উপমহাদেশে সর্বপ্রাচীন জাতিগোষ্ঠী হিসেবে সাঁওতালরা স্বীকৃত। সাঁওতালদের সাহিত্য, শিল্পকলা, সংস্কৃতি ও সরল হৃদয়ের চিত্র বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদীনসহ অসংখ্য ব্যক্তিদের জীবনকে প্রভাবিত করেছে। ভারতবর্ষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে আদিবাসী সাঁওতালদের ঐক্য, সাহস ও চেতনার অগ্রগামীতা লক্ষ্যণীয়। তাই তো সাহিত্যে, চিত্রকলায় সাঁওতালদের অমরতা নিশ্চিত করেছেন বিখ্যাতরা। ১৮৫৫ সালের মহান সাঁওতাল বিদ্রোহের পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকার ৬টি জেলাকে নিয়ে সৃষ্টি করেছিল ‘সাঁওতাল পরগণা’ যা আদ্যাবধি বিদ্যমান। এরূপ একটি জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতির মূল্যবোধ, মানুষের প্রতি মানুষের করণীয়, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, জীবজন্তুর প্রতি দায়িত্ববোধগুলো খুবই উঁচু ও চেতনাদায়ক। তবে হ্যাঁ, নানান উত্থান-পতনের দুর্যোগে বাংলাদেশের সাঁওতালদের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির রং যেন বিবর্ণ হয়ে যেতে বসেছে। অতঃপরও সাঁওতালদের ঐতিহ্যময় নাচ-গান, পর্ব ও রীতি-রেওয়াজগুলোকে জাগিয়ে তোলার কাজে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একদল সংস্কৃতিবান তরুণ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা তাগিদ অনুভব করেছিলেন বিলুপ্ত ও হারিয়ে যেতে বসা নিজস্ব সংস্কৃতিকে জাগ্রত করা; ঐতিহ্যকে ধারণ ও ছড়িয়ে দেবার প্রত্যয়। গড়ে তুললেন Santal Musicians Association of Bangladesh (SAMAB) । ২০১৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু হলের ২২৬ নং কক্ষে ভ্রুণের ভূমিষ্ঠ এবং ক্রমশই বেড়ে ওঠা। সামাব’র পুরোধায় রয়েছেন—জন হেমব্রম, মামুন হেমব্রম, নিশির কাজল সরেন। স্বপ্নচারীদের সংস্কৃতির আকাশে SAMAB যেন সম্ভবনার দুয়ার। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে এখন তারা পুরোপুরি সমাজের অংশী, কর্মক্ষেত্র পুরোদস্ত। ছাত্র জীবনের নেশাকে এবার সামাজিক আন্দোলনে রূপায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তাদের মটো—Lets Dream Together । পূর্বসূরীদের কাছ থেকে প্রাপ্তি গানের কলিগুলোতেই উপলব্ধিয় সাঁওতালরা কতোটা উৎসব প্রিয়। Amdo Adibasi santal hopon ho, mayam retam raska enec seren getam maran dhon do (বঙ্গানুবাদ— তুমি আদিবাসী সাঁওতাল জাতিগোষ্ঠী, তোমার রক্তে রয়েছে আনন্দ, নাচ, গান এটিই তোমার ঐশ্বর্য)। অন্যটি— Jom abon nu abon raska rebon tahena, gorom baba bon dorom kaya (বঙ্গানুবাদ—খাওয়া-দাওয়া করবো, আনন্দে থাকবো, পিতৃপুরুষদের স্মরণ করবো)। সাঁওতালদের সংস্কৃতির হৃৎপিণ্ডকে উপ্তত্ত করতেই আহ্বান করেন প্রথম জাতীয় মিউজিক ফেস্টিভ্যাল-২০২২। গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ থানার কুটরাপাড়া তালতলা ফুটবল মাঠ প্রাঙ্গণে আয়োজিত উৎসবে আদিবাসী সাঁওতালদের উপস্থিতি ছিলো আশাব্যঞ্জক। সাঁওতাল নারী-পুরুষ, শিশু-পৌঢ়ের ঢল নেমেছিল তলতলা ফুটবল মাঠে। উৎসাহ থেকে উদ্দীপনা, অতঃপর পথচলার দৃঢ়তায় যোগবন্ধন ঘটে উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও আরো কিছু সংস্কৃতিমনা মানুষের।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি ৯ তারিখ আয়োজন করা হলো দ্বিতীয় ‘ন্যাশনাল সাঁওতালী মিউজিক ফেস্টিভ্যাল ২০২৩’। এবারে দিনাজপুর জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলার মহেশপুর আদিবাসী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ প্রাঙ্গনে আয়োজন করা হয়। ‘ন্যাশনাল সাঁওতাল মিউজিক ফেস্টিভ্যাল ২০২৩’- এ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাঁওতাল একক শিল্পী ও গানের দল অংশগ্রহণ করছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—একক শিল্পী নির্মল মুরমু (মন কথা মাল্টিমিডিয়া), সংগীত দল—নাওয়া মার্শাল, সারজম বাহা, কুকমু, সহেত, হুল, এভেন এবং সেঙ্গেল সংগীত দল। এছাড়াও রয়েছে সাঁওতাল ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক ‘ডম’ দলের বিশেষ পরিবেশনা। Santal Musicians Association of Bangladesh (SAMAB) এবারের আড়ম্বর আয়োজনে নিজেদের পরিকল্পনার স্বচ্ছতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ‘সামাব’র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যেসমূহ অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। অগ্রসরমান পাঠকদের জন্য দাবিগুলো হচ্ছে—
১. আদিবাসী সাঁওতালদের ঐশ্বর্যময় সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা এবং সংযোগ স্থাপন করে ডিজিটালাইজিকরণ;
২. বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাসরত আদিবাসী সাঁওতাল মিউজিশিয়ানদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উপস্থাপনের লক্ষ্যে কাজ করা;
৩. বাংলাদেশে বসবাসরত সাঁওতাল মিউজিশিয়ানদের মধ্যে পারস্পরিক আন্তঃসম্পর্ক সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করা;
৪. সংগঠনে সংযুক্তকরণের মাধ্যমে সাঁওতাল সমাজ তথা আদিবাসী সমাজে সৃষ্টিশীল, সামাজিক মানুষ ও সুনাগরিক সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করা;
৫. বাংলাদেশে বসবাসরত সাঁওতাল মিউজিশিয়ানদের উন্নতি সাধনের লক্ষ্যে কাজ করা, প্রয়োজনে যুগপোযোগী ও দক্ষতা উন্নয়নে বিভিন্ন সেমিনার/ওয়ার্কশপ আয়োজন করা;
৬. বাংলাদেশে সাঁওতাল মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি তৈরিতে উৎসাহ এবং সহযোগিতা প্রদানসহ প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা;
৭. বাংলাদেশের সকল সাঁওতাল মিউজিশিয়ানদের অভিভাবক হিসাবে অবগত সাপেক্ষে ব্যান্ড/সংগীত সংগঠনের বিষয়াবলী সম্পর্কে হস্তক্ষেপ করা এবং যে কোনা সমস্যা সমাধান করা। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র ব্যান্ড/ সংগীত সংগঠনের পক্ষ থেকে অবগত সাপেক্ষে;
৮. প্রত্যেক বছর জাতীয় পর্যায়ে ন্যাশনাল সাঁওতালী মিউজিক ফেস্টিভ্যাল আয়োজন করা এবং নতুন শিল্পীদের উপস্থাপনের জন্য আঞ্চলিক পর্যায়ের সাঁওতাল মিউজিক ফেস্টেভ্যাল আয়োজন করা;
৯. জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন সংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন ও সংস্কৃতির মৌলিক বিষয়গুলো বিনিময় করা;
১০. প্রয়োজনে শুধুমাত্র সাঁওতাল মিউজিশিয়ান নয়, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বসবাসরত সকল আদিবাসী মিউজিশিয়ানদের উন্নয়নের (শর্ত সাপেক্ষে) স্বার্থে কাজ করা;
১১. সাঁওতাল সংগীতে বিশেষ অবদানের স্বরূপ গুণীজন সংবর্ধনার আয়োজন করা;
১২. বিশেষ প্রয়োজনে জনকল্যাণমূলক কাজে অংশ নেওয়া;
১৩. ভবিষ্যতে অত্র সংগঠনের সাংগঠনিক শক্তির উপর নির্ভর করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করা;
১৪. সাঁওতালী সংগীত শিল্পী, যন্ত্রশিল্পীদের উচ্চতর পড়াশোনা, প্রশিক্ষণ গ্রহণে উদ্বুদ্ধকরণ এবং প্রয়োজনে সর্বাধিক সহযোগিতা প্রদান করা।
২০২৩ সালে ‘সামাব’ থেকে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে তৃনা মজুমদার, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সংস্কৃতক উপ-কমিটির সদস্য ও প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ত্রিশূল সমাজকল্যাণ সংস্থা; অ্যাড. প্রভাত টুডু, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোটের প্রথম সাঁওতাল আইনজীবী এবং সারাহ্ মারান্ডী, জয়িতা ও সফল উদ্যোক্তা। উক্ত অনুষ্ঠানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসাবে ছিলেন ‘গ্রাম বিকাশ কেন্দ্র’ (জিবিকে), সহযোগী পৃষ্ঠপোষক শাপলা নীড়, ইএসডিও, ন্যাশনাল এজেন্সি ফর-গ্রিন রেভ্যুলুশন, বাদাবন সংঘ, সানাম হেরিটেজ ও এভেন ফাউন্ডেশন। আগামীতে মিডিয়া পার্টনারের সম্পৃক্ততা আবশ্যিক, কেননা প্রচার ও প্রসারে মিডিয়ার গুরুত্বতা অপরিসীম।
‘সামাব’র এমন উদ্যোগ আদিবাসী সাঁওতাল সংস্কৃতির যাত্রাকে মসৃণ করবে নিঃসন্দেহে। যে উদ্যোগগুলো গ্রহণে আদিবাসী একাডেমী করতে ব্যর্থ হয়েছে, সেটিই উদ্যোমী ও স্বপ্নবাজ যুবরা সম্ভবপর করে তুলেছে। আদিবাসী সাঁওতালদের পর্ব ও অনুষ্ঠানভিত্তিক নাচ-গান রয়েছে, রয়েছে গানের অর্ধশতাধিক সুর, তাল ও লয়; এগুলোকে বেঁচে রাখার প্রাণান্ত প্রয়াস আমাদেরকে আশান্বিত করে। বিশ্বাস করি, নতুন প্রজন্মের কবি-সাহিত্যিকরা সাঁওতাল সংস্কৃতির মধ্যে খুঁজে পাবে প্রাণ শক্তি; নব উদ্যামে উদ্ভাসিত হবে উপমহাদেশের প্রাচীনতম আদিবাসী সাঁওতাল জীবনের চালিকা শক্তি।






Users Today : 68
Views Today : 77
Total views : 189242
