শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালির জন্মজয়ন্তীতে আদিবাসীরা কী উপহার দিতে পারে! দূর থেকেই আদিবাসীরা বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। শতবর্ষ উদযানকে স্মরণীয়-বরণীয় করতে নিজ নিজ মাতৃভাষায় অনুবাদ করেছেন বঙ্গবন্ধুর শ্রেষ্ঠ ভাষণটিকে। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণটি জাতিকে দিয়েছেন অনুপ্রেরণা, উদ্দীপনা ও দিক-নির্দেশনা। ইতিমধ্যেই বাংলা ভূখখণ্ডে বসবাসরত আদিবাসীরা ৭ মার্চের ভাষণটিকে নিজ জাতিগোষ্ঠীর কাছে আরো বোধগম্য, আস্বাদন ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে অনুবাদ করেছে, করেছে সহজ-সরল মননশীলদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা। উপলব্ধিয় যে, মাতৃভাষায় বাঙালির শ্রেষ্ঠ ভাষণটিকে হৃদয়ে আত্মস্থ করা, অনুভব এবং রোমাঞ্চের অংশী হওয়ার অভিজ্ঞতা সত্যিই আবশ্যিক ছিল। গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যারা রয়েছেন, বাংলা ভাষাকে খুব একটা চর্চা করে না বা প্রয়োজন পড়ে না; সেই সমস্ত জাতিগোষ্ঠীও বাংলার স্থপতি সম্পর্কে; স্বাধীনতা পূর্বক্ষণে স্বাধীনতা ঘোষণার চেতনার আদ্যোপান্ত ওয়াকিবহাল হবে। দেশের শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বক্তব্যেও প্রতিফলিত হয়েছে, তিনি বলেছেন, ‘যে কাজ করা উচিত ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই, তা করা হলো স্বাধীনতার ৫০ বছর পর। কিন্তু যত দেরিই হোক, এর মাধ্যমে দেশের বাংলাভাষী নন, এমন জাতির মানুষের কাছে আমাদের দায় কিছুটা হলেও শোধ হলো’।
বঙ্গবন্ধুর উদাত্ত আহ্বানে আপামর জনসাধারণ মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। আদিবাসীরা নিজেদের অস্ত্রে সজ্জিত হয়েই শত্রুসেনার মোকাবেলায় রণাঙ্গনে নেমেছিল কারণ ভালোবাসার মানুষটি দেশবাসীকে জানিয়েছে, ‘যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে’। আদিবাসীদের হাতে কোনো মরণাস্ত্র ছিল না, ছিলো তীর-ধনুক, দা-কুড়াল, লাঠি-বর্লম, কাপি-খুনতি, সেটি নিয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছিলো; বুকে ছিল বল, চেতনায় দেশপ্রেম। ৩০ লক্ষ শহীদের স্রোতে আদিবাসীদের রক্তের বহমান শাশ্বত হয়ে রয়েছে।
সামার ইনস্টিটিউট অব লিঙ্গুইস্টিকস্ (সিল) বাংলাদেশের প্রাণান্ত প্রচেষ্টায় ইতিমধ্যেই ২২টি জাতিসত্ত্বা—বম, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী, চাকমা, গারো, হাজং, খাসি, খিয়াং, কোচ, কোল, লুসাই, মাহালে, মেইতে মণিপুরী, ম্রো, মুণ্ডা, ওরাঁও কুরুখ, ওরাঁও সাদ্রি, পাহাড়ি, পাংখোয়া, সাঁওতাল, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা ও কোডা ভাষায় ৭ মার্চের অবিস্মরণীয় ভাষণটি রূপান্তরিত করেছে। ভাষা উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য সরকার স্বীকৃত দেশের প্রায় ৫০টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মাতৃভাষাতেই বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের অনুবাদ করা। দেশের আদিবাসীদের পক্ষ থেকে এটির চেয়ে বড়ো আর কোনো উপহার হতে পারে না। একদিকে যেমন জাতিরজনককে সম্মান জানানো, তেমনি মহানগর থেকে গ্রাম-গ্রামান্তরে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিকে নিশ্চিত করেছে।
প্রবীণদের সাথে আলাপনে জেনেছি, বঙ্গবন্ধুকে ‘শেখ সাহেব’ বলে সম্বোধন করেন। আর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘শেখের বেটি’ হিসেবেই আদর করে সম্বোধন করে। আদিবাসীরা বঙ্গবন্ধুর দৃঢ়চেতা নেতৃত্ব, বলিষ্ঠ বক্তব্য, অসাধারণ দূরদর্শিতা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং দেশজ মানুষের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ দেখিয়েছেন তাঁর স্বাধীনতা ঘোষণাটিকে সম্মানিত করে। আমরা প্রার্থনা করি, বঙ্গবন্ধুর উত্তসূরীরা যাতে করে তাঁর নীতি-নৈতিকতাকে অনুসরণ, অনুকরণ করে। তাঁর স্বপ্ন সোনার বাংলায় প্রতিটি মানুষ যেন খেয়ে-পরে, হাসিখুশি, আনন্দ-উৎসবে থাকতে পারে। মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই ছিলো তাঁর লালিত স্বপ্ন।
মিথুশিরাক মুরমু : আদিবাসী বিষয়ক গবেষক ও লেখক।





Users Today : 24
Views Today : 34
Total views : 186566
