‘স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ হতে এখনো কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। …তরিকুল ইসলাম ও তাঁর গুন্ডাবাহিনী আমাদের বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ করার উদ্দেশ্যে একের পর এক হামলা আর মামলা করে যাচ্ছে। আর থানা যাচাই-বাছাই না করে মামলা গ্রহণ করছে। কয়েকজন পুলিশের এরূপ আচরণের কারণে আমরা দরিদ্র্যসীমার চরম সীমায় পৌঁছে গেছি এবং জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে। আর কিছুদিন চলতে থাকলে জীবনের ভয়ে মাতৃভ‚মি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হতে হবো।’
Ñচাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার আমনুরা টংপাড়ার আদিবাসী রাজোয়াড় জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী তৎপরতার প্রতিবাদে সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে শ্রীমতি করুনা রাজোয়াড় ও শ্রীমতি কুটিলা রাজোয়াড়, ৮ জুলাই, ২০২০ চিলিস কনফারেন্স হল, সাহেব বাজার, রাজশাহী। ।
দু-জন নারী নিজ গ্রাম্য সমাজের পক্ষে সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত হয়েছেন, একান্ত উপায়হীন হয়ে। আদিবাসী নারীরা নিভৃতে ঘর-সংসারের কাজ করে থাকে, সেখানে পরিবার, সমাজ, সম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা এবং ভালোবাসার বন্ধনকে আরো মজবুত করার লক্ষে দেশবাসীর কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছে। আমার বাংলাদেশ থেকে কাউকে বিচারহীনভাবে দেশত্যাগ করতে দিতে চাই না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবরই ন্যায় বিচারের প্রশ্নে আপোশহীন, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠাই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পুলিশের প্রতি আস্থা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন, আমরাও দেশের বৃহত্তম নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি আস্থা রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। এক্ষেত্রে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবার প্রতি যদি নিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে সেবা ও নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকেন, তাহলেই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্নটি এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
অসহায় আদিবাসীরা কেন দেশত্যাগে উদ্বুদ্ধ হবেন! সংবাদপত্রের মাধ্যমে জেনেছি, স্থানীয় চিহ্নিত সন্ত্রাসী জনগোষ্ঠীর হুমকি-ধামকি এবং পুলিশ প্রশাসনের ঔদাসিন্যতা অথবা প্রচ্ছন্নভাবে নীরব ভ‚মিকা অবতীর্ণ হওয়া; সত্যিই রক্ত-মাংসের মানুষকে হতাশগ্রস্ত ও দেশত্যাগে উদ্বুদ্ধ করে। রাজোয়াড় জনগোষ্ঠী একটি বিলুপ্ত প্রায় জনগোষ্ঠী, এভাবে প্রকাশ্যে যদি দেশত্যাগের বিষয়টি দেশবাসীর সম্মুখে উত্থিত হয়; সেটি বড়ই লজ্জার ও সম্মানের বিষয়ও জড়িয়ে আছে। আমার বাংলাদেশের স্বাধীনতা যে রক্তে ক্রীত হয়েছে, রক্তের স্রোতে সম্মিলিত হয়েছে মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-আদিবাসী-অন্ত্যজ জাতিগোষ্ঠীর রক্তকণাও। লক্ষ লক্ষ শহীদ ও সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত সোনার বাংলাদেশে কয়েক হাজার রাজোয়াড় জনগোষ্ঠী বসবাস করে; সেটি আবার দু-একটি জেলাতেই রয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় আদিবাসী রাজোয়াড়, কোল, মাহালী, সাঁওতাল, বর্মন, ভ‚মিজদের আশ্রয় দিয়ে গৌরবান্বিতের বিষয় না হয়ে, তাদেরকে শঙ্কিত, আতঙ্কিত করে তুলে দেশত্যাগে পথকে উন্মুক্ত করে দিয়েছি। ৮ জুলাইয়ের লিখিত বক্তব্যে প্রতীয়মান হয়েছে, আদিবাসী রাজোয়াড়দের প্রথম অভিযোগ পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে, দ্বিতীয়তÑস্থানীয় বিত্তবান ব্যক্তি জনাব তরিকুল ইসলাম ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গদের বিরুদ্ধে।
সাম্প্রতিককালে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ ৬৬০টি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে কক্ষপথ থেকে বেরিয়ে এসে সহসা বলেছেন, ‘পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা ওসিদের কাছে ঘুষ-মাসোহারা চাইলে জানান: আইজিপি’ (প্রথম আলো ৯.৭.২০২০)। তিনি ওসিদের উদ্দেশ্যে আরো বলেছেন, ‘অবৈধ অর্থ উপার্জন করে বিলাসী জীবনযাপন করা পুলিশের চাকরি নয়। দুর্নীতিবাজরা পুলিশে থাকতে পারবে না। বড়োলোক হওয়ার ইচ্ছা জাগলে পুলিশের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা করতে হবে। …নিজেরা অবৈধ উপার্জন করবেন না, অন্য কাউকে অবৈধ অর্থ উপার্জনের সুযোগও করে দেবেন না।’ তিনি তার আরো কয়েকদিন পূর্বে পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘পুলিশকে দুর্নীতিমুক্ত হওয়া, মানুষকে নির্যাতন করা থেকে বেরিয়ে আসা, মাদকের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখা, সারা দেশে বিট পুলিশিং চালু করা ও কর্মরত অবস্থাতেই পুলিশের কল্যাণ নিশ্চিত করা। …ভালো কাজ করলে স্বীকৃতি ও উৎসাহের পাশাপাশি মন্দ কাজ করলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে কার্পণ্য করা হবে না’ (প্রথম আলো ১৭.৬.২০২০)। ইতিপূর্বে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র্যাব) মহাপরিচালক থাকাকালীন ঠাকুরগাঁয়ে এক সমাবেশে বলেছিলেন, ‘অন্যায়ভাবে আমাদের দেশের কোনো সম্প্রদায়ের মানুষের কেউ ক্ষতি করার চেষ্টা করলে, তাদের হাত ভেঙে দেওয়া হবে। যারা বিনা কারণে দেশের মানুষের ক্ষতি করতে চায়, রক্তপাত করতে চায়, সম্পদ ধ্বংস করতে চায়, আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশে তাদের প্রয়োজন নেই’ (প্রথম আলো ২৮.১২.২০১৮)।
বর্তমান পুলিশ মহাপরিদর্শকের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর আমাদেরকে আশান্বিত করলেও স্থানীয় পর্যায়গুলোতে পুলিশের প্রতি আদিবাসীদের আস্থা যেন দিন দিন কমে যাচ্ছে। পুলিশের কাছে অভিযোগ থাকা সত্তে¡ও নওগাঁর ভীমপুরে আলফ্রেড সরেনকে হত্যা করেছিলো চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা, হত্যা করেছে দিনাজপুর ফুলবাড়ির ঢুডু হেমব্রমকে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ পুলিশ প্রধানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, অসহায়, নিরুপাই আদিবাসী রাজোয়াড়দের কথাগুলো শ্রবণের চেষ্টা করুন, উপলব্ধি এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় ভ‚মিকা নিন। নইলে হঠাৎ করেই শুনতে হবে, শ্রীমতি করুনা, কুটিলা রাজোয়াড়রা দেশ ত্যাগ করেছে; এতে অন্য আদিবাসীরাও উদ্বুদ্ধ ও প্রভাবান্বিত হবেন।
● মিথুশিলাক মুরমু : আদিবাসী বিষয়ক গবেষক ও লেখক।





Users Today : 28
Views Today : 34
Total views : 184518
