লতাপাতা ফুলের রঙ। বর্তমানে আধুনিক জিনিসপত্র আর কৃত্রিম রঙও ব্যবহার করা হয়। জামদানির প্রথম দিকে ধূসর জমিনে জাম নকশা করা হতো। পরে অন্য রঙের জমিনে নকশা তোলা হয়। ষাটের দশকে জমিনে লাল সুতার নকশা বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
জমিনের সুতার ঘনত্ব ও সূক্ষ্মতার চেয়ে নকশায় ব্যবহৃত সুতার আনুপাতিকভাবে ঘনত্ব বেশি আর সূক্ষ্মতা কমÑজামদানির একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। আবার কাপড়ের মানের ওপর নির্ভর করে নকশার সুতা জমিনের সুতার চেয়ে চার গুণ বেশিও হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে শাড়ির জমিনে অলঙ্করণের মোটিফগুলো খুবই জোরালো আর অলঙ্করণে ব্যবহৃত সুতার উপস্থিতি খুবই স্পষ্ট হয়ে থাকে। এসব নকশা আর মোটিফের উপস্থিতি আর বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা জামদানিকে ভৌগোলিক বিশেষত্বে চিহ্নিত করে দেয়া হয়। অতীতে জামদানি তৈরিতে জমিনের স্বচ্ছতা আর নকশা বা অলঙ্করণের ঘনত্ব খুব গুরুত্ব পেত। সে সময়ের মসলিন জামদানি কাপড়ের নিচে যদি হাতের তালু প্রসারিত করে রাখা হয়, দেখা যাবে, নকশার নিচের অংশটুকু ছাড়া বাকি জমিনের অংশের নিচের হাতের তালু প্রায় দৃশ্যমান।
জামদানি তৈরিতে সুতা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অতীতে কার্পাস তুলা থেকে হাতে কাটা সুতা ব্যবহার করা হতো। ১৮-১৯ শতকে উচ্চমানসম্পন্ন তুলা থেকে হাতে কাটা সুতার প্রচলন ঘটে। বর্তমানে মিলের সুতার সহজলভ্যতার কারণে হাতে কাটা সুতার প্রচলন নেই বলা যায়।
জামদানি শুরু থেকেই ছিল অভিজাত ঘরানার এবং এখনো তাই। বহু বাধা অতিক্রম করেও এ শিল্প এখনো টিকে আছে। একটা শাড়ি তৈরিতে যে দেড়-দুই মাস সময় লাগে, সে সময়ের উপযুক্ত মূল্য বা মজুরি তাঁতিরা পান না। মোগল আমলে যে পরিমাণ পৃষ্ঠপোষকতা এ শিল্প পেয়েছে, তার সঙ্গে তুলনা না করেও এটুকু বলা যায় যে, এ শিল্পের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ে আনুকূল্য প্রয়োজন। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এমনকি ক্রেতাপর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতা ও উন্নত মানসিকতা প্রয়োজন। এটা সম্ভব হলে জামদানি শিল্প আবার বিশ্বের বুকে নিজের ও দেশের পরিচিতি উজ্জ্বল করে তুলবে।
নাজিম উদ্দীন : গবেষক ও লেখক / সাপ্তাহিক সময়ের বিবর্তন





Users Today : 32
Views Today : 32
Total views : 186600
