যাকাত ইসলামের পাঁচটি মৌলিক ফরয ইবাদতের মধ্যে অন্যতম। ধনবান সম্পশালী মুসলমানদের বৎসর শেষে সম্পদের একটি নির্ধারিত অংশ আল্লাহর নির্দেশিত খাতে ব্যয় করার নামই যাকাত। যাকাত কুরআনের শব্দ। অর্থÑপবিত্রতা, প্রবৃদ্ধি এবং আধিক্য। পরিভাষায়Ñআল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে শরীয়ত নির্ধারিত পরিমাণ সম্পদের নির্দিষ্ট অংশ কুরআনে বর্ণিত আট প্রকারের কোন এক প্রকার লোক অথবা প্রত্যেককে দান করে মালিক বানিয়ে দেয়াকে যাকাত বলে।
ইসলামে নামাজের পরেই যাকাতের স্থান। পবিত্র কুরআনে সালাত কায়েমের সাথেই যাকাত আদায়ের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যাকাত আদায় করার মাধ্যমে সম্পদ পবিত্র হয় আর যাকাত অনাদায়ে সম্পদ অপবিত্র থাকে এবং যাকাত আদায় করার মাধ্যমে সম্পদে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়।
যাকাত কার ওপর ফরয?
ইসলামী শরীয়তে সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য বা যেকোনো একটির সমমূল্যের সম্পদ একবছর কারো নিকট আবর্তিত হলে শতকরা ২.৫০% সম্পদের মূল্যমান আল্লাহ তা’আলার নির্দেশিত আট প্রকার খাতে ব্যয় করাকেই যাকাত বলা হয়। সুতরাং যার কাছে সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য বা যে কোন একটির সমমূল্যের সম্পদ প্রয়োজনের অতিরিক্ত একবছর গচ্ছিত থাকবে তার ওপর যাকাত আদায় করা ফরয।
যাদের ওপর যাকাত ওয়াজিব
যাদের ওপর যাকাত ওয়াজিব তারা তিন প্রকার। যথা-১. নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া। ২. যাদের সম্পদের ওপর পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হয়েছে। তবে ফসলের ক্ষেত্রে এক বছর অতিবাহিত হওয়া জরুরি নয় বরং ফসলের যাকাতের সম্পর্ক ফসল পাকার সাথে। ৩. ফলের যাকাত ওয়াজিব হয় যখন তা পরিপক্কতা লাভ করে এবং খাওয়ার উপযোগী হয়।
যাকাতের গুরুত্ব ও ফজিলত
যাকাত ফরয হয় দ্বিতীয় হিজরীতে। আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে যাকাতের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য বহু আয়াত নাজিল করেছেন। ‘তোমরা নামায কায়েম কর, যাকাত আদায় কর এবং রুকু কর রুকুকারীদের সাথে’। (সূরা বাকারা : ৪৩) অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন-আর ধনীদের সম্পদে রয়েছে ভিক্ষুক এবং বঞ্চিতদের জন্য নির্দিষ্ট অধিকার। (মায়ারিজের ২৪-২৫)
হাদীস শরীফে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন-‘তাদের মধ্যে যারা ধনী তাদের থেকে গ্রহণ করা হবে। আর তাদের মধ্যে যারা দরিদ্র বা অভাবী তাদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।’ (বুখারী ১৪০১)
ইসলাম সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ধর্ম। একজনের হাতে বিপুল অর্থ-সম্পদ জমা হওয়াকে ইসলাম পছন্দ করে না। ইসলাম চায় ধনী-গরিব সবাই স্বাচ্ছন্দে জীবনযাপন করুক। তাই দরিদ্রের প্রতি লক্ষ্য রেখেই যাকাতের বিধান প্রবর্তন করা হয়েছে।
যাকাতের অর্থ ব্যয়ের খাতসমূহ
আল্লাহ তা’আলা কুরআনে যাকাতের অর্থ ব্যয়ে আটটি খাত উল্লেখ করেছেন। ১. ফকির ২. মিসকিন ৩. যাকাত আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারী ৪. যাদের চিত্ত অকর্ষণ প্রয়োজন ৫. দাসত্ব থেকে মুক্তি জন্য ৬. ঋণগ্রস্তদের ঋণ থেকে মুক্তির জন্য ৭. আল্লাহর পথে যারা জিহাদ করে তাদের জন্য ৮. মুসাফিরদের জন্য এই হলো আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। (সুরা তাওবা-৬০)
১. যারা অনেক দুঃখ-কষ্টে জীবনযাপন করে তাদেরকে যাকাত দেয়া। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে-‘তোমাদের মধ্যে যারা সম্পদশালী তাদের থেকে যাকাত নেয়া হবে, আর গরীবদের মাঝে বিতরণ করা হবে।’ ২. সহায়-সম্বলহীন, হৃতসর্বস্ব ব্যক্তি যার নিকট কিছুই নেই-এমন লোকদের যাকাত দেয়া। ৩. যারা যাকাতের টাকা বা সম্পদ উসুল করার কাজে নিয়োজিত তাদের বেতন-ভাতার কাজে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা। ৪. কৃতদাস বা কৃতদাসীকে মুক্ত করার জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করা। ৫. নওমুসলিম, অমুসলিম বা কাফের সম্প্রদায়ের জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করা। যাতে তারা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং তাদের অন্তরে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়। ৬. ঋণগ্রস্ত কোনো ব্যক্তিকে ঋণ থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা। ৭. ফি সাবিলিল্লাহ বলতে যারা আল্লাহর পথে বিভিন্নভাবে জিহাদরত তাদের সার্বিক সাহায্যার্থে যাকাতের অর্থ প্রদান করা। ৮. কোন মুসাফির ব্যক্তি পথিমধ্যে অর্থাভাবে বিপদগ্রস্ত বা অসহায় হয়ে পড়েছে। বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছার মতো কোনো সম্বল তার সঙ্গে নেই। এমতাবস্থায় যাকাতের অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করা বা লোকটির জন্য যাকাতের অর্থ গ্রহণ করা সম্পূর্ণ বৈধ।
যাকাত আল্লাহ কেন ফরজ করলেন?
আল্লাহর পক্ষ থেকে যাকাত ফরজ করার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়, দারিদ্র বিমোচন ও সামাজিক উন্নয়ন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, দারিদ্রের করণে তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। আমিই তাদের ও তোমাদের রিযিক দিয়ে থাকি। নিঃসন্দেহে তাদের হত্যা করা মহাপাপ। (বনী ইসরাঈল- ৩১)
দারিদ্রের করণে মানুষ নিজ সন্তানকেও হত্যা করতে পারে, তাই দরিদ্রমুক্ত করার জন্যই আল্লাহ তা’আলা যাকাত ফরজ করেছেন। ইসলামের যাকাত বিধান ধনী গরীবে মাঝে বৈষম্য দূরীকরণে ন্যায় ও ইনসাফপূর্ণ বন্টন ব্যবস্থা। যাকাত আদায়ে ধনী গরীবের মাঝে ভালোবাসা তৈরি হয়। অর্থনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টি হয়। সমাজ থেকে দারিদ্রতা দূর হয়।
মাওলানা আজিজুল হক : ইসলামী চিন্তাবিদ।





Users Today : 33
Views Today : 35
Total views : 180734
