ফুটবল বিশ্বকাপের বাঁশি বেজে উঠলে সারাবিশ্ব মেতে উঠে আনন্দে। বাংলাদেশেও এর বাইরে নয়। যদিও বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ফুটবল খেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ এখনো পায়নি। বিশ্বকাপ শুরু হলেই প্রিয় দলের জার্সি নেওয়া, পতাকা টাঙানোসহ বিভিন্ন আয়োজনে আনন্দে মেতে উঠে বাংলাদেশ। কিন্তু এই আনন্দের পাশাপাশি ভিন্ন চিত্রও চোখে পড়ে বাংলাদেশে। আবেগের বসে আত্মহত্যা, সংঘর্ষ, মারামারি, সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা প্রায় খবরের কাগজে পাওয়া যায়।
এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ১৪ জনের মৃত্যু এবং শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এসব মৃত্যু ও আহত কোনোভাবেই স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। খেলাকে খেলার জায়গায় রাখতে হবে। আনন্দ-বিনোদনের মাধ্যমে উপভোগ করতে হবে। অতিরিক্ত আবেগ বা অতিরিক্ত ট্রল করা কখনোই কাম্য নয়। কেননা এই ট্রল বা অতিরিক্ত আবেগই আনন্দ-বিনোদন থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিচ্ছেদ ঘটায়। প্রতিটা খেলায় জয়-পরাজয় থা,আর এখানেই খেলার সৌন্দর্য এবং আনন্দ। এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা চোখে পড়ে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। যেমন―
পতাকা টাঙাতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট এবং মৃত্যু। বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হলেই প্রিয় দলের পতাকা টাঙানো প্রতিযোগিতা দেখা যায়। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত। কে কত বড়ো পতাকা টাঙাতে পেড়েছে! পত্রিকায় মাঝে মাঝে দেখা যায়―জমি বিক্রি করে দীর্ঘ পতাকা টাঙানোর খবর। কেউ জমানো টাকা দিয়ে পতাকা তৈরি করে এবং টাঙায়। অতিরিক্ত আবেগ নিয়ে অসাবধানতা ও অসচেতনতার ফলে পতাকা টাঙাতে মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। যা কখনোই কাম্য নয়। এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আবার ভক্তদের মধ্যে তীব্র ট্রল, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, বাকবিতণ্ডা, সংঘর্ষ, সহিংসতা দেখা যায় । বিশেষ করে বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে অত্যন্ত আবেগীয় ও গোঁড়ামিভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায় । সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি চায়ের দোকান পর্যন্ত একে অপরকে বিদ্রুপ করে বা ট্রল করে। এই ট্রল থেকে কথা-কাটাকাটি, এরপর লাঠিছোঁড়া, ছুরিকাঘাত বা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ নেয় এবং সর্বশেষ মৃত্যুসহ আহতের শিরোনামে ছেয়ে যায় পত্রিকার পাতা। আবার এই অতিরিক্ত ট্রল বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করার খবরও পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়। আমাদের উচিত খেলাকে খেলার মাঠ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ রাখা। এর থেকে আনন্দ নেওয়া, বিনোদন নেওয়া। এর ফলে মস্তিষ্কের রিফ্রেশ হবে। কিন্তু যা করা হয় তা আরো বেশিই মানসিক চাপের সৃষ্টি করে। খেলা থেকে বিনোদনের পরিবর্তে চাপটাই বেশি হয়ে যায়।
এছাড়া হৃদরোগ মৃত্যু। কিছু উত্তেজনা ম্যাচের চরম উত্তেজনাকর মুহূর্তে (যেমন: টাইব্রেকার বা অতিরিক্ত সময়) বা প্রিয় দল হেরে গেলে ভক্তদের প্রচ- মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। এর ফলে অনেক বয়স্ক বা সংবেদনশীল সমর্থক হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। আবার জয় হলে বিজয় মিছিল ও সড়ক দুর্ঘটনা। প্রিয় দল জিতলে বা ম্যাচ শুরুর আগে মোটরসাইকেল শোডাউন ও আনন্দ মিছিল বের করা হয়। অতিরিক্ত গতি, হেলমেট না পরা ও অসাবধানতার কারণে এসব সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি। এসব মোটেও কাম্য নয়। কি থেকে কি করা আর কি উচিত নয়, এর থেকে বেড়িয়ে গিয়ে গেছে সবাই। যার ফলে এইসব অপ্রত্যাশিত খবর চোখে ভাসছে।
অবশ্য এ দেশে বিশ্বকাপ নিয়ে সহিংসতা ও মৃত্যু এবার নতুন নয়। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও একই ধরনের সহিংসতায় দেশে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের বিশ্বকাপেও পতাকা টানাতে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল।
কোনো বিষয়ে অতিরিক্ত কোনো কিছুই কখনো ভালো কিছু নিয়ে আসে না। ইতিবাচকতা দেখা যায় না। সেটার সম্ভাবনাও নেই। বিশ্বকাপ ফুটবল পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো ক্রীড়া উৎসব। এর সাথে যেমন জড়িত থাকে আনন্দ, তেমনি আছে বেদনা এবং আছে বিনোদন। সকল খেলায় জয়-পরাজয় থাকে। জয়-পরাজয় না থাকলে খেলার কোনো আনন্দই পাওয়া সম্ভব নয়। খেলা মূলত বিনোদনের জন্য। মানুষের মনকে আনন্দ দেয়, মানসিক ক্লান্তি ও মানসিক চাপ দূর করে এবং মনোযোগ আকর্ষণের মাধ্যমে ক্ষণিকের জন্য দৈনন্দিন ব্যস্ততা থেকে আনন্দময় অনুভূতির যোগান দেয়। প্রতি চার বছর অন্তর বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন করা হয়। সারাবিশ্বের মানুষ উপভোগ করে, আনন্দ, বিনোদনের মাধ্যমে। কিন্তু বাংলাদেশে আনন্দের পাশাপাশি দেখা যায় এক ভিন্ন চিত্র। এর থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। এর থেকে বেরিয়ে আসা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা শিখতে হবে। আবেগ দ্বারা পরিচালিত হলেই ক্ষতি। বাস্তবতা ও আবেগ ভিন্ন বিষয়। খেলা নিয়ে অতিরিক্ত মাতামাতি করার সংস্কৃতি থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে। অন্য দেশের অন্য দলের খেলা নিয়ে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ কখনো সুস্থ মানসিকতার পরিচয় বহন করে না। আবার অন্যকে অহেতুক বিষয় নিয়ে ট্রল করা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অন্য দেশ বা দলের খেলা নিয়ে এই অতিরিক্ত মাতামাতি মাধ্যমে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র সবারই ক্ষতি।
যারা খেলে তারা তাদের মতো ঠিকই থাকে, অহেতুক বিশৃঙ্খলা করে ক্ষতি শুধু নিজেদের। এবারের খেলার কিছু বিতর্কিত বিষয় আছে। যেমন-রেফারিদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অনুরোধে দেশটির তারকা ফুটবলার ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ডের শাস্তি এক বছর স্থগিত, ফিফার নিয়ম ভেঙে মাঠে বিতর্কিত ব্যানার প্রদর্শন করেও আর্জেন্টিনার শাস্তি না পাওয়া ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে বিশ্বকাপ ফুটবলের।
এছাড়া এই খেলার মাধ্যমে আমাদের দেশের না আছে রাজনৈতিক কোনো লাভ, না আছে অর্থনৈতিক কোনো লাভ। যারা আয়োজন করে এবং যারা খেলে তাদেরই সবকিছু।
এবারের বিশ্বকাপে ফিফার আয় ১৫ বিলিয়ন বা দেড় হাজার কোটি ডলার আয় করেছে। বাংলাদেশি মূদ্রায় ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে বিশ্বকাপ শুরুর দিকে ফিফা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল ১১ বিলিয়ন ডলার। এই অতিরিক্ত আয় এসেছে আতিথেয়তা ও টিকিট বিক্রি করে। এবারের বিশ্বকাপে টিকিটের দাম শুরু থেকেই ছিল আকাশছোঁয়া। এর জন্য ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল।এরপরও টিকিটের দাম উচ্চ মূল্যেই ছিল।
বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলায় এই দাম আরো উচ্চ মাত্রায় পৌঁছায় । শেষ মুহূর্তে এই ম্যাচের টিকিট বিক্রি হয়েছিল ১০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৬০ হাজার ডলারে। সবচেয়ে কম দামের টিকিটও প্রায় ১০ হাজার ডলারে উঠে যায় । স্টেডিয়ামের আপার ডেকের কর্নার অংশের টিকিটের দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ লাখ টাকা। মাঠের আরও কাছাকাছি বসে খেলা দেখতে গুনতে হচ্ছে প্রায় ১৬ হাজার ডলার। আর বিশেষ হসপিটালিটি আসনের দাম পৌঁছেছে প্রায় ৬০ হাজার ডলারে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭৪ লাখ টাকা।
টিকিট পুনর্বিক্রয় প্ল্যাটফর্ম সিটগিক ও স্টাবহাবেও একই চিত্র। সেখানে আপার ডেকের টিকিটের দাম শুরু হয়েছে প্রায় ১০ হাজার ডলার থেকে। লোয়ার বোলের কিছু আসনের দাম উঠেছে ৩৫ হাজার ডলারের কাছাকাছি।
বিশ্বকাপ ফুটবল আমাদের আনন্দের অন্যতম উৎস, বিভেদের নয়। সমর্থন থাকবে, বিতর্ক থাকবে, আবেগও থাকবে। আবার তার সীমাবদ্ধতাও থাকতে হবে। অতিরিক্ত নয়। আনন্দ-উদযাপন হতে হবে সংযত, নিরাপদ ও সম্মানজনকভাবে। বিশ্বকাপকে ঘিরে আমাদের উচ্ছ্বাস যেন কারো জীবনের ক্ষতি, সম্পর্কের ভাঙন বা সামাজিক বিভাজনের কারণ না হয়। বিশ্বকাপ ফুটবলের আনন্দ, আনন্দের মধ্যেই রাখতে হবে। যেন কোনো ভাবেই শোকে পরিণত না হয়।





Users Today : 31
Views Today : 56
Total views : 184360
