বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটনা তথা ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস, স্বতন্ত্র ভাষা, জীবনদর্শন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক, কৃষিনির্ভর জীবন, সামষ্টিক সামাজিক বন্ধন, লোককথা, গান ও নৃত্য সাঁওতাল সংস্কৃতিকে দিয়েছে নিজস্ব স্বতন্ত্রতা। এই ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো দাশাই (Dasai Dance) নাচ। এটি কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; বরং সাঁওতাল সমাজের ঐতিহাসিক স্মৃতি, ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক অনুভূতি, সামষ্টিক পরিচয় এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ঐতিহ্য বহন করার একটি মাধ্যম। সাঁওতালদের সংস্কৃতি বুঝতে হলে দাশাই নাচকে শুধু মঞ্চে পরিবেশিত একটি লোকনৃত্য হিসেবে বিবেচনা করলে হবে না, এর সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে যুক্ত লোকবিশ্বাস, আঞ্চলিক বৈচিত্র্যতা, সামাজিক অভিজ্ঞতা। সাঁওতালরা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ আদিবাসী জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর, রংপুর, গাইবান্ধা, ঠাকুরগাঁও, জয়পুরহাট ও আশপাশের অঞ্চলে তাদের বসবাস রয়েছে। ভারতের ঝাড়খ-, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ওডিশা ও আসামেও উল্লেখযোগ্য সাঁওতাল জনগোষ্ঠী বসবাস করে। ভুটান, নেপালেও সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছেন।
দাশাই নাচের ইতিহাস নিয়ে সাঁওতাল সমাজে প্রচলিত লোককথা ও বিশ্বাস বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। দাশাই নাচের উৎপত্তি সম্পর্কে প্রচলিত একটি ব্যাখ্যায় বহিরাগত শক্তির সঙ্গে আদিবাসীদের সংঘাত, আত্মপরিচয় রক্ষা এবং প্রতিরোধের স্মৃতি উঠে আসে। কোনো কোনো লোককথায় এই নাচকে অতীতের বিপর্যয় ও সংগ্রামের স্মৃতি বহনকারী সাংস্কৃতিক প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়। তবে এসব কাহিনীকে সর্বজনস্বীকৃত প্রমাণিত ইতিহাস হিসেবে উপস্থাপন না করে সাঁওতালদের মৌখিক ঐতিহ্য ও লোকবিশ্বাসের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
১. কিংবদন্তি অনুযায়ী, বহু বছর আগে সাঁওতাল সমাজে ‘হুদুড় দুর্গা’ নামে এক অত্যন্ত পরাক্রমশালী এবং ন্যায়পরায়ণ রাজা (কোনো কোনো বর্ণনায় সাঁওতাল বীর) ছিলেন। বহিরাগত আর্যরা যখন সাঁওতালদের রাজ্য আক্রমণ করে, তখন তারা কোনোভাবেই হুদুড় দুর্গাকে যুদ্ধে পরাজিত করতে পারছিল না। তখন আর্য শাসকেরা এক ছলনার আশ্রয় নেয়। তারা এক রূপবতী নারীকে হুদুড় দুর্গার কাছে পাঠায় এবং কৌশলে তাকে হত্যা করে। রাজাকে হারিয়ে সাঁওতাল সমাজ সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত ও নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে। আর্যরা তখন সাঁওতাল নারী ও শিশুদের বন্দী করে এবং পুরুষদের ওপর অকথ্য নির্যাতন শুরু করে। এই চরম সংকটের সময়ে সাঁওতালদের প্রধান দুই গুরু ‘বুয়াং গুরু’ এবং ‘কামরু গুরু’ আদিবাসীদের অস্তিত্ব রক্ষায় এগিয়ে আসেন। শত্রুসেনাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিজেদের বন্দী নারীদের খুঁজে বের করতে এবং হারিয়ে যাওয়া সমাজকে আবার ঐক্যবদ্ধ করতে তারা এক অভিনব বুদ্ধি উদ্ভাবন করেন। সাঁওতাল পুরুষেরা নিজেদের চেনা রূপ লুকিয়ে নারীর ছদ্মবেশ ধারণ করেন। মাথার চুলে ময়ূরের পালক গোঁজেন, পরনে শাড়ি বা ধুতি জড়িয়ে হাতে তুলে নেন ‘বুয়াং’ (লাউ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি এক বিশেষ বাদ্যযন্ত্র) এবং কাঁসার থালা। এরপর তারা ছদ্মবেশে দল বেঁধে গ্রামে গ্রামে ঘুরে নাচ ও গান শুরু করেন। এই নাচের কৌশলে তারা আসলে শত্রুর দুর্গ পর্যবেক্ষণ করতেন এবং ঘরে ঘরে গিয়ে সংকেত দিতেন যে, সাঁওতালরা এখনও ফুরিয়ে যায়নি, তারা আবার জেগে উঠবে। এই ছদ্মবেশী অনুসন্ধান ও প্রতিরোধের নাচই কালক্রমে ‘দাশাই নাচ’ নামে পরিচিতি পায়।
২. দাশাই উপলক্ষ্যে আরেকটি কাহিনী প্রচলিত আছে। বলা হয়, এক রাজা ছিল। যার নাম দুগগা। প্রচণ্ড শক্তিশালী এই রাজা নানা রকম রূপ ধারণ করতে পারত। কখনও জানোয়ারের ভেক আবার অনাবৃষ্টির সময়ে মেঘ হয়ে বৃষ্টিপাতও ঘটাত এই রাজা। তবে রাজা দুগগা মহিলাদের খুব সম্মান করতেন। একবার দুই মহিলাকে বলা হয় রাজার সঙ্গে সম্মুখ সমরে যেতে। যুদ্ধে দু’জনই পরাজিত হোন এবং রাজা তাদের বন্দী করেন। অতঃপর তিনি তাদের মধ্যে দিবি নামের মহিলাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। শর্ত হিসেবে ঠিক হয় একদল মহিষের মধ্যে রাজা মহিষাসুর সেজে মিশে যাবেন, সেখান থেকে দিবি তাকে চিহ্নিত করবে। এদিকে দিবি মনে মনে ঠিক করেছিল, সেদিন ওই ভিড়ের মধ্যে থেকেই সে রাজাকে মেরে ফেলবে। এরপর দুগগা তার বিশেষ ক্ষমতাবলে মহিষের রূপ ধারণ করে। আর ওই ভিড়ের মধ্যে দুগগাকে চিনে ফেলে দিবি এক কোপে তার শিরচ্ছেদ করে। এরপর থেকে দিবি গ্রামে দেবী নামেই পরিচিত হয়। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাতকারণ বশতঃ সে একের পর এক পুরুষকে হত্যা করে। দেবীর ক্রোধ থেকে রক্ষা পেতেই তখন পুরুষেরা মহিলাদের পোশাক পরে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। এখান থেকেই দাশাইয়ের যাত্রা শুরু।
৩. হারিয়ে যাওয়া ভাই-বোনদের সন্ধান: অন্য একটি প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী, আর্যদের আক্রমণের সময় সাঁওতালদের বীর যোদ্ধা ‘দুর্গা’ এবং ‘আয়নম’ ও ‘কাজল’ নামের দুই সাঁওতাল রমণী অপহৃত বা নিখোঁজ হোন। তাদের খোঁজে সাঁওতাল পুরুষেরা শত্রুর নজর এড়াতে নারীদের ছদ্মবেশ ধারণ করেন। তারা ছদ্মবেশে গ্রামে গ্রামে, ঘরে ঘরে ঘুরে গান গেয়ে ও নেচে তাদের প্রিয়জনদের খোঁজ করতে থাকেন। সেই ছদ্মবেশী অনুসন্ধানের স্মৃতিকেই ধরে রেখেছে এই ঐতিহ্যবাহী নাচ।
দশাই নাচের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো—এটি সাধারণত পুরুষদের পরিবেশিত নৃত্য। নৃত্যশিল্পীরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরেন, মাথায় ময়ূরের পালক ধারণ করেন এবং ঢোলের তালে নাচ পরিবেশন করেন। কোনো কোনো অঞ্চলে মুখোশ, ছদ্মবেশ কিংবা নারীসুলভ পোশাক ব্যবহারের রীতিও দেখা যায়। তবে পরিবেশনা ও সাজসজ্জার ধরন অঞ্চলভেদে ভিন্নতা চোখে পড়ে।
দাশাই নাচের সময় সাঁওতাল পুরুষেরা যে গান গেয়ে থাকেন, তার সুর অত্যন্ত বিষাদময়। গানে গানে তারা তাদের হারিয়ে যাওয়া গুরু এবং অতীত গৌরবকে স্মরণ করেন। তেমনই একটি জনপ্রিয় আদি গান নিচে দেওয়া হলো—
‘হায় রে হায় রে—
বুয়াং গুরু হো ছাতমদারে,
কামরু গুরু হো লাড়ে বাড়ে।
দেশ দো ললচপচ, দিশম দো ললচপচ,
বুয়াং গুরু হঁ বায়নুকান,
কামরু গুরু হঁ বায়নুকান,
নাকারে বোন নামকিন হায় রে হায়…’
বাংলা ভাবার্থ: হায় রে, আফসোস! আমাদের পরম আশ্রয় বুয়াং গুরু যেন ছাতার মতো বিশাল গাছ, আর কামরু গুরু হলেন বটবৃক্ষের মতো ছায়াদানকারী। আজ আমাদের পুরো দেশটা জ্বলছে, চারদিকে শুধু অশান্তি আর হাহাকার। এমন বিপদের দিনে আমাদের রক্ষাকর্তা বুয়াং গুরুও নেই, আমাদের পথপ্রদর্শক কামরু গুরুও আজ বেঁচে নেই। হায় রে, এই ঘোর সংকটে আমরা এখন তাদের কোথায় খুঁজে পাব…।
তথ্যসূত্র:
১. ICH Pedia Bangladesh — Dasain Dance
২. Daricha Foundation — Santals: নৃত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
৩. Santals Celebrate the Seasons — Dasai
৪. The History of Santal Community in Bangladesh





Users Today : 43
Views Today : 58
Total views : 188004
