বিগত ১৪ জুন মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মভিটা সাগরদাঁড়ি গ্রাম পরিদর্শনের সুযোগ হয়েছিলে; ইতিমধ্যেই তাঁর দ্বিশত জন্মবাষির্কী আড়ম্বরের সাথে পালিত হয়েছে। শহর থেকে দূরে এক প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যে নিজের অবস্থানকে পোক্ত করেছেন। একাবিংশ শতাব্দীতেও এলাকার প্রতি যে অবহেলা আর উপেক্ষা রয়েছে, পেছনের কথা একটু চিন্তা করলেই উপলব্ধিয়। মহাকবি মাইকেল মধুসুদন দত্ত ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি বর্তমান যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জন্ম দিন-ক্ষণকে স্মরণীয়-বরণীয় করতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বছরান্তে জানুয়ারিতে মধুমেলা আয়োজিত হয়ে থাকে। এটি অত্র অঞ্চলের হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মিলনমেলা। লক্ষ্যণীয় যে, কবির দ্বিশত বর্ষ জন্মজয়ন্তী উদ্যাপিত হয়েছে ঠিকই কিন্তু ক্রমেই নামটি সংক্ষিপ্ত হতে চলেছে। এ বিষয়ে একজন ইতিহাসবিদের সাথে কথোপকথন হচ্ছিল—তিনি এদেশের অতীতের ঘটনা টেনে বলে বুঝাতে চাইলেন যে, এটি কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা নয়; প্রত্যাশিতই।
গোপালগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্রে খ্রিষ্টধর্মের ধর্মযাজক সাধু মথুরানাথ বোস (১৮৪৩-১৯০১) প্রায় পৌনে দু’শ বছর পূর্বে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কৃষি ব্যাংক, ডাকঘর, বিচারালয়সহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয়েছিল—
মথুরানাথ ইনস্টিটিউট। গোপালগঞ্জের আরেকটি প্রতিষ্ঠান সীতানাথ ইনস্টিটিউট। ১৯৫০ সালে দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করে নামকরণ করা হলো—সীতানাথ-এর ‘এস’ এবং মথুরানাথ ‘এম’; অর্থাৎ ‘এস এম মডেল গর্ভমেন্ট হাই স্কুল’। কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায় খ্রিষ্টান যাজক মথুরানাথ পুরো নামটি। আরেকটি ঘটনা—
১৯০৮ সালে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাপ্টিষ্ট মিশনারী ডা. সিসিল সাইলাস মীড’র প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ওড়াকান্দী মীড উচ্চ বিদ্যালয়’। শতবর্ষী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির স্বপ্নদ্রষ্টা ডা. সিসিল সাইলাস মীড’র নামটিরও সংক্ষিপ্ত সংস্করণ চোখে পড়ে। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো মাইকেল মধুসূদন দত্ত’র নামও এম.এম. ডি অক্ষরে মিলিয়ে যেতে পারে।
মাইকেল মধুসুদন দত্তের বাবা রাজনারায়ণ দত্ত ও মা জাহ্নবী দেবী। বাবার ইচ্ছা ছিলো মুধুসুদন যেন তাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। আইনজীবী বাবার ইচ্ছাতেই কৈশোরেই মধুসুদনকে বাড়িতে বাংলা, ফার্সী ও সংস্কৃতের প্রাথমিক পাঠ দেন। ভাষা শিক্ষার হাতেখড়ি তাকে উজ্জীবিত করেছে, পরবর্তীকালে তিনি জার্মান, ইটালিয়ান, তামিল ও তেলেগু ভাষাও রপ্ত করেছিলেন। বহুভাষাবিদ হিসেবেও খ্যাতি পেয়েছিলেন। মাত্র ৭ বছর বয়সে তার পরিবারের সাথে তিনিও কলকাতা গমন করেন; খিদিরপুর স্কুলে বছর দুয়েক পড়ার পর ১৮৩৩ সালে হিন্দু কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন।
এখানে থাকতেই তার ইংরেজি সাহিত্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষার সাথে মেলবন্ধনের সুযোগ ঘটে এবং স্বকীয় প্রতিভার বিকাশ ঘটে। অসাধারণ ক্ষুরধার সম্পন্ন মাইকেল বরাবরই বৃত্তি পেয়েছেন।
অধ্যয়নের সময়কালেই কবিতার দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং তার কবিতা Bengal Spectator, Literary Gleamer, Calcutta Library Gazette, Literary Blossom, Comet পত্রিকায় প্রকাশিত হতো। মধুসূদন দত্ত খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণে উদ্যেত হলে কৃষ্ণ মোহন ব্যান্যার্জী তাকে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। ১৮৪৩ সালে ৯ ফেব্রুয়ারি প্রায় ১৯ বছর বয়সে এ্যাংলিকান চার্চের Old Mission Church (RN Mukherjee Road, Dalhousie area থাকা চার্চে পাদ্রী ডিলট্রি (Archdeacon Thomas Dealtry) কর্তৃক দীক্ষিত হয়েছিলেন। এই গির্জাটি ১৭৭০ সালে একজন সুইডিশ মিশনারী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। এটি কলকাতার সবচেয়ে পুরোনো প্রটেষ্ট্যান্ট গির্জাগুলোর একটি। পুরোহিত ডিলট্রি কর্তৃক বাপ্তিষ্মের প্রাক্কালে তিনি
‘মাইকেল’ নামটি গ্রহণ করেন। তবে এই নামটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অপর তথ্যটি হলো—১৮৪৮ সালে বিবাহ নিবন্ধনের সময় তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মাইকেল নামটি ব্যবহার করেন। অনুমিত হয় যে, তিনি নিজেই মাইকেল নামটি পবিত্র বাইবেল থেকে খুঁজে নিয়েছিলেন। মাইকেল নামটি পবিত্র বাইবেলের প্রধান স্বর্গদূত মাইকেল’র নাম থেকে এসেছে।
খ্রিষ্টানুসারীরা বিশ্বাস করে মাইকেলকে মন্দের বিরুদ্ধে ঈশ্বরের পক্ষের যোদ্ধা ও রক্ষক হিসেবে দেখা যায়। বাপ্তিস্মের দিন তিনি একটি খ্রিস্টিয় স্তোত্র (hymn) রচনা করেছিলেন, যা অনুষ্ঠানে গাওয়া বা আবৃত্তি করা হয়েছিল। যা নিম্নরূপ—
‘‘Long sunk in superstition’s night,
By Sin and Satan ‘driven,
I saw not, cared not for the light
That leads the blind to Heaven.
But now, at length thy grace, O Lord!
Birds all around me shine;
I drink thy sweet, thy precious word,
I kneel before thy shrine!’’
(বঙ্গানুবাদ করলে দাঁড়ায়—কুসংস্কারের অন্ধকারে দীর্ঘকাল নিমজ্জিত’/পাপ ও শয়তান দ্বারা
তাড়িত হয়ে/ আমি দেখিনি, কিংবা পরোয়াও করিনি সেই আলোর/ যা অন্ধদের স্বর্গের পথে
নিয়ে যায়। কিন্তু এখন, অবশেষে তোমার অনুকম্পায়, হে প্রভু/ আমার চারপাশ আলোয়
উদ্ভাসিত/ আমি পান করি তোমার মধুর, তোমার বহুমূল্য বাণী/ আমি হাঁটু গেড়ে বসি
তোমার পবিত্র বেদীর সামনে’।)
খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের পরবর্তীকালে মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮৪৪ সালে বিশপস কলেজে ভর্তি হোন এবং ১৮৪৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। বিশপস কলেজ ছিল ব্রিটিশ ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ খ্রিস্টিয় ধর্মতাত্ত্বিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৮২০ সালে কলকাতার প্রথম অ্যাংলিকান বিশপ Thomas Fanshawe Middleton প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমত হাওড়ার শিবপুরে হুগলি নদীর তীরে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য ছিল—খ্রিষ্টান যাজক তৈরি করা; ধর্মপ্রচারক, শিক্ষক ও ক্যাটেকিস্টদের প্রশিক্ষণ দেওয়া; এছাড়াও কিছু সাধারণ উচ্চশিক্ষাও প্রদান করা। হিন্দু কলেজে খ্রিষ্টানদের ঠাঁই ছিলো না, সেইজন্য প্রায় বাধ্য হয়েই বিশপস্ধসঢ়; কলেজে স্থানান্তর হয়েছিলেন। মধুসূদনের ধর্মান্তকরণে তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ নড়চড়ে উঠেছিল, কেননা গ্রামীণ বাংলায় উচ্চবর্ণ হিন্দুর খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ ছিল অস্বাভাবিক ঘটনা। তাই মধুসূদনের ধর্মান্তর পরিবার ও সমাজে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এখানেই তিনি সংস্কৃতের পাশাপাশি গ্রিক ও ল্যাটিন ভাষা শিখেছিলেন, যা পরবর্তীকালে সাহিত্য সৃষ্টিতে অসামান্য অবদান রাখতে পেরেছিলেন। কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, তরুণ মধুসূদন এক সময় মিশনারী হওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলেন, যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি সেই পথে যাননি।
মাইকেল মধুসূদন দত্তের সমসাময়িক সময়ে বাংলার নবজাগরণের পর্বে আরো কয়েকজন বিশিষ্ট বাঙালি খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন—Thomas Fanshawe Middletonকৃষ্ণমোহন ব্যান্যার্জী (১৮১৩-১৮৮৫), লাল বিহারী দে (১৮২৪-১৮৯২), গোবিন্দ চন্দ্র দত্ত, কালিচরণ ব্যান্যার্জী (১৮৪৭-১৯০৭)।
কৃষ্ণমোহন ব্যান্যার্জী বা লাল বিহারী দের মতো অনেকেই খ্রিষ্টিয় ধর্মতত্ত্ব, ধর্মপ্রচারক ও চার্চ সংক্রান্ত কাজে সক্রিয় ছিলেন কিন্তু মাইকেল মধুসূদন দত্ত সাহিত্যিক জীবনকেই বেছে নিয়েছিলেন। ধর্মীয় জীবনের তথা ধর্ম তাত্ত্বিক কোনো লেখক হোন নি, হয়েছেন মানব সমাজের, ধর্মের ঊর্ধ্বে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। জ্ঞানেনন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮২৬-১৮৯০) ছিলেন প্রথম ভারতীয় ব্যারিস্টার। তিনি ১৮৫১ খ্রিষ্টাব্দে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং ধর্মান্তরের ফলে পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধিতার চরম সম্মুখীন হয়েছিলেন। কৃষ্ণমোহন ব্যান্যার্জী ১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি হিন্দু কলেজের ‘ইয়ং বেঙ্গল’ গোষ্ঠীর অন্যতম সদস্য, পরে পুরোহিত ও খ্রিষ্টিয় লেখক হোন। গোবিন্দ চন্দ্র দত্ত ১৮৫০ দশকে ধর্মান্তরিত হোন।
লাল বিহারী দে ১৮৪৩/১৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীকালে মিশনারী ও লেখক হিসেবে নিজেকে আত্মপ্রকাশ করেন। মাইকেল মধুসূদন খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের কারণ হিসেবে ঐতিহাসিকরা মনে করেন—
- তিনি হিন্দু কলেজে শিক্ষিত ইংরেজিমনস্ক তরুণদের প্রভাবের মধ্যে ছিলেন;
- পাশ্চাত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবনধারার প্রতি তার গভীর আকর্ষণ ছিল;
- তিনি ইউরোপে গিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভের স্বপ্নও দেখতেন;
- পরিবার ও সমাজের প্রচলিত ধর্মীয় ও সামাজিক বিধিনিষেধের সঙ্গে তার মতবিরোধ
ছিল; - পিতার নির্ধারিত বিয়ে এড়ানোর ইচ্ছা;
- খ্রিষ্টধর্মের কিছু আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। বিশেষত—ধর্মান্তরে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কারণ ধর্মীয় বিশ্বাসের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কায়স্থ বংশের পিতা রাজনারায়ণ সন্তানের শিক্ষাদানে উদারহস্তে অর্থের যোগান দিয়েছিলেন কিন্তু খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের পরবর্তীতে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। পিতা-সন্তানের সম্পর্কের
দূরত্ব বেড়েছে বৈকি কমেনি। খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের প্রেক্ষিতে মাইকেল মধুসূদন দত্ত জীবনে বিপর্যয় ও কতকগুলো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। ধর্মান্তকরণ তৎকালীন সময়ে যেরূপ পরিস্থিতি সামনে দাঁড় করিয়েছিল, অদ্যাবধি সেটির কোনো পরিবর্তন হয়নি। মাইকেল মধুসূদন দত্ত পরিস্থিতিতে মোকাবেলা করে টিকে থাকতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করেছিলেন।
পরিস্থিতিগুলো বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান হয় যে— - খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের পর তিনি পরিবার থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তার পিতা রাজনারায়ণ দত্ত পুত্রের এই সিদ্ধান্তকে গ্রহণ করতে পারেননি;
- বাংলার হিন্দু সমাজ ধর্মান্তরকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করতেন, ফলে তিনি সামাজিকভাবে একঘরে হয়ে যান;
- ধর্মান্তরের কারণে শিক্ষা জীবনেও প্রভাব পড়ে, তাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করতে হয়েছে;
- পারিবারিক সম্পত্তি ও আর্থিক সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলশ্রুতিতে জীবনের
পদে পদে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা করতে করতে ন্যুব্জ হয়ে পড়েন; - জীবনভর বঞ্চিত হওয়ার পরও তার চিঠিপত্রগুলোতে দেশ, মাতৃভাষা ও পরিবারের প্রতি মোহভঙ্গ হোননি, তবে আক্ষেপ থেকে যায়। অমৃত্যু পর্যন্ত খ্রিস্টধর্মে থেকেছেন, ত্যাগ করেননি। একদিকে অর্থনৈতিক দৈন্যতা ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম; অপরদিকে সাহিত্য সৃষ্টির প্রবল ঝোঁক দুটিকে মেলানো ছিল খুবই দুঃসাধ্য ব্যাপার। মাইকেল মধুসূদন দত্ত সাহিত্যের নেশায় মশগুল ছিলেন, হয়ত এই নেশায় তাকে জাগতিক ঝুটঝামেলাকে উৎরে যেতে সাহায্য করেছে। তিনি Bengal Renaissance-এর অন্যতম সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব। যুক্তিবাদ, আধুনিকতা এবং প্রথা ভাঙার প্রবণতা তার লেখায় স্পষ্ট। অতঃপরও বাংলা সাহিত্যে কতকগুলো মাইলফলকই তাকে অমর করে রেখেছে—
১. বাংলা অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন: তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য (১৮৬০)-এ প্রথম যত্নসহকারে অমিত্রাক্ষর ((Blank Verse) ছন্দ ব্যবহার।
২. বাংলা মহাকাব্যের নবযুগের সুচনা: মেঘনাদবধ কাব্যে (১৮৬১) মাইকেল মধুসূদন দত্ত রামায়নকে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে নায়কোচিতভাবে উপস্থাপন করেছেন।
৩. বাংলা সনেটের প্রবর্তন: তিনি বাংলা ভাষার প্রথম সনেট রচনা করেন। তার সনেটগুলো পরে চতুর্দশপদী কবিতাবলী নামে প্রকাশিত হয়।
৪. আধুনিক বাংলা নাটকের বিকাশে অবদান: শার্মিষ্ঠা, কৃষ্ণকুমারী প্রভৃতি নাটকগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ।
৫. বাংলা প্রহসনের পথিকৃৎ: একেই বলে সভ্যতা’ এবং বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো’ বাংলা প্রহসন সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ রচনা।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত সবচেয়ে জন মিল্টন দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত হয়েছেন। এছাড়াও তিনি John Milton, William Shakespeare, Lord Byron প্রমুখের সাহিত্যরীতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। Henry Louis Vivian Derozio মারা যান ১৮৩১ সালে। মনে করা হয়, ডিরোজিও সরাসরি ছাত্র না হলেও তার দ্বারা উদার ও যুক্তিবাদী পরিবেশ মধুসূদনের চিন্তাজগতে প্রভাব ফেলেছিল। মাইকেল মধুসূদন দত্ত তিনি নিজেকে লর্ড বাইরনের মতো বিশ্বনাগরিক কবি হিসেবে উপস্থাপন করতেন। কিছু গবেষক মনে করেন যে, মাইকেল মধুসূদন দত্তের সাহিত্যে পাপ, নিয়তি, আত্মত্যাগ, বেদনা ও মুক্তির মতো বিষয়গুলোর উপস্থাপনে খ্রিস্টিয় চিন্তার পরোক্ষ প্রতিফলন ঘটেছে। হতে পারে এগুলো স্পষ্ট ধর্মীয় প্রচার নয়, বরং সাহিত্যিক ও দার্শনিক প্রভাব। ব্যক্তি জীবনে তিনি খ্রিস্টধর্মকে গ্রহণ করলেও বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ভারতীয় শেকড়ের প্রতি আগ্রহ হারাননি। সাহিত্যকে সাহিত্যের জায়গা থেকে চর্চা করেছেন, হৃদয় থেকে কতটুকু ধারণ করেছিলেন সেটি অবশ্যই বিবেচ্য। তবে এটি ঠিক যে, সাহিত্যের নবরূপায়নে ভারতীয় পুরাণ, বিশেষ করে রামায়ণ-মহাভারতের চরিত্র ও কাহিনী ব্যবহার করেছেন। তিনি ধর্মপ্রচারক ছিলেন না; বরং একজন সাহিত্যিক হিসেবে মানবচরিত্র, বীরত্ব, ট্র্যাজেডী এবং নৈতিক দ্বন্দ্বকে গুরুত্বারোপ দিয়েছেন। তার রচনায় খ্রিস্টিয় ধর্মতত্ত্বের সরাসরি উপস্থিতি কম হলেও পাশ্চাত্য সাহিত্য ও খ্রিস্টিয় সাংস্কৃতিক পরিবেশের প্রভাব ভাষা, রীতি ও চিন্তায় দেখা যায়।
মাইকেল মধুসূদন দত্তকে খ্রিষ্টিয়ান কবি হিসেবে দেখার কোনো অবকাশ নেই। তিনি বাংলা সাহিত্যেকে বিশ্ব মর্যাদার আসনে পৌঁছিয়েছেন। বাংলা ভাষা যতদিন থাকবে, মাইকেল মধুসূদন দত্তও সাহিত্যের আকাশে জ্বলজ্বল করবে। - মিথুশিলাক মুরমু: গবেষক ও লেখক।




Users Today : 169
Views Today : 186
Total views : 181818
