দিনের পর দিন চলে যায়, মাসের পর মাস চলে যায়, বছরের পর বছর চলে যায় কিন্তু গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের জীবনের গতিপথ পরিবর্তন হয় না। দেশের সরকার পরিবর্তন হয়, এমপি পরিবর্তন হয়, এলাকার চেয়ারম্যান পরিবর্তন হয়, পরিবর্তন হয় গ্রামের মেম্বার পর্যন্ত কিন্তু পরিবর্তন হয় না গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের জীবনমান। সৃষ্টির আদিকাল থেকে গ্রামের মানুষের জীবন, জীবিকা ও গতিপথ একই। যে মজুর তার জীবন মজুরীতেই যায়, যে কৃষক সে কৃষকই, যে ভ্যানচালক তার জীবন ভ্যানচালেই শেষ। যেই ব্যক্তি যে পেশায় জড়িত, তার জীবন, জীবিকা সেভাবেই শেষ হয়। গ্রামের মানুষেরা সাধারণত সহজ, সরল হয়। না বুঝে রাজনীতি না বুঝে সমাজনীতি। পেটনীতি নিয়েই জীবন অতিবাহিত করে। পেটের দায়ে জীবনের সকল সুখ বিসর্জন দেয়। এই সুযোগে সমস্ত রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা এই মানুষদের ব্যবহার করে নিজেরা নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করে। কিন্তু এই মানুষদের ভাগ্য পরিবর্তনের দিকে কেউ তাকায় না।
বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষির উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গ্রামের কৃষকদের অবদান অনেক। কেননা গ্রামের সবাই কোনো না কোনো ভাবে কৃষি কাজের সাথে জড়িত। কিন্তু তারা তাদের পরিশ্রমের যথাযথ ফলাফল পায় না। ফসল তোলার পর বিক্রির উপযুক্ত করলেই দেখা যায় বাজার সিন্ডিকেট। উৎপাদিত পণ্যের দাম অনেক কম। লাভ তো হয় না বরং লোকসান। ফলে দেখা যায়, কৃষকেরা যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে ফসল ফলিয়েছে, সেই পরিমাণ অর্থই ঘরে আনতে ব্যর্থ। দিনশেষে দোকানের সার, কীটনাশক বা ঔষধের টাকায় পরিশোধ করতে পারে না। পরিবার চালানো তো অনেক দূরের কথা। এভাবে বরাবরই কৃষকের স্বপ্ন ভেঙে যায়। জীবন মানের উন্নতি আর হয় না। বরং ঋণের বোঝা নিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে হয়।
আবার গ্রামের অনেকে নিজেদের ভাগ্য বদলানোর জন্য শহরে চলে যায়। কেউ রিকশা চালায়, কেউ গার্মেন্টস শ্রমিক হিসেবে কাজ করে, কেউ রাস্তার কাজে যুক্ত হয়, কেউ বিভিন্ন কোম্পানিতে ডে-লেবারের কর্মী হিসেবে যুক্ত হয়। যে যেখানে পারে যুক্ত হয়। কিন্তু সারাদিন দিনরাত অমানুষিক পরিশ্রম করে যে বেতন পায় তা দিয়েই সংসার চালানোই কষ্টকর। ভাগ্য বদলানো অনেক দূরের বিষয়।
অন্যদিকে, গ্রামের এই সহজ-সরল মানুষরা সকল ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়। আইন, বিচারসহ অন্য সকল ক্ষেত্রে। বলা হয়ে থাকে আইনের চোখে সবাই সমান। কিন্তু বাস্তবতায় আইনে চোখে অর্থের প্রাধান্য, আইনের চোখে ক্ষমতার প্রাধান্য। গ্রামে কোনো মেয়ে ধর্ষিত হলে দেখা যায় গ্রামের পাতিনেতারা অর্থের ভিত্তিতে সমাধান করে। পত্রিকায় এমন খবর অনেক পাওয়া যায়। আবার ভুক্তভোগী আইনের দারস্থ হলে আসামী পক্ষ অর্থের বিনিময়ে, ক্ষমতার দাপটে সবকিছু যেখানে ছিল, সেখানেই শেষ করে দেয়। সঠিক বিচার আর পাওয়া হয়না। এটা শুধু মাত্র একটা উদাহরণ। এরকম হাজারো বৈষম্যের শিকার হয় এই সহজ সরল মানুষেরা। কিন্তু এর শেষ কোথায়? আদৌও কি এর শেষ হবে বাংলাদেশে?
মানুষের মৌলিক অধিকার―যেগুলো না হলেই নয়। জীবন বেঁচে থাকার জন্য যা অত্যাবশ্যক। যেমন-খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও চিত্তবিনোদন। কিন্তু গ্রামের মানুষের এসব মৌলিক অধিকার সরকার কতটুকু নিশ্চিত করতে পারছে? এখানো মানুষ না খেয়ে দিনাতিপাত করে। অনেক পরিবারে দেখা যায়, একবার খেতে পারলে আরেকবার খেতে পারে না। বাজার সিন্ডিকেট আরেক বড় সমস্যা। বিশেষ করে, যারা দিন এনে দিন খায় তাদের জন্য। অনেকে রুটি খেয়েও দিনাতিপাত করা লাগে দিনের পর দিন। নুন আনতে পান্তা ফুরায়, যার বাস্তব চিত্র পাওয়া যায় গ্রামে। সুষম খাদ্য তো অনেক দূরের বিষয়। ভুগতে হয় অপুষ্টিতে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) দেওয়া ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে তীব্র খাদ্যসংকটে থাকা ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ চতুর্থ। গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস ২০২৫’-এর অন্য আরেক রিপোর্টে উঠে এসেছে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকা বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে চতুর্থ স্থানে আছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের পাঁচটি সংস্থা মিলে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সংস্থাগুলো হলো এফএও, ইফাদ, ডব্লিউএফপি, ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফ।
দুই প্রতিবেদন অনুসারে, শুধু খাদ্যনিরাপত্তার সংকটেই নয়, স্বাস্থ্যকর বা সুষম খাদ্য গ্রহণের দিক থেকেও বাংলাদেশ পিছিয়ে। এ বিষয়ে গত সাত বছরে অনেকটা উন্নতি হলেও এখনো দেশের ৭ কোটি ৭১ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পায় না। দেশের ১০ শতাংশের বেশি মানুষ অপুষ্টির শিকার।
বস্ত্রের দিকে তাকালে দেখা যায় পুরাতন কাপড় পরেই জীবন শেষ। শীতকাল এর বাস্তবতা চোখে পড়ার মতো। কিন্তু কারও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ঈদের সময় পত্রিকায় খবর পাওয়া যায়, যাকাতের বা ফিতরার লুঙ্গির জন্য মানুষের ভিড়ে নিচে পরে ব্যক্তির মৃত্যু। এসব সাধারণ কোনো বিষয় না। একটা লুঙ্গির জন্য একটা মানুষের মৃত্যু কখনো সাধারণ বিষয় হতেই পারে না। যে রাষ্ট্রে এমন ঘটনা ঘটে, সে রাষ্ট্র কীভাবে জনগণের হয়? এরপর চিকিৎসা। গ্রামের মানুষের কাছে রোগ, রোগ মনে হয় না। রোগ মনে করলে অর্থের প্রয়োজন হয়। পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে মাসের পর মাস সরকারি হাসপাতালে ভর্তি থাকা লাগে। মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে বাঁচতে হয়। মাঝে মাঝে পাতিনেতাদের উদ্ভব হয় এসব লোকদের সামান্য কিছু অর্থ দিয়ে ফটোসেশান করে মিডিয়ায় দেওয়া বা ফেসবুকে পোস্ট করা। এটা করে হতে চায় জননেতা। এটাই সমাজের বাস্তব চিত্র। এছাড়া দেশে রয়েছে উন্নত চিকিৎসার অভাব। রিপোর্ট অনুযায়ী, কিডনি রোগের মতো জটিল ও ব্যয়বহুল চিকিৎসায় আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ৮০ শতাংশই অর্থাভাবে বা সঠিক চিকিৎসার অভাবে মারা যায়। এছাড়া, দেশের ৭০ শতাংশ মৃত্যু অসংক্রামক রোগে (ক্যান্সার, হৃদরোগ) হয়, যেখানে বড় অংশই উন্নত চিকিৎসার অভাবে অকাল মৃত্যুর শিকার। কিন্তু এর শেষ কোথায়?
আবার রয়েছে বাসস্থানের সমস্যা। অনেকের ঘর-বাড়ি নেই, ভিটে জমি নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ও গৃহগণনার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে ভাসমান মানুষের সংখ্যা ২২ হাজার ১১৯ জন। এ তালিকায় আছে, যাদের বসবাসের ঘর-বাড়ি নেই। যারা রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, মাজার, ফুটপাত, সিঁড়ি, ওভারব্রিজের নিচে, লঞ্চটার্মিনাল, ফেরিঘাট, মার্কেটের বারান্দায় দিনাতিপাত করেন। আর বস্তিতে বসবাস করছেন ১৮ লাখ ৪৮৬ জন। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের নগর অঞ্চলের জনসংখ্যা ৪০.৪৭ শতাংশ অর্থাৎ ৭ কোটি, ২০৫০ সালে এটি বেড়ে দাঁড়াবে ৫৬ শতাংশে। বর্তমানে দেশে মোট ৬০ লাখ দুস্থ পরিবারে আবাসন ঘাটতি আছে। ২০৩০ সালে আবাসন ঘাটতি বেঁড়ে দাঁড়াবে ১ কোটি ৫ লাখ ইউনিট। ২০৫০ সালে এটি বেঁড়ে দাঁড়াতে পারে ১ কোটি ৩৩ লাখে।
গ্রামের শিক্ষার দিকে তাকালে ভয়াবহ অবস্থা চোখে পড়ে। অধিকাংশই গরীব পরিবার হওয়ায় মেয়েদের কম বয়সেই বিয়ে দেওয়া হয়। ছেলেদের একটু বড় হলেই বাবার সাথে কাজে চলে যেতে হয়। পড়াশোনা করতে চাইলেও করার সুযোগ হয় না। এভাবে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী শুরুতে শেষ হয়ে যায়। সরকারের উচিত এদিকে যথেষ্ট লক্ষ দেওয়া। শিক্ষা ক্ষেত্রে বাজেট বাড়ানো। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ প্রতিবেদন (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২৪) অনুযায়ী দেশের সাত বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে বর্তমানে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ২২ দশমিক ১ শতাংশ জনগোষ্ঠী এখনো নিরক্ষর।
বর্তমানে বাংলাদেশে জিডিপির প্রায় ১.৫৩%-১.৭% শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা হয়ে থাকে এবং গত দুই দশক ধরে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা ব্যয় জিডিপির ২% এর কম। তবে ইউনেস্কো শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪%-৬% শিক্ষা খাতে ব্যয় করার সুপারিশ করে থাকে।
নির্বাচন আসলে ভোটের জন্য প্রার্থীরা নানা ধরনের প্রতিশ্রুতির মধ্যে তাদের ভাগ্য বদলানোর আশ্বাস দিয়ে যায়; দেখা যায় কেউ কৃষকের ধান কেটে দেয়, মাটি কেটে দেয়। যে ব্যক্তি যে কাজ করে, তাকে সেই কাজেই সাহায্য করে। হতে চায় মাটি ও মানুষের জননেতা। কিন্তু দূর্ভাগ্যের বিষয় যে, ভোট শেষ হলে নির্বাচিত প্রার্থী তথা জননেতাকে আর খুঁজেই পাওয়া যায় না।
ঈদের সময় গ্রামের গরীব মানুষদের সরকারি ভাবে ১০ কেজি চাল বরাদ্দ থাকে। যাতে সবাই ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারে। কিন্তু এযাবৎ কালে কেউ পরিপূর্ণ ১০ কেজি চাল পেয়েছে শুনি নাই। কখনো ৯ কেজি, কখনো সারে ৯ কেজি। যে দল বা যে সরকারেই আসে এই ধারা চলমান থাকে। এই বিষয় যে নেতারা জানেনা, তা নয়। সবাই জানে। কিন্তু নিশ্চুপ। কোনো পদক্ষেপ নেই। এরকম সকল ক্ষেত্রেই এরা অবহেলিত, বঞ্চিত এবং লাঞ্ছিত।
এছাড়া সরকারি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের অনুদান দেওয়া হয়। বিভিন্ন ধরনের কার্ড বা ভাতা দেওয়া হয়। যেমন-বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন সহায়তা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি, ভিজিএফ (VGF) কার্ডের মাধ্যমে খাদ্য সহায়তা এবং অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি)। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় এসব ভাতার অন্তর্ভুক্ত অধিকাংশের বেশি মানুষকে টাকা দিয়ে এসব ভাতা নিতে হয়। আবার অনেক সময় যথাযথ ব্যক্তিরাও পায় না। নেতাদের আত্মীয়স্বজনরাই এসব ভাতার অন্তর্ভুক্ত হয় বেশি। নেতারাই নিজেদের পরিচিত ব্যক্তিদের কখনো অর্থের ভিত্তিতে কখনো স্বার্থের ভিত্তিতে এসব ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়। সরকারের উচিত গ্রামের দিকে লক্ষ রাখা। গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে সহায়তা করা। তাহলেই সুন্দর হবে সমাজ, সুন্দর হবে বাংলাদেশ।
মোজাহিদ হোসেন: কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।





Users Today : 51
Views Today : 54
Total views : 174607
