বাংলাদেশে কত লোকের করযোগ্য আয় আছে, সেই পরিসংখ্যান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে নেই। বাংলাদেশে মাত্র ১ শতাংশ মানুষ কর দেন। আর ২৪ লাখ ৪৩ হাজার করদাতা বার্ষিক আয়কর বিবরণী দেন।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অক্সফাম ও সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযানের (সুপ্র) ‘অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়’বিষয়ক এক সমীক্ষায় এই কথা বলা হয়েছে। সেখানে কর-ন্যায্যতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। সমীক্ষাটি নিয়ে গতকাল বুধবার অনলাইনে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এ দেশের গরিব মানুষেরা প্রতিদিন নানাভাবে কর দেন। যেমন মুঠোফোনের বিল, গ্যাস, ওষুধ, বিদ্যুৎসহ নানা ধরনের জরুরি সেবার ওপর ভ্যাট দেন গরিব মানুষেরা।। কিন্তু তাঁরা যে প্রতিনিয়ত কর দেন, তা নিয়ে তাঁদের কোনো ধারণা নেই। অথচ দেশের ৭১ শতাংশ গরিব মানুষ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বাইরে আছেন। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে গরিব নন, এমন মানুষ সুবিধা ভোগ করেন। যেমন পেনশন ও মুক্তিযোদ্ধা ভাতার মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তার এক-তৃতীয়াংশ টাকা খরচ হয়।
সমীক্ষায় ভ্যাট খাত বিস্তৃত না হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে বলা হয়, মাত্র ১০টি খাত থেকে ভ্যাটের ৮১ শতাংশ আসে। এই খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সিগারেট, গ্যাস, নির্মাণ, মুঠোফোন, আগাম ভ্যাট, সরবরাহ সেবা, ওষুধ, খুচরা ও পাইকারি ব্যবসা, বিদ্যুৎ, ব্যাংক সেবা।
নতুন ভ্যাট আইনে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করার কথা। সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ১০ হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ইলেকট্রনিক ফিসকেল ডিভাইস (ইএফডি) বা ভ্যাটের মেশিন বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পর্যন্ত ৩ হাজার প্রতিষ্ঠানে ইএফডি বসানো হয়েছে, যা ভ্যাটের অনলাইন নিবন্ধন নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মাত্র ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। আগামী বছরের জুন মাসের মধ্যে আরও সাত হাজার ইএফডি বসানোর পরিকল্পনা আছে।
সমীক্ষায় আরও বলা হয়েছে, মোট রাজস্ব আদায়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের ব্যবধান কমে আসছিল। তিন-চার বছর ধরে তা আবার বাড়ছে। এখন মোট রাজস্ব আদায়ের ৭০ শতাংশ আসে পরোক্ষ কর থেকে। আর প্রত্যক্ষ কর আসে ৩০ শতাংশের মতো।
সুপ্রর পরামর্শক মো. শহিদ উল্লাহ প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, সঠিকভাবে সরকারি সেবা পান না। তাই মানুষ কর দিতে উৎসাহিত হন না। আবার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বারবার দেওয়া হয়। কম হারে কর দিয়ে কালোটাকা সাদা করা যায়। তাই মানুষ কর দিতে আগ্রহী হন না।
আলোচনা
পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, আইনের সংস্কারের প্রয়োজন আছে। সরকার অবশ্যই সংস্কার করবে। রাজস্ব আদায় বাড়াতে এনবিআরকে আরও বেশি আধুনিক হতে হবে। যেমন কম লোক, বেশি যন্ত্রের ব্যবহার।
এনবিআরকে অনেক সময় সক্ষমতার চেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় করার লক্ষ্য দেওয়া হয় বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান। তিনি বলেন, বাড়তি লক্ষ্য দেওয়ার কারণে এনবিআর আদায় করতে পারে না।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, কর আহরণকারী ও কর প্রদানকারী—কেউ প্রথাগত ব্যবস্থা বদলাতে চান না। তাই শুল্ক-করসংক্রান্ত সংস্কারে অনীহা।
অক্সফাম আমেরিকার গবেষক মার্ক কোহেন বলেন, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় হতে হবে সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে। মূল ভ্যাট আইনের নানা পরিবর্তন করে সাত বছর পর বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক অর্থনীতির বার্তা প্রকাশ পায়।
সুপ্রর চেয়ারপারসন আবদুল আওয়াল অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। এ ছাড়া বক্তব্য দেন সাংসদ আরোমা দত্ত, অক্সফাম বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর দীপংকর দত্ত, বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান প্রমুখ।





Users Today : 48
Views Today : 59
Total views : 177944
