দেশের প্রান্তিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলো নভেল করোনা ভাইরস (কোভিড- ১৯) দুর্যোগে বিপন্ন ও অস্তিত্ব বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। আমার বাংলাদেশে এখনো অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আদিবাসী গোষ্ঠী রয়েছে, যাদের জনসংখ্যা একেবারেই নগণ্য। অবশ্য গবেষকরা বলছেন, ভাষা ব্যবহারকারীদের সংখ্যা ৫০ হাজারের নিচে নেমে গেলেই ভাষা বিপন্ন হয়ে পড়ে। মাতৃভূমিতে বাংলাসহ ৪২টি মাতৃভাষা রয়েছে। পার্বত্য পাহাড়ি অঞ্চলে খুমী জনগোষ্ঠী ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দের হিসেবে দুই হাজার ৯৪ জন; ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের আদমশুমারীতে পাওয়া গিয়েছিল ৭১০ জন। খিয়াং জনগোষ্ঠী ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের আদমশুমারী অনুযায়ী ১ হাজার ৯৫০ জন ছিল; তবে খিয়াংরা মনে করেছিলেন প্রায় তিন হাজার ৬০০ জন এদেশে রয়েছেন। কোচ আদিবাসী রয়েছে প্রায় ছয় হাজার, খাড়িয়া জনগোষ্ঠী বড়োজোর সাড়ে পাঁচ হাজার বসবাস করছে। উত্তরবঙ্গের কোল আদিবাসী জনসংখ্যা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘তাবিথা ফাউন্ডেশন’ কর্তৃক ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে পরিচালিত জরিপে মাত্র ১৬৭৯ জনকে পেয়েছে। বৃহত্তর রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, দিনাজপুর জেলার ২১টি গ্রামে ৩৪৯টি পরিবারের তথ্যাদি উপস্থাপন করেছে। এছাড়াও রয়েছে—আদিবাসী চাক, মাহালী, মুণ্ডা, মুষহড়, রাজোয়াড়, পাহান, কোডা, মিকির, কর্মকার, লোহার, তুরি প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠীর সংখ্যাও একেবারেই হাতে গোণা। পৃথিবীব্যাপী এরূপ পরিস্থিতি তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সচেতনতা বাড়াতে বাড়তি কাজ করতে হবে। বাঁচাতে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদিও পৌঁছিয়ে দেওয়া খুবই আবশ্যিক। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যতা, ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, লোকসাহিত্যসহ বহুবিধ দিকগুলো পর্যালোচনা করে এসমস্ত জাতিগোষ্ঠীকে বাঁচাতে স্থানীয় প্রশাসনকে নিজ থেকেই উদ্যোগ গ্রহণে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের সীমান্তবর্তী এবং অপেক্ষাকৃত দুর্গম এলাকায় আদিবাসীদের অবস্থান বিধায় হাত ধোয়ার জন্য পর্যাপ্ত সাবান, হ্যা—স্যানিটাইজার, খাবার-দাবার, পানীয় জল ইত্যাদি রয়েছে কিনা আমাদেরকেই খোঁজ নেওয়া দরকার। কীভাবে সাবান ব্যবহার, নিজেকে রক্ষা করার কৌশলসমূহ বাংলা/নিজ মাতৃভাষায় ব্যাপক প্রচার করা খুবই সময়োপযোগী। হাতে-কলমে তাদেরকে শিখানো এবং এ সময়কালে খাবারসহ সমস্ত বিষয়াদি সরবরাহ করা নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে বর্তাই। সচেতন নাগরিক কিংবা সরকারেরই দায়িত্ব এসব জাতিগোষ্ঠীকে নিজ নিজ বিশ্বাস ও ধর্মানুযায়ী স্রষ্টার কাছে বিনতী প্রার্থনা করতে উদ্বুদ্ধ করা। প্রকৃতির প্রতি মানুষের দায়িত্ব-কর্তব্য ইত্যাদি বিষয়েও সাবলীল ভাষায় জানাতে হবে। প্রান্তিক পর্যায়ে এসব আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পাশে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলো এখনই যদি দাঁড়াতে না পারে, তাহলে আমরা হারাতে পারি একটি জাতিগোষ্ঠীকে, তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্যের ঐশ্বর্যমণ্ডিত ভাণ্ডারও।
করোনা দুর্যোগকালীন স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন নগর থেকে গ্রাম পর্যন্ত টহল দিচ্ছেন, সাধারণ মানুষজনকেও ঘরের বাইরে কাজে না যেতে উৎসাহিত করছেন। সাধারণ মানুষ সবিস্তারে অবহিত না হলেও এতটুকু বুঝেছেন যে, মরণব্যাধি দুনিয়াতে এসেছে; এটির কোনো ঔষধপথ্যাদি মিলছে না। একমাত্র সামাজিক দূরত্ব অর্থাৎ একজন থেকে অপরজনের দূরত্বে থাকতে হবে। চোখে-মুখে-নাকে হাত দেওয়া যাবে না; বার বার সাবান দিয়ে হাত ধূয়ে ফেলতে হবে ইত্যাদি। জীবনযুদ্ধে বিপর্যস্ত আদিবাসীরা মাঠে একদিন কাজ না করলে চুলো জ্বলে না, হাঁড়িতে চাল দেওয়া যায় না জানাচ্ছিলেন কোল জনগোষ্ঠীর শিক্ষিকা শ্রীমতি সারদা হাঁসদা। রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার ২নং মোহনপুর ইউনিয়ন পরিষদের অন্তর্গত বাবুডাং কোল গ্রামের পঞ্চাষার্ধো যশোদা টুডু বললেন, ‘আমার পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৫ জন, উপার্জনকারী ১ জন; পার্শ্বের বাড়ির বিশ্বনাথ মুরমু, বয়স ৭০ পরিবারের সদস্য ৭ জন, উপার্জনকারী ২ জন। আমরা এযাবৎ পর্যন্ত কোনো সরকারি-বেসরকরি প্রতিষ্ঠান থেকে সামান্যতম সাহায্য-সহযোগিতা পায়নি’। খাস জায়গায় বসবাস করার সুযোগে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী কর্তৃক বার বার ভূমি থেকে উচ্ছেদ হুমকি আর চলমান দেশত্যাগের মিছিল তো রয়েছেই! বাস্তবিকই এভাবে আরো কিছু দিন অতিবাহিত হতে থাকলে আগামীতে আদিবাসী কোল সম্প্রদায় অবস্থা আরো করুণ হবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। হয়ত তারা একদা খাবারের সন্ধানে রাতের অন্ধকারে স্থানান্তরিত হবে কিংবা এক সময় জাতি জানবে তারা হারিয়ে গেছে।
খাদ্যের দাবিতে দিনাজপুরে আদিবাসী সাঁওতালরা রাজপথে নেমে এসেছে, তাদের একটিই প্রত্যাশা মোটা চালের ভাত খেয়ে যেন দুর্যোগকালীন সময়ে বাঁচতে পারে। দু’একটি জায়গায় বেসরকারি সংস্থাগুলো এবং ক্ষেত্র বিশেষে স্থানীয় প্রশাসনের চাল বরাদ্দের খবরগুলো আমাদের হৃদয়-মনকে আস্বস্ত করে; কিন্তু আশঙ্কার ঊর্ধ্বে যেতে পারি না। রাজনৈতিক পেশীশক্তির বিবেচনা না করে আর্থ-সামাজিক অবস্থার বিবেচনা, কর্মহীনতা, প্রান্তিকতার দিকগুলোকে মানবীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে সাহায্য-সহযোগিতার হাত প্রসারিত করলে স্রষ্টা দাতাদের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি দান করেন।
বৈশ্বিক এ দূর্যোগ কাটিয়ে ওঠা কতোটুকু সম্ভবপর সেটি সময়ই বলে দেবে কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে চাক, মাহালী, মুণ্ডা, মুষহড়, রাজোয়াড়, পাহান, কোডা, মিকির, কর্মকার, লোহার, তুরি, কোল আদিবাসীদের দূরবস্থা হয়তো আরো মাটিতে মিশে যাবে কিনা বলা যায় না। একদিকে জনসংখ্যার প্রান্তিকতা, ভূমিহীনতায় স্থানচ্যুত বা দেশত্যাগ; আরও যদি করোনা মহামারির মতো দুর্যোগের আঘাতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আদিবাসী সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা যাবে না। প্রয়োজন সরকারের করোনা ভাইরাস সচেতনতা বাড়ানো, খাদ্য সহযোগিতা, স্থায়ী আবাসনের পরিকল্পনা এবং এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুদূর পরিকল্পনা। আদিবাসী সাঁওতালদের প্রার্থনা সংগীতের একটি অংশে—
“Bagwan leka noa disom
Adi Lekan jatge menakbon.
Santal, Kristan, Hindu, Musla
Sanamko do mit kanabon.
Jotoge co abo ma co
Mit aidari menaktabon ho
Dupularte sanamkoge
Disom dobon tul rakaba.”
(বঙ্গানুবাদ: বাগানের মতো এই দেশে অনেক জাতিগোষ্ঠী রয়েছি। সাঁওতাল, খ্রিষ্টান হিন্দু, মুসলিম; আমরা সবাই ঐক্যে রয়েছি। আমাদের সবারই একই অধিকার রয়েছে, ভালোবেসে আমরা যেন আমাদের দেশকে উন্নয়নের দিকে ধাবিত করতে পারি।)
মিথুশিলাক মুরমু : আদিবাসী বিষয়ক গবেষক ও লেখক।





Users Today : 79
Views Today : 81
Total views : 182801
