বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশের বাজারে আপেল, মাল্টা, নাসপাতি, আঙুর, আনার, ডালিম, পামসহ বিদেশি ফলের আধিপত্য ক্রমশই বাড়ছে। কিন্তু বিদেশ থেকে আমদানীকৃত এসব ফল কতটুকু বিষমুক্ত?
পর্যবেক্ষনে দেখা যায়, অনেক বিদেশি ফল মাসের পর মাস পড়ে থাকলেও পচে না। সবুজ আপেল দু’টুকরো করে মাসখানেক রেখে দেয়ার পরও পচন ধরেনি। নরম তবে প্লাস্টিকের মতো হয়ে গেছে। পচনশীল ফলের এমন পরিবর্তন প্রায় অসম্ভব। শুধু আপেল নয়, মাল্টা, নাসপাতি, আঙুর, আনার, পামসহ অনেক বিদেশি ফলই দীর্ঘদিনে পচে না। রংয়েরও তেমন কোনো পরিবর্তন হয় না। সবক’টি ফলের ভেতরের অংশও ভালো আছে। বিদেশি সাগর কলারও একই অবস্থা। এর কারণ কি? এতে প্রশ্ন উঠেছে, ফলের নামে আমরা আসলে কি খাচ্ছি?
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতিদিন দেশে গড়ে প্রায় ১৫ লাখ ৯০ হাজার কেজি ফল আমদানি হচ্ছে। সব মিলে বছরে অন্তত ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার ফল আসছে। বিদেশি ফলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় আপেল, আঙুর, কমলা, মাল্টা, নাশপাতি ও ডালিম। ফল আমদানি তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রতিদিন দেশে গড়ে ১২ লাখ ৭০ হাজার কেজি ফল আমদানি হয়েছে। পরের বছর এর পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ৭৭ হাজার কেজি, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ২৪ শতাংশ বেশি। সর্বশেষ অর্থবছরেও আমদানি হয়েছে প্রায় ১৬ লাখ কেজি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিদেশি ফল দীর্ঘদিনেও পচছে না, অথচ দেশি ফল পচে যাচ্ছে কয়েক দিনেই। দেশের আম বাজারে আসার আগে তোড়জোড় করা হয় ফরমালিন বা কেমিক্যাল মুক্ত রাখার জন্য। প্রশাসন এ নিয়ে কঠোর নজরদারি শুরু করে। যার ফলে মৌসুমে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আম চাষীরা। অথচ সারা বছরই বিদেশি আমের জমজমাট বাণিজ্য হলেও তা কেমিক্যাল-মুক্ত কিনা দেখা হয় না। এতে কি পরিমাণ প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করা হয়েছে- তা মানব¯^াস্থ্যের জন্য কতটা সহনীয় অথবা অন্য কোনো উপাদান প্রয়োগ করা হয়েছে কি-না তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় না। কারণ এর জন্য নেই মানসম্মত ল্যাবরেটরি এবং দক্ষ পরীক্ষক ও পর্যাপ্ত জনবল। ফলে সীমিত জনবল ও মানহীন ল্যাবরেটরি দিয়ে এত বিপুল পরিমাণ আমদানি ফলের মান যাচাই কতটা সম্ভব?
এ বিষয়ে মান নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বরত প্রতিষ্ঠান উদ্ভিদ সংগনিরোধ বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক (আমদানি, রফতানি ও পরীক্ষাগার) ও কৃষিবিদ ড. আজহার আলী জানান, ‘আমাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া দেশে কোনো পণ্য ঢোকে না। তবে উদ্ভিদ ও উদ্ভিদজাত পণ্যের আমদানির ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যাতে বহির্বিশ্ব থেকে কোনো রোগ ও পোকা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে তা জোর দিয়ে দেখা হয়। কিন্তু ওই ফল আইটেমে প্রিজারভেটিভ বা অন্য কিছু আছে কিনা তা পরীক্ষা করা হয় না। কারণ রফতানিকারক দেশই ওই পণ্যের একটা ফাইটোস্যানিটারি সার্টিফিকেট (পিসি) দিয়ে থাকে। সেখানে প্রিজারভেটিভের সহনীয় মাত্রার কথাই উল্লেখ থাকে। কিন্তু কি পরিমাণ ব্যবহার করা হয়েছে এবং তার ম্যাক্সিমাম রিসিডিউ লিমিট (এমআরএল) সহনীয় আছে কিনা সেটা নানা সীমাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সম্ভব হয়ে উঠে না।
কৃষি স¤প্রসারণ অধিদফতরের সরেজমিন বিভাগের সাবেক পরিচালক ও কৃষিবিদ আবদুল মান্নান জানান, প্রতিটি চালানের প্রতিটি নমুনায় প্রিজারভেটিভের ম্যাক্সিমাম রিসিডিউ লিমিট (এমআরএল) ব্যবহারের মাত্রা দেখা সম্ভব হয় না। কারণ আমাদের মানসম্মত পরীক্ষাগার ও তাতে ব্যবহার্য আধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ যন্ত্রপাতির যথেষ্ট অভাব রয়েছে।
ফলের আড়ত ও বাজারে অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বিদেশি ফল তাজা রাখার উদ্দেশ্যে ফরমালিন, আর পাকানো ও উজ্জ্বল করার জন্য কারবাইড ব্যবহার করে থাকে। এ সব কেমিক্যাল এক ধরনের বিষ, যা অল্পমাত্রায় খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু হবে না; কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে বলে চিকিৎসকদের অভিমত। এ ছাড়া বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে রফতানিকারক দেশগুলো যখন ফলগুলো প্যাকেট বা মোড়কজাত করে কন্টেইনারে ভরে বাংলাদেশে পাঠায়, তার আগে পচনরোধে ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন মাত্রার প্রিজারভেটিভ এবং ফরমালিন। বিশেষ করে বাংলাদেশি আমদানিকারকের চাহিদা অনুযায়ীই বিদেশি ফল সরবরাহকারীরা বিভিন্ন মাত্রার কেমিক্যাল ব্যবহার করে থাকে। যাতে দীর্ঘদিনেও এ সব ফল সংরক্ষণ করা যায়। এতে ফল থাকে তাজা। মনে হয় এই মাত্র গাছ থেকে পাড়া হয়েছে। চেহারা থাকে চকচকে। ক্রেতারা সহজেই এ ধরনের ফল কিনতে আকৃষ্ট হন। বিদেশি এ সব ফল খালাস পর্যায়ে সমুদ্র, স্থল বা বিমানবন্দরের কোথাও মান যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না। ফলের চালান যে পথেই আসকু না কেন তা বাংলাদেশের বন্দরে আসার পর রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আমদানিকারককে ই-মেইলে একটি নোট অব ডিসেন্ট (এনওসি) দেয়। পাশাপাশি সে দেশের উদ্ভিদ ¯^াস্থ্য সুরক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটি ‘¯^াস্থ্য সনদপত্র’ও দেয়া হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের (আমদানি, রফতানি ও ল্যাবরেটরি) দায়িত্বরত কর্মকর্তারা ওই ¯^াস্থ্য সনদ দেখেই মাল খালাসের সুপারিশ করেন। অনেক ক্ষেত্রে ফল বন্দরে পৌঁছার আগেই সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় সনদ সংগ্রহ করা হয়।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-এর সার্টিফিকেশন অব মার্কস (সিএম) উইংয়ের পরিচালক প্রকৌশলী এসএম ইসহাক আলী বলেন, বিএসটিআইএর মান যাচাইয়ে বাধ্যতামূলক ১৫৪ পণ্যের তালিকায় নেই আমদানিকৃত কোনো ফল। তাই বিএসটিআই ফিনিশড পণ্য ছাড়া কোনো উদ্ভিবদজাত পণ্য কোনো বন্দরেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে না।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের এমএ সোবাহান বলেন, আমদানিকারক এলসি খোলার পর রফতানিকারক তা নিশ্চিত হয়ে মাল জাহাজিকরণের পর বন্দরে ভেড়ার বিষয়টি এনওসি পাঠিয়ে নিশ্চিত করে। তারা একটি ¯^াস্থ্য সনদও পাঠায়। কাষ্টমস ও উদ্ভিব সঙ্গনিরোধ বিভাগের কর্মকর্তারা তা দেখেই মূলত কনসাইনমেন্ট খালাসের নির্দেশ দেয়। এরপরই বিদেশি আমদানি ফল ব্যবসায়ীরা তাদের গন্তব্যে নিয়ে যায়।




Users Today : 7
Views Today : 7
Total views : 186519
