দেশে দিন দিন শিক্ষার হার বাড়ছে আর সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেকারত্ব। যা যেকোনো দেশ তথা সরকারের জন্য উদ্বেগজনক সমস্যা। অধিকাংশ শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরাই স্বপ্ন দেখেন মানসম্মত বা পছন্দের একটা সরকারি চাকরির। সে জন্য তারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে ঘাম ঝরানো অক্লান্ত পরিশ্রমও করে যান। এরমধ্যে সময়, পরিস্থিতি বা ভাগ্য অনুকূলে থাকলে অনেকেই সফলকাম হতে পারেন। এভাবেই একটা সময় চাকরির আবেদনের বয়সসীমা শেষ হয়ে যায়। তখন শেষ সময়ে সুযোগের স্বল্পতায় অনেকেই বাধ্য হয়ে আর পছন্দের বা যোগ্যতা অনুযায়ী নয় বরং উচ্চ শিক্ষিত হয়েও একটা সরকারি পিয়নের চাকরিতেও আবেদন করেন। সামাজিক মর্যাদা, চাকরির নিশ্চয়তা, পেনশন সুবিধা ইত্যাদির কারণে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের কাছে সরকারি চাকরির মর্যাদা সবার উপরে। তবুও তো সরকারি চাকরি! এতদিন যেকোনো শ্রেণির সরকারি চাকরিকেই সোনার হরিণ বলা হলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি আর সোনার নয় বরং হিরার হরিণ বলা চলে।
তবে এর মধ্যেও সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হচ্ছে কচ্ছপ গতির নিয়োগ সম্পন্নের বিষয়টি। একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি থেকে শুরু করে চূড়ান্ত প্রার্থীকে নিয়োগ প্রদান করতে কমপক্ষে ২ বছর বা তার কম আবার তার বেশি সময়ও লাগে। বছরের পর বছর চাকরিপ্রার্থীরা অপেক্ষা করেন তাঁদের পছন্দের পদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির। আবেদনের বয়স থাকতে থাকতে কেউ সেটা পান আবার কেউ পান না। বাস্তবতা এমন, কোনো প্রার্থী পছন্দের পদে আবেদন করে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণের জন্য নিজেকে দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের সাথে ঝালিয়ে নিলেন মাসের পর মাস বা বছরের পর বছর। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে ছয় থেকে আট মাস, এক বছর এমনকি দুই বা তিন বছর পরেও আসে লিখিত পরীক্ষার প্রবেশ পত্র। তারপরে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছতে অর্থাৎ চূড়ান্ত প্রার্থীকে সংশ্লিষ্ট পদে নিয়োগ প্রদান পর্যন্ত আরো অনেক সময়ের দরকার।
সঠিক সময়ে পরীক্ষা না নেয়ায় কালক্ষেপণের কারণে অনেক যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থীই ঐ সব চাকরি প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হন। চাকরির পরীক্ষা মানেই প্রতিযোগিতার খেলা। দীর্ঘদিন এত পরিশ্রম করে সময়মত লিখিত পরীক্ষার কার্ড না আসায় প্রস্তুতির জন্য পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াটা বেকারদের কাছে এক পর্যায়ে রীতিমত বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলশ্রুতিতে অনেকেই প্রস্তুতি বিমুখ হয়ে যান। একটা দীর্ঘ সময় পরে যখন এই পরীক্ষা হয় তখন যোগ্য ও মেধাবীরা অন্য চাকরিতে থাকায় বা প্রস্তুতি চলমান না রাখায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও সফলকাম হতে পারেন না। আবার কোনো কোনো নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা হবে দূরের কথা উল্টো রিট বা নানা রকম আইনি জটিলতায় সেটাও কয়েক বছর ঝুলে থাকতে থাকতে এক সময় বাতিল হয়ে যায়। বিষয়টি চাকরিপ্রার্থীদের কাছে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘার মতই। কারণ হয়ত এই আবেদনটিই ছিল কারো কারো জীবনের শেষ সুযোগ। চাকরির প্রয়োজনে অনেক সময় অস্থায়ীভাবে থাকার জন্য যে এলাকার বাসিন্দা হন সেই এলাকার ঠিকানাকে নিজ ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন।
স্বাভাবিকভাবে ৪ থেকে ৫ মাসের ভিতরে লিখিত পরীক্ষার কার্ড আসার কথা থাকলেও সেটি অনেক পরে আসায় অনেকেই সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। কারণ ততদিনে অন্য কোনো চাকরি বা প্রয়োজনের তাগিদেই এই অস্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন করায় আবেদনকারীকে সেই ঠিকানায় পাওয়া যায় না। তাছাড়া বেশিরভাগ চাকরির আবেদনই এখন অনলাইন-ভিত্তিক হওয়ায় খুব সহজে আবেদন করা গেলেও প্রবেশপত্র আসতে সেই একই সময় লাগে। অন্যদিকে প্রতি শুক্রবারে রাজধানীর একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একই দিনে ও সময়ে একাধিক পরীক্ষা থাকায় চাকরিপ্রার্থীরা সবগুলোতে অংশগ্রহণের সুযোগ পান না। এমনিতেই গলাকাটা আবেদন ফী দিতে এবং প্রত্যন্ত এলাকা থেকে ঢাকায় আসার খরচ যোগাতে নাভিশ্বাস বেকার প্রার্থীদের। এতে করে তারা যেমন পর্যাপ্ত সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন তেমনি আর্থিক, মানসিক দিক থেকেও ক্ষতিগ্রস্ত হন।
কূন্যপদ পূরণের লক্ষ্যেই যদি দরখাস্তের আহ্বান করা হয় তাহলে সেই নিয়োগ পরীক্ষা কেন কম সময়ের মধ্যেই অর্থাৎ ৩ থেকে সর্বোচ্চ ৫ মাসের ভিতরে নেয়া হয় না? আমরা আগেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সকল কূন্যপদ পূরণে দ্রুতই পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে নির্দেশ দিতে দেখেছি। জনপ্রশাসন সূত্রে জানা যায়, এখনও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও আওতাধীন দফতর সমূহে সকল শ্রেণির কূন্যপদ রয়েছে ৩ লাখ ১৩ হাজার ৮৪৮টি। এমনিতেই চাকরির আবেদনে একটা দিনও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাই চাকরিপ্রার্থীদের বাস্তবিক সামগ্রিক সমস্যা রোধে এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে সরকার তথা নীতিনির্ধারকদের এখনই ভাবতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেই পরীক্ষা না নিলে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদেরকে জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য সরকার প্রধানকেই ব্যবস্থা নিতে হবে।
নাজমুল হোসেন : প্রকৌশলী-প্রাবন্ধিক।





Users Today : 32
Views Today : 40
Total views : 177925
