যীশু খ্রীষ্ট তো জন্ম থেকে বিদ্রোহী। আমরা যদি যীশুর জীবনী দেখি, তাহলে দেখব তাঁর জীবনে সবকিছু ব্যতিক্রম ছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র ব্যক্তি তিনি-যার কোনো জাগতিক পিতা ছিল না। তিনি সবার থেকে ভিন্নভাবে জন্মগ্রহণ করেছেন। তার কোনো সৈন্যদল ছিল না, ছিল না কোনো সেনাপতি। তবুও রাজারা তার ভয়ে কাঁপত, লোকে তার কথা শুনেছে। তিনি পৃথিবীর সব স্বাভাবিক নিয়মকে অস্বাভাবিক রূপে, রূপ দিয়েছেন। যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
যীশু প্রকৃতির ওপর তার শক্তি বিস্তার করেছিলেন, প্রকৃতি তার কথা শুনেছে। তিনি ধমক দিয়ে ঝড়কে থামিয়ে ছিলেন। তিনি মৃত লাসারকে জীবন দিয়েছিলেন। যে লাসার তিনিদিন আগে মারা গিয়েছিল। তিনি অন্ধকে জীবন দিয়েছিলেন।
তার কোনো সেনাপতি, সৈন্য দল ছিল না-তারপরেও রাজারা তাকে ভয় পেত। এজন্য রাজা হেরোদ যখন জানতে পেরেছিল খ্রীষ্ট জন্মগ্রহণ করেছে সে সময় দুই বছরের নিচে সকল শিশুকে জীবন দিতে হয়েছিল। খ্রীষ্ট হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যিনি ঈশ্বরের প্রতিজন। যাকে ঈশ্বর বিশেষ কার্য সাধনের জন্য প্রেরণ করেছিলেন। তা আমরা খ্রীষ্টের জন্ম জীবনী-পুনরুত্থানে দেখতে পারি। যীশুর জীবনে প্রায় ১০৩ মতো ভাববাণীর পূর্ণতা ঘটেছে। তাই তো সাধু যোহন বলেছিলেন, যীশুর জীবনে আরো অনেক ঘটনা ঘটেছিল তা যদি এই কিতাবে লেখা হতো তাহলে এই কিতাবে জায়গা ধরত না। যীশুর আসার কারণ যদি আমরা জানতে চাই তাহলে, আমাদের একটু আদি পুস্তকের দিকে যেতে হবে।
এদোন বাগানে অনেক সুখে শান্তিতে আদম-হবা ছিল কিন্তু মানুষ আর ঈশ্বরের শত্রু শয়তান আর ঠিক থাকতে পারলো না। সে মানুষকে অবাধ্য করল। ঈশ্বর আদম-হবাকে, নেকি-বন্ধি গাছের ফল খেতে নিষেধ করেছিল। সেই গাছের ফল শয়তান তাদেরকে ফাঁদে ফেলে, লোভ দেখিয়ে খেতে বাধ্য করেছিল। মানুষ যখন গ›ধব ফল খেয়ে ঈশ্বরের সমান হতে চাইল তখন মানুষ অবাধ্য ও লোভের ফলে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে পাপ করল, ঈশ্বর পাপ করার আগ পর্যন্ত আদম-হবার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতেন। সেদিনও ঈশ্বর আদম-হবার সঙ্গে দেখা কররা জন্য এসেছিলেন। কিন্তু ঈশ্বর যখন আদমকে ডেকেছিল তখন আদম নিজকে লুকিয়ে নিয়েছিল, ঈশ্বরকে বলেছিল সে নাকি উলঙ্গ। ঈশ্বর তাকে জিজ্ঞাস করেছিলেন, তোমাকে কে বলেছিল, তুমি যে উলঙ্গ? আদম তখন হবাকে দোষারোপ করার চেষ্টা করেছে আর তাদের সেদিন উলঙ্গতা ঢাকার জন্য পশুর চামড়া ব্যবহার করেছিলেন। অনেকে মনে করেন মানুষের পাপের জন্য এটা প্রথম কোরবানী।
ঈশ্বর অনেক ভালোবেসে মানুষ সৃষ্টি করেছিলেন, রুহানিকভাবে (আধ্যাত্মিক) তাঁরই মতো করে। ঈশ^র মানুষকে বংশবৃদ্ধি করার ক্ষমতা দিয়েছিলেন এবং পৃথিবীর সব কিছুর ওপর রাজত্ব করতে বলেছিলেন। যেহেতু ঈশ্বর শতভাগ পবিত্র তাই তাঁর পক্ষে পাপযুক্ত মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা সম্ভব না। অবাধ্যতার মাধ্যমে মানুষ পাপে পতিত হয়েছিলেন। আর এ জন্যই পূর্বের সম্পর্ক ফিরিয়ে আনার জন্য মানুষের পবিত্র হওয়ার দরকার। যুগে যুগে মানুষ পবিত্র হবার জন্য কুরবাণী দিতেন, কিন্তু এটা ছিল ক্ষণস্থায়ী। তাই ঈশ্বর সিন্ধান্ত নিলেন তাঁর প্রিয় পুত্র (রূপক অর্থে) এই পৃথিবীতে পাঠাবেন ‘‘আমি তোমার ও স্ত্রীলোকের মধ্যে এবং তোমার বংশ ও স্ত্রী লোকের মধ্যে দিয়ে আসা বংশের শত্রুতা সৃষ্টি করব। সেই বংশের একজন তোমার মাথা পিষে দেবে আর তুমি তাঁর পায়ের গোড়ালিতে ছোবল মারবে। (তৌরত কিতাব-পয়দায়েশ ৩ : ১৫)
আমরা দেখেছি যে, ঈশ্বর ওয়াদা করেছেন, স্ত্রীলোকের মধ্যে দিয়ে একজন ব্যক্তি আসবেন যিনি শয়তানের মস্তক পিষে দিবেন (তৌরত শরীফ পয়দায়েশ ৩ : ১৫) তাহলে এখন প্রশ্ন স্ত্রী লোকের মধ্যে দিয়ে এ পৃথিবীতে কে এসেছেন। প্রধান দুই ধর্মীয়গ্রন্থ বাইবেল ও কুরআন এক কথায় স্বীকার করে নেয় একমাত্র যীশু খ্রীষ্ট এই পৃথিবীতে বাবা ছাড়া শুধু মায়ের মধ্যে দিয়ে এসেছেন। এটা ঈশ্বরের অলৌকিক কাজ। এই পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই অদ্বিতীয়।
যীশু পৃথিবীতে মাত্র তিন বছর ঈশ্বরের রাজ্য বিস্তার কাজ করেছেন। আর বেঁচে ছিলেন ৩২ বছর। যীশুকে মৃত্যুদ- দেওয়ার মতো কোনো অপরাধ পায়নি সে সময়ের রাজা, বিচারপতিরা। তাই পন্তিয় পিলাত, যীশুকে মুক্তি দেওয়ার জন্য অনেক পথ খুঁজেছিলেন কিন্তু পারেননি। তাই অবশেষে সব দোষারোপ লোকদের ওপর দিয়ে সেই রায় দিয়েছিলেন। যীশুকে ক্রুশে দেওয়া হবে তা জেনেও তিনি লুকানো/ প্রতিবাদ করেননি। বরং স্ব-ইচ্ছায় ধরা দিয়েছেন। তার সাথে এত বেশি অমানবীয় নির্যাতন করেছে তা বলার মতো না, আর সব কিছু সহ্য করে ক্রুশের মধ্যে থেকে সেই সপ্তবাণী শুনিয়েছিলেন,
১ম বাণী
‘‘পিত: এদের ক্ষমা কর; কেন এরা কি করছে তা তারা জানে না’’ (লূক ২৩:৩৪)
২য় বাণী
‘‘আজইই তুমি পরমদেশে আমার সঙ্গে উপস্থিত হবে”( লূক ২৩:৩৯-৪৩)
৩য় বাণী
‘‘হে নারী, ঐ দেখ তোমার পুত্র” ( যোহন ১৯ : ২৬)
৪র্থ বাণী
ঈশ্বর আমার, ঈশ্বর আমার, তুমি কেন আমাকে পরিত্যাগ করেছো? (মথি ২৭ : ৪৫-৪৬)
৫ম বাণী
‘‘আমার পিপাসা পেয়েছে” ( যোহন ১৯ : ২৮)
৬ষ্ঠ বাণী
‘‘সমাপ্ত হলো” (যোহন ১৯ : ৩০)
৭ম বাণী
পিত: তোমার হস্তে আমার আত্মা সমর্পণ করলাম ” (লূক ২৩ : ৪৬)
সপ্তাহের প্রথম দিন, সেই স্ত্রীলোকেরা খুব ভোরে ঐ সমাধিস্থলে এলেন। তাঁরা যে গন্ধদ্রব্য ও মসলা তৈরি করেছিলেন তা সঙ্গে আনলেন। তাঁরা দেখলেন সমাধিগুহার মুখ থেকে পাথর খানা একপাশে গড়িয়ে দেওয়া আছে; কিন্তু ভেতরে ঢুকে সেখানে প্রভু যীশুর দেহ দেখতে পেল না। তাঁরা তখন অবার বিস্ময়ে সেই কথা ভাবছেন, সেই সময় উজ্জ্বল পোশাক পরে দুজন ব্যক্তি হঠাৎ করে তাদের সামনে দাঁড়ালেন, ভয়ে তারা নিচু ও নতজানু হয়ে রইলেন। ঐ দুজন তাদের বললেন, তোমরা তাঁকে মৃতদের মাঝে খুঁজছ কেন? তিনি এখানে নেই তিনি পুনরুত্থিত হয়েছেন। তিনি যখন গালীলে ছিলেন তখন তোমাদের কী বলেছিলেন! মনে করে দেখ? তিনি বলেছিলেন, মানবপুত্রকে অবশ্যই পাপী মানুষদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হবে; তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ হতে হবে; আর তিনদিনের দিন তিন আবার মৃতদের থেকে জীবিত হয়ে উঠবেন। তখন যীশুর সব কথা তাদের মনে পড়ে গেল। তারপর তারা সমাধিগুহা থেকে ফিরে এসে সেই এগারো জন প্রেরিতদের ও তাঁর অনুগামীদের এই ঘটনার কথা জানালেন (লূক ২৪ : ১-১০) কারণ প্রভু যীশু পুনরুত্থিত হবেন তিনি তা পূর্বেই বলেছিলেন। তাঁর এই কথার পূর্ণতা পেল।
ইস্টার সানডে কী
প্রভু যীশু ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার তিনদিন পর পুনরুত্থিত হয়ে এই ধরাতে আবার আগমন করেন। যীশু খ্রীষ্টের এই পুনরাগমনের দিনটিকে খ্রীষ্ট বিশ্বাসীগণ ইস্টার সানডে হিসাবে পালন করে। ইস্টার সানডে হলো ৪০ দিন উপবাসের শেষ দিন। গুড ফ্রাইডে পালনের পরই আসে ইস্টার সানডে। এ সময়ে উপবাসসহ প্রার্থনা করা হয়, কারণ এই দিনে সবকিছুর ওপর বিজয় লাভ করে যীশ পুনরুত্থিত হয়েছেন।
দিনটির তাৎপর্য
সাধু পৌল বলেন, হে আমার প্রিয় ভ্রাতৃগণ সুস্থির হও, নিশ্চল হও, প্রভুর কাজ সবসময় উপচে পড়ে, কেননা তোমরা জান যে, প্রভুতে তোমাদের পরিশ্রম নিষ্ফল নয়” [ ১ম করি ১৫:৫৮]
যীশুর পুনরুত্থান ব্যতিরেকে খ্রীষ্ট বিশ্বাসীর বিশ্বাস ও জীবন নিরর্থক ও প্রশ্নবোধক। খ্রীষ্ট যদি পুনরুত্থিত না হয়ে থাকেন তাহলে মিথ্যাই তোমাদের বিশ্বাস; তোমরা আজও তোমাদের সেই পাপী অবস্থাতেই পড়ে আছ! যীশুর পুনরুত্থান সকল পাপ ও মন্দতার ওপর সুনিশ্চিত বিজয়। যীশু খ্রীষ্টের পুনরুত্থান উৎসবের ঐকান্তিক কামনা হোক মৃত্যুঞ্জয়ী খ্রীষ্টের সাথে কবর থেকে উঠে পুনরুত্থিত জীবন শুরু করা। পুনরুত্থিত খ্রীষ্টের জ্যোতিতে উদ্ভসিত হয়ে নতুন মানুষে রূপান্তরিত হওয়া।
যীশুর পুনরুত্থান আমাদের ক্ষমাশীল ব্যক্তি ও আলোকিত মানুষ হওয়ার প্রেরণা দান করে। কেননা প্রভু যীশু সব কিছুর উপর বিজয়ী হয়েছে, তাই আমরা ও বিজয়ী, পুনরুত্থানের বারতা তো স্বাধীন ও মুক্ত হওয়ার আহ্বান। আমাদের জীবনে খ্রীষ্টর পুনরুত্থান কী আবেদন সৃষ্টি করে? এটাই আমাদের অনুধ্যানের বিষয়। পুনরুত্থানের চেতনা আমাদের প্রত্যাহিক জীবনে কর্মপ্রেরণা হয়ে উঠুক।
নাহিদ বাবু : বিটিএইচ-এমডিপ।





Users Today : 57
Views Today : 60
Total views : 177702
