বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ধর্ষণ’ ও ‘ধর্ষণ সংস্কৃতি’। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষালয়, অফিস-আদালত, সমাজ ও পরিবারেও ধর্ষণের মতো বর্বরতম ঘটনার শিকার হচ্ছে আমাদের মা-বোন-সন্তানেরা। যেসব নারীরা ঘরমুখো ছিলেন, আজ তারা নিরাপত্তার দাবিতে রাজপথে দাবি তুলেছেন। মানববন্ধনের প্লেকার্ডের কথাগুলো পুরুষ শাসিত সমাজকে কতোটুকু নাড়া দিতে পেরেছে তা জানা নেই, তবে সত্যিই বিবেকবান মানুষেরা নারীর প্রতি সম্মান-শ্রদ্ধা দেখাতে কার্পণ্যবোধ করবেন না। অসাড় বিবেককে জাগ্রত করতে প্রয়োজন মানব সেবামূলক কার্যক্রম, সচেতনতা আন্দোলন; প্রয়োজন আইনের শাসন—ন্যায্যতা ও সত্যকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা। বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। যেখানে থাকবে মানুষে-মানুষে সম্প্রীতি-সৌহার্দ; নারী-পুরুষের মধ্যে সম্মান-শ্রদ্ধাবোধ, থাকবে বৃহত্তর-ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে অপার মেলবন্ধন।
চলমান আন্দোলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুনজর দিয়েছেন। নারী সমাজের এহেন বিপর্যয়ে আইনের দণ্ডকে সমুন্নত করেছেন। আন্তর্জাতিক দূর্যোগ প্রশমন দিবস ২০২০ উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘ধর্ষণ একটা পাশবিকতা, মানুষ পশু হয়ে যায়। মেয়েরা আজকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সে জন্য আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সাজা যাবজ্জীবনের সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে মন্ত্রিসভা আইন পাস করেছে।’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নারীদের মনোব্যথা অনুভব, উপলব্ধি ও সামাজিক অবক্ষয়ের দিকেও অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। একজন পুরুষ নারীকে নিঃসঙ্গ পেলেই তার কামনা-বাসনার উদ্রেক ঘটে, বয়সের কোনো ধার ধারে না; ছি ছি এরূপ চিন্তা করতেই আমাদের মনোজগৎ অন্ধকার হয়ে যায়। একজন সুস্থ সবল মানুষ অসুস্থ ও পশুতে পরিণত হয়। প্রাণীজগতের প্রকৃতিগত নিয়ম রয়েছে, ভালোবাসা রয়েছে কিন্তু তাদের মধ্যে শঠতা, চালাকি, ভনিতা কিংবা অমানুষের আচরণ করে না। আর এখানেই শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার মানুষের দাবিগুলোকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মোকাবেলা, দুর্যোগ সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনা গড়ে তুলতে বহুধা কার্যসূচি গ্রহণ করেছেন; এতে করে আমরা দেশবাসী প্রাকৃতিক দুর্যোগকে আর তেমন ভয় করি না। দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ—মৃত্যু ও সম্পদের হানি প্রভৃতি সম্পর্কে পূর্বাহ্নে ওয়াকিবহাল হওয়াতে সজাগ হয়ে নিরাপদ আশ্রয় ও পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকি। স্রষ্টার দেওয়া বুদ্ধি, বিচক্ষণতা ও অভিজ্ঞতালব্ধতাকে কাজে লাগিয়েই দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে রোল মডেল হয়েছে। প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে সাহসী হলেও মানুষের কৃত্রিম সৃষ্টি ‘ধর্ষণ’ দুর্যোগ থেকে মাতৃভূমিকে কীভাবে মুক্ত করা যাবে! কীভাবে সত্যিকার মানবতাকে আমরা জাগ্রত করতে সক্ষম হবো!
ধর্ষণ প্রকটতা আইনের অনুশাসনের দুর্বলতাকে বহিঃপ্রকাশ করে। বিগত বছরের পরিসংখ্যানগুলো আমাদেরকে হতবাক করে দেয়। ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি থেকে আগষ্ট পর্যন্ত দেশে ৮৮৯ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এরই মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ৪১ জন। সেই হিসেবে চলতি বছর প্রতিমাসে গড়ে ১১১ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, সারা দেশে ধর্ষণের ঘটনা আগের চেয়ে দ্বিগুণ বেড়েছে। এ বছর সারা দেশে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ১ হাজার ৪১৩ নারী ও শিশু। ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দে সংখ্যাটি ছিল ৭৩২টি। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম জানিয়েছে, ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে যৌন নির্যাতনের শিকার হয় ১ হাজার ৩৮৩ শিশু। অপরদিকে বাংলাদেশ পুলিশের প্রতিবেদন পাওয়া যায়, গত বছর ৫ হাজার ৪০০ নারী এবং ৮১৫টি শিশু ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়। ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দে শিশু ধর্ষণের মামলা ছিল ৭২৭টি এবং নারী ধর্ষণের মামলা ছিলো ৩ হাজার ৯০০টি। ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে ধর্ষণের কারণে ১২ শিশু এবং ২৬ জন নারী মারা যান। ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দে এ সংখ্যা ছিল ২১ নারী ও ১৪ শিশু। দেশের জাতীয় গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে, ‘দেশে ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলায় গত ১১ বছরে পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ এবং এককভাবে ধর্ষণের পর হত্যা বা মৃত্যু ঘটানোর অপরাধে এই মুহূর্তে দেশের বিভিন্ন কারাগারে রয়েছেন মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত আরও ১৪৪ জন (প্রথম আলো ১৬.১০.২০২০)।
মা, মাটি, দেশ যেমন অনুরূপভাবে কন্যা-জায়া-জননী। মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানীরা আমাদের মা বোনদের সম্ভ্রম হানি করেছে; জাতিকে কালিমা লেপন করে নিজেদের অন্যায়, অন্যায্যতায় বিশ্বের দরবারে উন্মোচিত হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষতি করতে গিয়ে নিজেরাই ইমেজ সংকটে পড়েছেন আজ অবধি। গোটা পৃথিবীর মানুষ ধর্ষিত মা বোনদের সাহাযার্থে দু’হাত প্রসারিত করেছেন। জাতিরজনক শেখ মুজিবুর রহমান সম্ভ্রম হারানো নারীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, তোমরা পিতার জায়গায় নাম লিখে দাও—শেখ মুজিবুর রহমান, ঠিকানা—৩২ নম্বর ধানমন্ডি। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মা-বোন, সমাজ ও দেশকে অগ্নিস্নানে শূচি-শুভ্র করতেই যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান নিশ্চিত করেছেন, সেটির দীর্ঘসূত্রতাকে কমিয়ে এনে ধর্ষক ও ধর্ষণে জড়িত, ইন্ধনদাতাদের মুখোশ জনসম্মুখে তুলে ধরা আবশ্যিক। যাতে করে ধর্ষিত নয়, ধর্ষক ও এটির সাথে যুক্তদের ঘৃণার আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করা যায়!
পবিত্র বাইবেলের পুরাতন নিয়মে স্রষ্টা ঈশ্বর মোশি (মোজেস) কর্তৃক ১০ আজ্ঞা দিয়েছিলেন। সেখানে বলা হয়েছে, ‘ব্যভিচার করবে না’, ‘…প্রতিবেশীর স্ত্রী, দাস-দাসী, তার বলদ-গাধা, তার কোনো কিছুরই প্রতি লোভ করবে না।’ কিন্তু আমরা মানুষ নিয়ম-নীতিকে ছিন্নভিন্ন করেছি, আমাদের স্বার্থে, আমাদের মতো করে ব্যাখ্যা তৈরি করেছি। যিশু খ্রিষ্ট এইজন্যে ব্যভিচারের নতুন সংজ্ঞা দিয়েছেন—‘যে কেউ কোনো স্ত্রীলোকের প্রতি কামভাবে দৃষ্টিপাত করে, সে তখনই মনে মনে তার সঙ্গে ব্যভিচার করল।’ অর্থাৎ আমাদের হৃদয়, মন-অন্তরকে সূচি শুভ্র করতে হবে। একজন মানুষ পরিশুদ্ধ হলেই অন্যজনকে উজ্জীবীত করতে পারবেন। আর এভাবেই আমরা আমাদের মা-বোন, সমাজ ও দেশ থেকে অনাচার দূর করতে সক্ষম হবো।
মিথুশিলাক মুরমু : গবেষক ও লেখক।





Users Today : 9
Views Today : 14
Total views : 180875
