আজ থেকে ১৩ বছর পূর্বে নিজ পৈত্রিক ভূমিতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন বিধবা মরিয়ম মুরমু। হত্যাকাণ্ডের সাথে যুক্ত প্রায় প্রত্যেকেই নিজ জ্ঞাতিগোষ্ঠী, তাহলে কেন এবং কোন অপরাধে পঞ্চাশোর্ধ নারীকে ধর্ষণ, হত্যা এবং হত্যার পর উলঙ্গভাবে গাছে ঝুলিয়ে ফাঁসির নাটক মঞ্চস্থ করেছিল! ক্যাপিটাল পানিসমেন্ট ঘোষিত আন্দ্রিয়াস মুরমু (খালাতো ভাই), জোহান মারাণ্ডী (ভাস্তে), শওকত ইকবাল এবং তৎকালীন অপ্রাপ্ত বয়স্ক অমর কিস্কুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। রাজশাহী জজ কোর্টের বিজ্ঞ বিচারক বিগত ১৬ মে ২০১২ তারিখে হত্যাকাণ্ডের রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার দীর্ঘ বছর পরও ঘোষিত রায় কার্যকরী করতে গড়িমসি করছে কারা কর্তৃপক্ষ। মরিয়ম মুরমুর পুত্র সন্তান উইলসন মারাণ্ডী এবং কন্যা কল্পনা মারাণ্ডী দুজনই সরকারের এই দীর্ঘসূত্রিতায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন। মরিয়ম মুরমুর নিকটজনেরা আক্ষেপের সাথে বলেছেন, ন্যায় বিচার নিশ্চিত হয়েছে ঠিকই কিন্তু রায় বাস্তবায়নে যে কালক্ষেপণ তা অজানা উদ্বেগের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন না। অত্র এলাকার চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের রায় কার্যকরে সময়ের প্রবাহ জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

মরিয়ম মুরমু বৃদ্ধ মা-বাবাকে দেখাশোনা করতেন। মরিয়মের বিয়ে হয়েছিল রাজশাহী তানোর থানার কলমা ইউনিয়নের চৈতপুর গ্রামে হোপনা মারাণ্ডীর সাথে। স্বামীর মৃত্যুর পর রাজশাহী গোদাগাড়ী থানার গোদাগাড়ী ইউনিয়নের সিমলা দিঘীপাড়াতে মা-বাবার সাথে থাকতেন। সিমলা দিঘীপাড়া সম্পর্কে পত্র-পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, অন্য দশটি আদিবাসী গ্রামের মতো নয় সিমলা দিঘীপাড়া। গোদাগাড়ী উপজেলার সদর থেকে ১৬-১৭ কিলোমিটার দূরের নিভৃত একটি সাঁওতাল পল্লীতে অর্ধশতাধিক উচ্চশিক্ষিত মানুষ রয়েছে। এই গ্রামে শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে আশপাশের গ্রামের মানুষ তাদের সম্মান ও সমীহ করে। গ্রামের অনেক শিক্ষিত মানুষ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে চাকুরি করে।
নির্মম হত্যাকাণ্ডে ১১ জুলাই ২০১১ সালে দৈনিক প্রথম আলো শিরোনাম করেছিল, ‘খুনের পর আদিবাসী নারীর লাশ গাছে বেঁধে রাখা হলো’। স্থানীয় প্রতিবেদক লিখেছেন, ‘রাজশাহী গোদাগাড়ী উপজেলার সিমলা দিঘীপাড়া গ্রাম থেকে গতকাল রোববার সকালে বিবস্ত্র অবস্থায় গাছে বেঁধে রাখা আদিবাসী নারী মরিয়ম মুরমুর (৫৫) লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের ধারণা ধর্ষণের পর হত্যা করে দুর্বৃত্তরা তাঁর লাশ গাছে বেঁধে রাখে। মরিয়ম মুরমু গোদাগাড়ী সিমলা দিঘীপাড়া গ্রামের একটি বয়স্ক শিক্ষা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। এছাড়া আদিবাসী পরিচালিত একটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর স্বামীর বাড়ি তানোর উপজেলার কলমা ইউনিয়নের চৈতপুর গ্রামে। ২০০৩ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে গোদাগাড়ীতে বাবা রাজেন মুরমুর বাড়িতেই ছিলেন তিনি। এলাকাবাসী জানান, রাজেন মুরমুর বাড়ির সামনে বাঁশঝাড়ের ভেতরে থাকা একটি বরইগাছের সঙ্গে মরিয়মের লাশ গলায় রশি পেঁচানো অবস্থায় ঝোলানো ছিল। লাশটি ছিল বিবস্ত্র। শরীর থেকে ঝরছিল রক্ত। গতকাল ভোর ছয়টার দিকে গ্রামের অঞ্জলী মুরমু প্রথমে লাশটি দেখতে পান। পরে তাঁর চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে গিয়ে লাশটি কাপড়ে ঢেকে থানায় খবর দেন। স্থানীয়রা বলেন, রাজেন মুরমুর মাটির তৈরি দোতলা বাড়ির প্রধান দুটি দরজা সকালে খোলা পাওয়া গেছে। বাড়ির আলমারি ও ট্রাঙ্ক ছিল খোলা। এরমধ্যে থাকা কাগজপত্র, জামা-কাপড় ও অন্যান্য জিনিসপত্র তছনছ অবস্থায় পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী বলেন, রাজেন মুরমু একজন সাবেক জরিপকারী (সার্ভেয়ার)। তিনি তাঁর বৃদ্ধ স্ত্রী ও বিধবা মেয়েকে নিয়ে বাড়িতে থাকতেন। তাঁর অন্য চার মেয়ে ও এক ছেলে থাকেন বাইরে। মরিয়মের একমাত্র ছেলেও চাকরির সুবাদে বাইরে থাকেন। মেয়ের বিয়ে হয়েছে নওগাঁর নজিপুরে। প্রতিবেশীরা বলেন, রাজেন মুরমু খুবই অসুস্থ। ঠিকমতো চোখে দেখতে পান না। কানেও কম শোনেন। তাঁর স্ত্রীর অবস্থাও ভালো নয়। তাই তাঁরা বাড়িতে থাকলেও ঘটনার কিছুই টের পাননি। মরিয়মের খালাতো ভাই আন্দ্রিয়াস মুরমু বলেন, প্রতিদিনের মতো মরিয়ম শনিবার রাতেও বাড়ির বারান্দাতেই ঘুমিয়ে ছিলেন। কিন্তু রাতে দুষ্কৃতকারীরা তাঁর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে তাঁকে হত্যা করেছে। মিডিয়ার সামনে আরো বলেছিলেন, ‘গাছে বাঁধা মরিয়ম মুরমু’র লাশ দেখে রক্ত হিম হয়ে আসে। মুখ দিয়ে কথা বের হয় না।’ মরিয়মের ছেলে উইলসন (৩২) বলেন, তাঁর মাকে কে বা কারা আগে থেকেই মেরে ফেলার হুমকি দিতেন। কিন্তু তাঁর মা কারও নাম বলতেন না। তবে তিনি বলেন, জমি নিয়ে চাচার সঙ্গে তাদের ঝগড়া চলছে। এর বাইরে কারও সঙ্গে তাদের শত্রুতা নেই। গতকাল রাজেন মুরমুর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বিছানায় পড়ে তিনি কাঁদছেন। তিনি এতটাই অসুস্থ যে উঠে মেয়ের লাশের কাছেও যেতে পারছেন না। তাঁর স্ত্রী মেয়ের লাশের পাশে বসে কাঁদছেন। রাজশাহীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইমরান হোসেন, জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার সদর (সার্কেল) বেলায়েত হোসেন, গোদাগাড়ী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাকিরুল ইসলাম ও পরিদর্শক (তদন্ত) রেজাউল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। থানার ওসি জাকিরুল ইসলাম বলেন, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। লাশ গাছের সঙ্গে বেঁধে থাকলেও পা ছিল মাটিতে। দুই হাত ছিল পিঠমোড়া করে বাঁধা। লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। ওসি বলেন, নিহত মরিয়মের যৌনাঙ্গ থেকে রক্ত ঝরছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ধর্ষণের পর তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।’ তৎকালীন সময়ের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। রাজশাহীতে দুটি বেসরকারি সংস্থা আয়োজিত পঞ্চম গণগবেষক সম্মেলনে বিভাগীয় কমিশনার ও পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শকের কাছে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এ তথ্য জানতে চেয়েছিলেন। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে আদিবাসী নারীকে হত্যা করে লাশ গাছে ঝুলিয়ে রাখার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া
হয়েছে।

সেদিনের ঘটনা সাংবাদিকের চোখে ধরা পড়ে, গ্রামে ঢুকে দেখা যায়, ছোট একটি চালাঘরে বসে আছেন কয়েকজন। সবার চেহরায় ভীতির ছাপ। মরিয়মের বাবা রাজেন মুরমুর বাড়ির সামনে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন স্থান থেকে আসা আত্মীয়স্বজনরা শোকার্ত চেহারায় বসে আছেন। বাড়ির পেছনে বসে ছিলেন রাজেন মুরমুর প্রতিবেশী অঞ্জলী মুরমু। খুব ভোরে জমিতে ধান বুনতে যাওয়ার পথে তিনিই প্রথম দেখেন গাছে বাঁধা মরিয়ম মুরমুর মরদেহ। বিবস্ত্র নারী দেখে ভেবেছিরেন কোনো ভূত-প্রেত হবে। ভয়ে বাড়ি পালিয়ে যান। স্বামী ও গ্রামের অন্য একজনকে ঘটনা বলেন। তারা এগিয়ে একটু দুরে থেকেই দেখেন, চিনতে পারেননি। পরে গ্রামের অনেকে এসে মৃতদেহ শনাক্ত করতে পারেন। মরিয়ম মুরমু মা দুলহান টুডুকে আগাম সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন, তাকে কেউ হত্যা করতে পারে। একই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন মেয়ে কল্পনা মারাণ্ডীর কাছেও। তবে এর কারণ জানতে চাইলে তা বলেননি বলে জানান কল্পনা। তবে হ্যাঁ, পুলিশের উপস্থিতিতে দুলহান টুডু হত্যা হুমকীদাতার নাম জানিয়েছিলেন।
১৪ জুলাই শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টায় জোহান ও অমর রাজশাহীর অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে হাজির হয়ে বেলা ২টা থেকে বিকেল পৌনে ৪টা পর্যন্ত আদালতের বিচারক মোহাম্মদ রেজাউল ইসলামের কক্ষে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। জবানবিন্দতে তারা মরিয়মকে ধর্ষণ ও হত্যা করার কথা স্বীকার করেন। জবানবন্দিতে বলেছিলেন, অমর তালগাছ বেয়ে মরিয়মের বাড়িতে চালার ওপর দিয়ে ভেতর ঢোকেন। পরে বাড়ির ভেতরে প্রবেশের সদর দরজা খুলে দেন তিনি। জোহান ও শওকত ইকবাল ভেতরে প্রবেশ করার এক পর্যায়ে মরিয়ম জেগে ওঠেন। তখন তাঁর গলায় কাস্তে ধরে টেনে হিঁচড়ে বাড়ির বাইরে এনে শওকত ও জোহান ধর্ষণ করেন। পরে শওকত কাস্তে দিয়ে মরিয়মের যৌনাঙ্গে আঘাত করেন। এরপর তিনজনে টেনে হিঁচড়ে মরিয়মকে বাড়ির পেছনে নিয়ে যান। সেখানে মরিয়মের হাত বাঁধা হয়। অমর তার বাড়ি গিয়ে দড়ি নিয়ে আসেন। ওই দড়ি মরিয়মের গলায় লাগিয়ে জোহান গাছে ওঠে টান দেন। অমর ও শওকত মরিয়মকে ঠেলে ওপরে ওঠান। মরিয়মকে গাছে ঝুলিয়ে রেখে তারা আবারও মরিয়মের ঘরে ঢুকে ১৬ হাজার টাকা চুরি করেন।’ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোদাগাড়ী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. নূরুজ্জামান বলেন, চুরি করা ওই টাকা থেকে অমরকে পাঁচ হাজার টাকা দেওয়া হয়। অমরের বাড়ি থেকে চার হাজার ১০০ টাকা এবং শওকতের বাড়ি থেকে কাস্তে উদ্ধার করা হয়েছে (প্রথম আলো ১৬, ২০১১)। পুলিশ বাহিনী, র্যাব ও সিআইডি’র যৌথ অভিযানে ১৩ জুলাই রাতে সিমলা দিঘীপাড়া গ্রাম থেকে আন্দ্রিয়াস মুরমু এবং বৃহস্পতিবার ১৪ তারিখ সকালে আটক করা হয় অমর কিস্কু, শওকত ইকবাল ও জোহান মারান্ডীকে।
২০১২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ মে রাজশাহী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতের বিচারক একেএম এনামুল হক মরিয়ম মুরমু হত্যা মামলায় তিনজনের মৃত্যুদণ্ড এবং একজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন। একই সঙ্গে ফাঁসির আসামিদের প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত অমর কিস্কুকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ইতিপূর্বে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে রাজশাহীর জিরো পয়েণ্টে ‘সান্তাল স্টুডেন্ট ইউনিয়ন’ ‘আদিবাসী স্টুডেন্টস্ এসোসিয়েশন অফ রাজশাহী ইউনির্ভাসিটি’ (আসারু), ‘জাতীয় আদিবাসী পরিষদ-সহ আরো অনেক সংগঠন রাজপথে দাঁড়িয়েছিল।
মরিয়ম মুরমুর একমাত্র ভাই ও সন্ধর্ভ লেখক মিথুশিলাক মুরমু’র সেদিনের অভিব্যক্তি ছিল, ‘বিপন্ন আদিবাসী জীবন ও সমাজ’-এ লিখেছিলাম অত্যাচার-নিপীড়নের শিকার হয়ে বিপন্নবোধ করে আদিবাসী মানুষ ছাড়ে গ্রাম, ছাড়ে দেশ। বিষয়টি যে আমার জীবনেও এভাবে প্রতিফলিত হবে এ কথা স্বপ্নেও ভাবিনি। এখন আমি নিজেই বিপন্নবোধ করছি’ (প্রথম আলো ১৩.৭. ২০১১)। বৃদ্ধা মা দুলহান টুডু বলেছিলেন, ‘আমার মেয়েকে হত্যা করার পরও এমন বেইজ্জতি করল। এ ঘটনা যেন উদঘাটিত হয়। আমি বেঁচে থাকতেই যেন শুনতে চাই ওই পাষণ্ডদের উচিত শাস্তি হয়েছে’। অশিতীপর দুলহান টুডু হত্যাকারীদের বিচারের রায় শ্রবণ করলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কার্যকারিতা দেখে যেতে পারেননি।






Users Today : 37
Views Today : 42
Total views : 175486
