ন্যায়পরায়ণ ও ধর্মনিষ্ঠ জীবনযাপনের প্রতি ঈশ্বরের অহ্বান যুগ যুগ ধরেই আছে। নিজের পাপ ও ঈশ্বরের প্রতি অবাধ্যতার জন্য ঈশ্বরের শাস্তি নেমে আসে না জীবনে। খ্রীষ্ট্রপূর্ব অষ্টম শতাব্দীতে যিশাইয় নামে একজন ভাববাদীর মুখ থেকে ঈশ্বরের সাবধান বাণী উচ্চারিত হয়েছিল। সেখানে ২:৫ পদে লেখা আছে, হে যাকোবের বংশধরগণ, এসো, আমরা সদা প্রভুর আলোতে চলে। এই যে ঈশ্বরের আহ্বান সেটা কি শুধু তাদের জন্য ছিল, নাকি যুগ যুগ ধরে অন্য মানুষদের জন্যও আছে। অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আলোতে চলা বলতে কি ঘর থেকে বেরিয়ে বাহিরে চলা, নাকি মিথ্যা থেকে বেরিয়ে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার নির্দেশনা। সূর্যের আলো নয়, প্রদীপের আলো নয় বা আলোহীন কোনো আন্ধকার নয়, সত্য ও ন্যায় হলো সেই আলোর পথ, যে পথের আলোর খুবই অভাব আজকের কুসংস্কার ও মিথ্যোর আবর্তে নিমজ্জিত সমাজে। ঈশ্বরের আলোতে চলার যে আহ্বান, সেটা গভীর আধ্যাত্মিক বিষয়। এটা শুধু ধর্ম ও দার্শনিকের চিন্তা ও চেতনা থেকে পাওয়া যায়। এই আলোতে চলতে হলে নিজেকে নৈতিকতা, সততা, ধর্মীয় অনুশীলন মেনে চলা ও সৃষ্টিকর্তার প্রতি নিজেকে সম্পূর্র্ণ রূপে সমর্পণ করাকেই বুঝায়। আর তখনই অন্যের কল্যাণকর জীবন পথে নিজেকে সমর্পণ করা সম্ভব।
ঈশ্বর আজও আমাদের প্রতিক্ষণে ডাকছেন আলোর পথে চলার জন্য কিন্তু জাগতিকতার শব্দে সেটা আমরা শুনতে পাই না। তাঁর আলোতে চলার আহ্বান আমরা বুঝতে পারি না জন্যেই অভাব, অনটন, অসুস্থতা আজ আমাদের সঙ্গী হয়েছে। সৃষ্টির ইতিহাস যদি দেখি তাহলে আদি পুস্তক ১:২-৩ পদ, সেখানে লেখা আছে, পৃথিবী ঘোর ও শূন্য ছিল ও অন্ধকার জলধির উপরে ছিল। আর ঈশ্বর বললেন, দ্বীপ্তি হোউক তাহাতে দ্বীপ্তি হইলো। আর ঈশ্বর দেখলেন উত্তম। আর ঈশ্বর তখন আলো আর অন্ধকারকে আলাদা করলেন। এখানে ঈশ্বরের বাক্যেই সেই আলো হয়েছিল, আর ঈশ্বরের বাক্যেই আলো আর অন্ধকার আলাদা হয়ে গেল। তখন বিদ্যুৎ ছিল না, তেল ছিল না, মোমবাতি ছিল না বা আগুন জ্বাালিয়ে আলো করার মতো কিছুই ছিল না কিন্তু ঈশ্বরের বাক্য ছিল, সেই বাক্যে শক্তি ছিল, সেই বাক্যের মধ্যে আলো ছিল। আজও তিনি আমাদের বলছেন, আমার আলোতে চলো। আমরা কি কোনো সময় ঈশ্বরের বাক্যের মধ্যে সেই আলো খুঁজতে চেষ্টা করি। এই আলো প্রেম, ভালোবাসা, ক্ষমা, বিশ্বাস, আনুগত্য এগুলোর ভিত্তিতে জ্বলতে ও জ্বলে থাকতে সাহায্য করে। আমরা যুগ যুগ ধরে যেখানে আলোর পথ হাতড়ে মরি, সেখানে তিনি আলোর স্পষ্ট নিদর্শন স্বরূপ হযরত ঈসা নবীকে জগতে পাঠালেন। হযরত ইসাইয়া নবীর লেখায় ৬০:১ এ দেখা যায়, ওঠো, আলো দাও, কারণ তোমার আলো এসে গেছে। মাবুদের মহিমা তোমাকে আলো দিচ্ছে। আর পবিত্র বাইবেলে লেখা আছে, যিশাইয় ৬০:১ পদে, ওঠো, দ্বীপ্তিমতি হও, কারণ তোমার আলো এসে গেছে এবং সদা প্রভুর মহিমা তোমার উপর উদিত হয়েছে। পবিত্র কোরআন শরীফ, সুরা মারইয়াম ২১ আয়াতে লেখা আছে, সে বলিল, এই রূপ হবে। তোমার প্রতিপালক বলেছেন, এটি আমার জন্য সহজ সাধ্য এবং আমি এককে এইজন্য সৃষ্টি করব, যেন সে মানুষের জন্য এক নিদর্শন ও আমার নিকট হতে এক অনুগ্রহ; এ তো এক স্থিরীকৃত ব্যাপার। এটাই সেই আলো, যেটা ঈশ্বর সৃষ্টির শুরুতেই তাঁর সুন্দর সৃষ্টিকে অবাধ্যতার পথ থেকে বাধ্যতায় ফিরে আসার সুজোগ তৈরি করে রেখেছিলেন যেন মানুষ সেটা বুঝতে পেরে তাঁর কাছে পুনরায় ফিরতে পারে। এটাই স্থীরকৃত বিষয় যা সমস্ত মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোতে ফিরিয়ে আনার জন্য। তাই তো তিনি বলছেন ওঠো। এই আত্মিক জাগরণ যা নতুন জীবন লাভের নিশ্চয়তা দেয়। ঘুমন্ত বা নিস্ক্রিয় না থেকে নতুন উদ্যোমে পুনর্জাগরণ হোক প্রতিটা মানুষের হৃদয়ে। এখানে বলছেন দ্বীপ্তিমতি হও, তার মানে সেই আলোতে আলোকিত হও। আর অন্ধকারের সাথে আত্মিক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নাও, নইলে ঈশ্বর যেমন তাঁর বাক্যে আলো ও অন্ধকারকে আলাদা করেছিলেন, আবার ঠিক তেমনই করবেন।
আমাদের মনে রাখা উচিত যে, একজন বিশ্বাাসী যখন ঈশ্বরের ইচ্ছাতে জীবনযাপন করে, তখন সেই আলোতে তার জীবন ভরে যায়, যা অন্য সবাই দেখতে পায়। তিনি বললেন, তোমার আলো এসে গেছে। তার মানে ঈশ্বরের স্থিরীকৃত ব্যাপার আজ সামনে। তাঁর পরিত্রাণের পরিকল্পনা আজ সামনে। তাঁর অনুগ্রহের প্রকাশ আজ সামনে কিন্তু কত জন সেটা দেখতে পাচ্ছি বা অনুভব করতে পাচ্ছি। তিনি ক্রুশে দাঁড়িয়ে দুই হাত বাড়িয়ে আমাদের ডাকছেন, আমরা তা কতজন বুঝতে পারছি। পুনরুত্থান, পুনর্জীবন আর অন্তর্ধান আমরা অনেক সময় গুলিয়ে ফেলি। পুনর্জীবন আর অন্তর্ধান হলো বিশ্বাসে, আর প্রভু যীশুর পুনরুত্থান প্রমাণিত বিষয়। কেননা কবর থেকে জীবিত হয়ে উঠে তিনি ৪০ দিন তাঁর বহু শিষ্যের সাথে দেখা করেছেন এবং সবার সামনে তিনি উপরে উঠেছেন। যারা দেখেছেন তারাই এই সত্য সাক্ষ্য দিয়েছেন। প্রেরিত পৌল ঘোষণা করেছেন যে, তিনি আমাদের পাপের জন্য মরেছেন, তাকে কবর দেওয়া হয়েছে এবং তিনি পুনরুত্থিত হয়েছেন এবং ঈশ্বরের ডাইনে বসে আছেন এবং পৃথিবীর সকল মানুষের বিচার করতে তিনি আবার আসবেন। এটা তো তার জন্মের হাজার হাজার বছর আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করা ছিল। এখন সেটার পূর্ণতা পেল মাত্র। নবী ইউহোন্নার কিতাবে দেখা যায় ৮:১২ পদে, আর সেখানে ঈসা নবী বলেছেন, আমি জগতের আলো। যে আমাকে অনুসরণ করে সে অন্ধকারে চলিবে না। সেই আলো আজ পৃথিবীতে উদিত হয়েছে, তা আমরা সবাই জানি কিন্তু বিশ্বাসে আনতে পারি না কেন। আমাদের হৃদয়টা কেন সিলমোহর করে বন্ধ করা। ঈশ্বরের আলোতে চললে সত্য ও ন্যায় কখনো ছেড়ে যেতে পারে না । আর সেখান থেকে অন্যের মঙ্গল চিন্তা বের হয়, নৈতিকতার উন্নতি হয়। সৎ জীবনযাপন ও ন্যায়কে ন্যায় বলার মতো সাহস তৈরি হয়। আত্মিক শান্তির মাধ্যমে নিজের, পারিবারিক ও সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, যা সুন্দর দেশ গঠনেও সাহায্য করে থাকে। আজকের পৃথিবীতে আত্মকেন্দ্রীকতা অন্যায় ও পাপে পরিপূর্ণ। এগুলো দূর করতে অবশ্যই ঈশ্বরের আলো প্রয়োজন বলে আমার মনে হয়। আমরা এখন প্রতিটা বিষয়েই উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে চলছি। এটা থেকে বের হতে অবশ্যই ঈশ্বরের সেই আলো ও সেই অনুগ্রহের দান ঈসা মসীহের প্রতি দৃষ্টি আনার কোনো বিকল্প আছে বলে মনে হয় না। পবিত্র জবুর শরীফ ১১৯ : ১০৫ পদে লেখা আছে, তোমার কালাম আমার পথ দেখাবার বাতি। আমার চলার পথের আলো। কোন সেই কালাম বা বাক্য যেটা আমাদের চরনের প্রদীপ বা পথের আলো। আমরা আজ মিথ্যে, অন্যায় ও লোভে নিজেদেরকে নিমজ্জিত করে ফেলেছি। তাই তো মানবতার কল্যাণে নিজেদেরকে আর নিয়োগ করতে পারি না। ঈশ্বরের সৃষ্টিকে ভালোবাসতে পারছি না। ন্যায়পরায়ণ ও ধর্মনিষ্ঠ জীবনযাপনের প্রতি ঈশ্বরের আহ্বান যুগে যুগেই রয়েছে। নিজের পাপ ও ঈশ্বরের অবাধ্যতার জন্য অশান্তি নেমে আসে জীবনে। ঈসার আগমনের ৮০০ বছর আগেও ঈশ্বর সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছিলেন কিতাবুল মোকাদ্দসে। আসলে ধর্মগ্রন্থ হলো বালি ও চিনির মিশ্রণ। আর সেখান থেকে বালি ও চিনি আলাদা করাই হলো সাধনা।
আজ তিনি উত্থিত হয়েছেন। তাই তো আজ আমাদের আনন্দের দিন কেননা আমরা দেখা সাক্ষ্য দিচ্ছি। আর এটার মাধ্যমেই পরিত্রাণের ভবিষ্যদ্বাণীর পূর্ণতা পেল। এই যে উত্থানের দিনকে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাবে বলা হয়। যেমন ইস্টার সানডে, অস্টার ডে, পাসকা ডে বা পার হয়ে যাওয়া, পাক ডে, পাঙ্কুয়া ডে, পাসওভার ডে, পূন্য রবিবার। যেহেতু জন্ম মৃত্যু ও পুনরুত্থানের বিশ্বাসের মধ্যেই প্রকৃত শান্তি, মানে স্বর্গ লুকাকাইত অবস্থায় আছে। তাই আজ থেকেই আমরা চিনি ও বালির মিশ্রণকে আলাদা করতে চেষ্টা করি। ঈশ্বর আমাদের সেইরূপ মন দান করুন।
ডা. অলোক মজুমদার: চিকিৎসক ও লেখক;
বিশেষ প্রতিনিধি সাপ্তাহিক সময়েরর বিবর্তন।





Users Today : 1
Views Today : 1
Total views : 182912
